রাধার দিকে তাকিয়ে মেয়েটাকে মেপে দেখলেন সাক্সেনা। “যতটা ভাব করছ তার চেয়ে তুমি আসলে বেশিই জানো। হ্যাঁ, ঠিক কথা বলেছ। এ পর্যন্ত পৃথিবী যা দেখেনি সেই মহারহস্য নিয়েই আমার কাজ। এর মাধ্যমে, কেউ ঘুণাক্ষরে ভাবতেও পারবে না এমনভাবে দুনিয়া শাসন করবে অর্ডার। লাগাম থাকবে আমাদের হাতে আর মানুষ সেই ইশারাতেই পুতুলের মত নাচবে।”
কৌতূহলী হয়ে উঠল রাধা। ষড়যন্ত্রের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। তাই তাকে আরো জানতে হবে। সাক্সেনা গালভরা এসব কী বলছে। খানিকটা ফাঁকিবাজি করেই দেখা যাক না, “তো আপনি বলছেন যে অবজ্ঞাভরে বলে উঠল রাধা, “আমি এখানে যে ক্লিনিকাল ট্রায়াল দেখছি তার সমাপ্তি হল মানুষের মৃত্যু। সবাই মারা যাবে। এতে আর কী রহস্য আছে? অর্ডার কী তাহলে মৃতদের দুনিয়া শাসন করবে? আপনারা কি এমন কোনো নতুন জীবাণু আবিষ্কার করেছেন যা পৃথিবীর সব মানুষকে ধুয়ে মুছে সাফ করে দেবে? কেবল টিকে থাকবে অর্ডার? কেউ যদি না-ই থাকে তবে কার উপর আধিপত্য খাটাবেন?”
ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে তাকালেন সাক্সেনা, “আমরা মানুষকে খুন করব না” সহানুভূতির স্বরে জানালেন, “বরঞ্চ জীবন ফিরিয়ে দেব।”
স্পষ্ট অবিশ্বাসীর দৃষ্টিতে তাকাল রাধা, “আপনারা ভাবছেন যে, অর্ডারের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজ করছেন। কিন্তু যেসব ক্লিনিকাল ট্রায়াল করছেন তার সবকটির ফলাফল হল শূন্য। ব্যর্থতা ছাড়া কিছু না।”
মেয়েটার কথা শোনামাত্র ক্রোধে জ্বলে উঠল সাক্সেনার চেহারা। নিজের কাজ নিয়ে তিনি অত্যন্ত গর্বিত। এমন কি সফলতার দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছেন বলা চলে। বহুদিন ধরে সেই স্বীকৃতির জন্য অপেক্ষা করছেন যার জন্য তিনিই যোগ্য। কিন্তু মিশন শেষ না হওয়া পর্যন্ত অর্ডার কোনো ধরনের স্বীকৃতিই দেবে না। কিন্তু তার অর্জন কিন্তু কম নয়! আর এই মেয়ে, যে কিনা তার কাজ সম্পর্কে কিছুই জানে না অথচ তার সফলতাকে অবমূল্যায়ন করছে। কোনোভাবেই আর সহ্য হচ্ছে না এই আস্পর্ধা।
“আমি যা বলছি তা বিশ্বাস হচ্ছে না, না?” রাধাকে চ্যালেঞ্জ জানালেন সাক্সেনা, “তোমার ধারণা এসব কেবল ভবিষ্যহীন একটা ভাইরাস আর ক্লিনিকাল ট্রায়াল? তুমি…”
কথার মাঝখানে বাধা দিল রাধা, “আমার মনে হয় আপনি আপনার ছোট্ট একটা মিশনকেই ফুলিয়ে ফাপিয়ে বড় করছেন। কিন্তু আসলে তা না আপনার একটা কথাও আমি বিশ্বাস করি না।”
“ফাইন, তাহলে”, ক্ষেপে উঠলেন সাক্সেনা; প্রশংসা আর স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষায় পেয়ে বসল। তাছাড়া মেয়েটা তো আর কোথাও যাচ্ছে না। কেউ কখনো ওকে খুঁজেই পাবে না। “এসো আমার সাথে। চলো তোমাকে প্রমাণ দেখাই।”
এক সারি লিফটের দিকে এগিয়ে কার্ড রিডারে নিজের অ্যাকসেস কার্ড ঢুকিয়ে দালানের একেবারে নিচের তলার বোম চেপে ধরলেন। দ্রুত গতিতে নিচে নেমে গেল হাই স্পিড লিফট। একটু পরেই পৌঁছে গেল গন্তব্যে।
