“আপনি যে কী বলছেন, সে সম্পর্কে আমার কোনো ধারণাই নেই।” স্বীকার করল রাধা।
“নিউজ পেপার তো পড়ো, নাকি না?”
রাধা মুখ কালো করে তাকালেও বুঝতে পারলো যে ভাইরাসবিদ সত্যিকারের আগ্রহ নিয়েই জানতে চাইছেন। তাই উত্তরে জানাল, “অবশ্যই পড়ি।”
“খুব ভালো। তাহলে নিশ্চয় আজকের দিনের চিকিৎসা শাস্ত্রের সবচেয়ে বড় ইস্যুটির কথাও জানো। বছরের পর বছর ধরে এ উদ্বেগের জন্ম হলেও গণমাধ্যমে মাত্র অতি সম্প্রতি চাউর হয়েছে। বহু বছর ধরেই মানুষ অ্যান্টিবায়োটিক অতি ব্যবহার আর অপব্যহার করছে।
ফলাফলে কী হচ্ছে? ব্যাকটেরিয়া জন্ম নিয়ে মানুষ জানে এমন কিছু ভয়ংকর রোগের ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা গড়ে তুলেছে। এসব প্রজাতির কিছু কিছু আবার অসংখ্য ড্রাগের বিরুদ্ধে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই একটা সত্যিকারের হুমকি হল পেনিসিলিনের আবিষ্কারের পর থেকে যে অ্যান্টিবায়োটিকস জীবন ধ্বংসকারী রোগ-বালাইয়ের বিরুদ্ধে বর্ম হিসেবে কাজ করে মানব শরীরকে সুরক্ষা দিয়েছে তা অতি সত্বর বিলীন হয়ে যাবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় প্রাণঘাতী যক্ষ্মারোগের হাত থেকে যে বর্ম এতদিন বাঁচিয়েছে তা দুর্বল হতে হতে সামনে নাই হয়ে যাবে। চিকিৎসাশাস্ত্রের ভাষায় বলতে গেলে আমরা আবার ইতিহাস-পূর্ব যুগে ফিরে যাবো; এমন এক অন্ধকার যুগ যখন ভয়ংকর সব ব্যাকটেরিয়ার ইনফেকশনের কোনো দাওয়াই ছিল না।”
মাথা নাড়ল রাধা। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এই বিষয়ের উপর অনেক প্রতিবেদন দেখেছে। অতি ভয়াবহ এই ভবিষ্যতের সাথে লড়াই করার জন্য আধুনিক বিভিন্ন প্রযুক্তির গবেষণার পাশাপাশি নতুন নতুন পথ আবিষ্কারের চেষ্টাও চলছে। একই সাথে রাধা এই দলটা যারাই হোক না কেন তাদের উদ্দেশ্যও বুঝতে শুরু করেছে। তার মানে ক্লিনিকাল ট্রায়ালের উদ্দেশ্য হল অ্যান্টিবায়োটিকসের স্থলাভিষিক্ত করার জন্য নতুন কিছু আবিষ্কার?” তবে এখনো বুঝতে পারছে না যে যে হুমকির কথা বললেন তার সাথে সাক্সেনা কেমন করে লড়াই করবেন।
পাশের কী-বোর্ডের একটা বোতামে চাপ দিলেন সাক্সেনা আর পর্দায় ধীরে ধীরে ফুটে উঠল একটা ত্রিমাত্রিক ইমেজ। বিশ মাথাঅলা একটা বহুভুজক্ষেত্র। আরেকটা বোতামে চাপ দিতেই ভাগ হয়ে গেল পুরো পর্দা। প্রথম ইমেজের ডান পাশে আরেকটা ত্রিমাত্রিক ইমেজ ফুটে উঠল। তবে এটার গড়ন গোলাকার আর এলোমলো।
“বামপাশে যা দেখছ তা হল একটা রেট্রোভাইরাস।” ব্যাখ্যা করলেন সাক্সেনা। প্রথম ইমেজটা দেখিয়ে বললেন, “আর ডান দিকে একটা ব্যাকটেরিয়া।” খানিক থেমে বললেন, “আগে এই দুটোই ছিল অজ্ঞাত, আর আমরা তা পেয়েছি গ্রেট আলেকজান্ডারের শরীর থেকে।”
.