অর্ডার আর অলিম্পিয়াস কিভাবে কিউবটা পেলেন ও পারস্য সাম্রাজ্যে বিজয় লাভ ছাড়াও আরো বড় উচ্চাকাঙ্ক্ষার দিকে আলেকজান্ডারকে ধাবিত করলেন তার সবকিছু সংক্ষেপে খুলে বললেন সাক্সেনা। এরই মাঝে লিফটের ডোর খুলে যেতেই দেখা গেল দুপাশে সারি সারি দরজা সমেত সাদা, লম্বা, একটা করিডোর। বেশির ভাগই বন্ধ। তবে কয়েকটা খোলা থাকায় ভেতরে দেখা যাচ্ছে সব ধরনের যন্ত্রপাতি, ডিভাইস, সার্ভার আর মনিটরে বোঝাই ল্যাবরেটরি। আর সাদা ল্যাবরেটরি কোর্ট গায়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে একগাদা টেকনিশিয়ান।
“আমার মিশনে আমাদের অপারেশনের প্রাণকেন্দ্র হচ্ছে এই জায়গা।” ব্যাখ্যা করলেন সাক্সেনা, “আর আমাদের নিচের দুটো ফ্লোরে চলছে ফ্রিম্যানের প্রজেক্ট।” এরপর রাধাকে নিয়ে করিডোরের একেবারে শেষ মাথায় একটা অফিসে চলে এলেন। রুমটাতে ফার্নিচার বলতে বিশাল বড় একটা ডেস্ক আর এক কোণায় চামড়ার চেয়ার। বিপরীত দিকের দেয়ালের সাথে লাগানো হয়েছে স্টেইনলেস স্টিলের তৈরি ওয়ার্ক স্টেশন। ডেস্কের এক পাশে লম্বা একটা বুককেস। মেডিকেলের ভারী সব বইয়ের ভারে বাঁকা হয়ে পড়েছে তাক। ডেস্কের উপর আরো আছে একটা এলসিডি মনিটর, কী-বোর্ড আর মাউস।
“বসো।” নিজে চামড়ার চেয়ারে বসে ডেস্কের ওপাশে থাকা দুটো চেয়ারের একটার দিকে ইশারা করলেন সাক্সেনা।
বসে পড়ল রাধা। ওদিকে কম্পিউটার, কী বোর্ড আর মাউস নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন সাক্সেনা।
কিছুক্ষণ বাদে মনিটরটা রাধার দিকে ঘুরিয়ে দিলেন ভাইরাসবিদ। হাবভাব এমন যেন বিমূঢ় দর্শকের সামনে কোনো কিছু উপস্থাপন করছেন এক দক্ষ বিজ্ঞানী।
“তুমি ভাবছ যে আমরা জীবাণুর অপব্যবহার করে বায়োটেররিজম ঘটাতে যাচ্ছি।” তিরস্কার করে উঠলেন সাক্সেনা, “যা কিনা সত্যের চেয়ে লক্ষ লক্ষ গুণ দূরে। তুমি চিন্তাও করতে পারবে না কতটা দূরে। সত্যটা হচ্ছে ঠিক এর বিপরীত। আমরা কাউকে খুন করতে চাই না। বরঞ্চ রোগ ভোগের হাত থেকে মানুষকে বাঁচাতে চাই।”
“আর আপনি আশা করছেন যে আমি এটা বিশ্বাস করব?” ব্যঙ্গ করে উঠল রাধা, “আপনি আর আপনার লোকজন মিলে যে গুরুতর অপরাধ করেছেন এখন সেটাকে একটা মহৎ উদ্দেশ্য হিসেবে মেনে নিতে হবে?”
“চুপ, একদম চুপ” কঠোরভাবে তিরস্কার করলেন সাক্সেনা, “প্রতিটা মুদ্রার দুটো পিঠ থাকে। তুমি তো কেবল একপাশ দেখেছ। শুধু গত কয়েকদিনের নয়, গত দশকে যা করেছি তার সবটুকুই আমাদের সফলতার জন্য প্রয়োজন ছিল। আমরা এক যুগান্তকারী বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের দ্বারপ্রান্তে চলে এসেছি; এমনকি আধুনিক প্রযুক্তিও যা আজ পর্যন্ত করে দেখাতে পারেনি। অথচ চিকিৎসা শাস্ত্রের এই বিপ্লবের পেছনকার মহারহস্য দুই হাজার বছর আগে থেকেই কয়েকটা ধাঁধা আর পৌরাণিক কাহিনির আড়ালে লুকায়িত ছিল। যেটির অস্তিত্বের কথা বেশির ভাগ লোক জানেই না; প্রহেলিকার জাল ছিন্ন করাতো বহু দূরের কথা।”