৫০. ৩২৮ খ্রিস্টপূর্ব
বাল্ক, বর্তমান সময়ের আফগানিস্তান
“কী তোমাকে এত দুশ্চিন্তায় ফেলেছে, প্রিয় ক্যালিসথিনস?” উজ্জ্বল দৃষ্টিতে ইতিহাসবিদের দিকে তাকালেন আলেকজান্ডার। “যেভাবে এগোবার কথা সবকিছু তো সেভাবেই এগোচ্ছে। কাজ করেছে আমার পরিকল্পনা। আমরা পারস্য জয় করেছি। ব্যাকট্রিয়ার গোত্রগুলোকেও অধীনে এনেছি। এমন মহাশক্তিধর সগডিয়ান রককেও পরাভূত করেছি।” ক্যালিসথিনসের কাঁধে এক হাত তুলে দিয়ে বললেন, “আর, প্রিয় ইতিহাসবিদ, তোমাকে যে মিশনে পাঠিয়েছিলাম তাতেও তুমি সফল হয়েছ। সর্বশ্রেষ্ঠ এক মিশন। যেটি আমাকে একজন দেবতায় পরিণত করবে!” তরুণ বিজেতা ইতিহাসবিদের কাঁধ থেকে হাত সরিয়ে চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুমি যে কিছু নিয়ে ভাবছো সেটা আমি পরিষ্কারভাবেই বুঝতে পারছি। এবারে বলো কারণটা কী। আমাকে জানতেই হবে।”
আলেকজান্ডারের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকালেও দ্বিধা করছেন ক্যালিসথিনস। ক্লিটাসের ভাগ্য এখনো মন থেকে মুছে যায়নি। পারস্য সাম্রাজ্য বিজয়ের উদ্দেশ্যে মেসিডোনিয়া থেকে যে আলেকজান্ডারের সাথে যাত্রা করেছিলেন ইনি তিনি নন। তখন পিতার জন্য অভিযানে বেরিয়েছিল এক তরুণ। যার কাছে ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী সাম্রাজ্যকে পরাজিত করার স্পর্ধা ও সাহস। আর তৃষ্ণা ও ক্লান্তির সাথে যুদ্ধ করে, ভয়ংকর ঠাণ্ডা ও অনাহারে থেকেও হাজার হাজার মাইল পথ পাড়ি দিতে নিজ বাহিনিকে উদ্দীপ্ত করে তোলার ক্ষমতা। সেই আলেকজান্ডারের জন্য হাসতে হাসতেও নিজের জীবন দিতে প্রস্তুত ছিল ক্যালিসথিন্স।
কিন্তু আজ সামনে যে আলেকজান্ডার দাঁড়িয়ে আছেন তিনি পুরোপুরি ভিন্ন মানুষ। সফলতাই কি তাকে এতটা উদ্ধৃত করে তুলেছে? প্রথমে দারিয়ুসের পতন আর বিসাস অধিগ্রহণ, দারিয়ুসকে হত্যা করে পারস্যের সিংহাসন দাবি করা, আর সবশেষে সগডিয়ান রক বিজয়ের পাশাপাশি ব্যাকট্রিয়ার গোত্রদের উপরেও পরিপূর্ণ মানুষের বোধশক্তি ঘুরিয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। আর আলেকজান্ডার তো এখনো তরুণ। নাকি এর কারণ মেসিডোনিয়া ত্যাগ করার পর থেকেই যার পিছনে ছুটেছেন সেই সিক্রেট মিশন? মাত্র কয়েকমাস আগেও এ সম্পর্কে কিছুই জানতেন না ক্যালিসথিনস; যখন ব্যাকট্রিয়ার জঙ্গল আর ওপাড়ে অক্সাস নদীর অ্যাসাইনমেন্ট সম্পর্কে জানিয়েছিলেন আলেকজান্ডার। বিসাস হিন্দুকুশ পার হয়ে ব্যাকট্রিয়ার আশ্রয় নেয়ার পরই পুরো সেনাবাহিনি নিয়ে পার্বত্যঞ্চল অতিক্রম করে ব্যাকট্রিয়ার পর্দাপণের সুযোগ পেয়ে যান আলেকজান্ডার।
