“তো এরপর কুপারকে খনন কাজে জড়িত করে স্ট্যাভরসকেও নিজেদের দল টেনে নিলেন?”
“ঠিক তাই। এখন তাহলে তুমি পুরো ব্যাপারটাই বুঝতে পেরেছ।”
ভ্রু-কুঁচকে ফেলল বিজয়, “আমাদের কাছে যেসব তথ্য ছিল তার ফাঁক ফোকরগুলো এবার ভরে গেল। আমি তো খনন কাজ আর ক্লিনিকাল ট্রায়ালের ভেতরেও কোনো না কোনো সম্পর্ক আছে অনুমান করেছিলাম। আলেকজান্ডারের মমির উপর তোমরা যে পরীক্ষা চালিয়েছ…তার ফলাফলকে বৈধতা দেবার জন্য ক্লিনিকাল ট্রায়াল জরুরি ছিল তাই না?”
হেসে ফেললেন ভ্যান কুক, “কাছাকাছি হয়েছে। তবে অংশত। আলেকজান্ডারের মমি পরীক্ষা করায় এমন কিছু জিনিস আবিষ্কৃত হয়েছে যার জন্য আমরা প্রস্তুত ছিলাম না। তাই ক্লিনিকাল ট্রায়ালগুলো জরুরি হয়ে পড়ে। দেখো, তোমাদের মহাকাব্য মহাভারত থেকে নেয়া এক পৌরাণিক কাহিনির উপর ভিত্তি করেই কিউবটার সৃষ্টি। আলেকজান্ডার যা পেয়েছেন আর তার উপর পরীক্ষা করে আমরা যা পেয়েছি এ সবকিছুই মহাকাব্যের একটা গল্পে হুবহু বর্ণনা করা আছে। তাই পরীক্ষার ফলাফল বোঝার জন্য জীবিত মানুষের উপর ক্লিনিকাল ট্রায়াল করাটা প্রয়োজন ছিল।
বিজয় নিজের মাথা খাঁটিয়ে মহাভারতের এমন কোনো কাহিনির কথা স্মরণ করার চেষ্টা করল যার সাথে কিনা ক্লিনিকাল ট্রায়াল আর দুহাজার বছর আগে মৃত্যুবরণ করা এক মৃতদেহের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলাফলের মিল পাওয়া যায়। কিন্তু মাথায় কিছুই এলো না।
“জানি না তুমি কিসের কথা বলছ। অবশেষে জানাতে বাধ্য হল বিজয়।
“ইংরেজিতে এর নাম মহাসাগর মন্থন অথবা আরো সঠিকভাবে বললে হয় সমুদ্রমন্থন।” ভ্যান ক্লক সংস্কৃত শব্দটা একেবারে নিখুঁতভাবে উচ্চারণ করলেও খেয়াল করল না বিজয়। মহাকাব্যের সবচেয়ে বিখ্যাত কাহিনিগুলোর একটি শোনার সাথে সাথেই পুরো মনোযোগ চলে গেছে সেদিকে।
“কিন্তু…কিভাবে?” দ্বিধায় পড়ে গেল বিজয়। “এ কাহিনি তো পুরোপুরি একটা ফ্যান্টাসি, অতি কল্পনা। অমৃত পাবার জন্য দড়ির মত ভাসুকি আর একটা পর্বতকে ব্যবহার করে মহাসমুদ্র মন্থন। এর পেছনে কোনো বিজ্ঞান নেই।”
অনুকম্পা দেখিয়ে হাসল ভ্যান কুক, “সবাই আসলে মহাভারতকে এক মহাকাব্যিক কবিতা কিংবা কাল্পনিক কাহিনি হিসেবেই ভাবতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। তাই বিশ্বাসই করতে পারবে না যে এর পরতে পরতে লুকিয়ে আছে। বিজ্ঞান।”
সম্মত না হয়ে পারল না বিজয়। কারণ বিজ্ঞান আর প্রযুক্তিই যে মহাভারতের অন্তঃস্থল গত বছরের আবিষ্কারই তা প্রমাণ করে দিয়েছে। আর এখন এও বেশ বুঝতে পারছে যে দু’হাজার বছর ধরে মহাভারতের মাঝে লুকিয়ে থাকা আরেকটা রহস্যের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে।
“চলো, তোমাকে ব্যাখ্যা করে শোনাই”, সামনে ঝুঁকে শুরু করল ভ্যান
.
৪৯. পঞ্চম দিন
রহস্যের এক ঝলক
সাক্সেনাকে হাসতে দেখে চোখ পিটপিট করল বিস্মিত রাধা। কোনো রকম ঘোষণা ছাড়াই ডাক্তার ওর সেলে এসে জানিয়েছেন যে মেডিকেল সেন্টারের চারপাশে হাঁটতে নিয়ে যাবেন।
“আমাকে বলা হয়েছে যেন তোমার দিকে খেয়াল রাখি।” খোশমেজাজে জানালেন সাক্সেনা, “কুপার তোমাকে এখানে নিয়ে আসায় হাতে আরো বেশি সময় পাওয়া গেল। মনে হচ্ছে তার প্রজেক্টের ডেডলাইন আরো কয়েকদিন বাড়ানো যাবে। মানে আমার অংশও বেড়ে গেল।”
সেল থেকে বেরিয়ে আগে কখনোই দেখেনি এমন সব করিডোরের গোলকধাঁধা ধরে হাঁটতে হাঁটতে ডাক্তারের কথা ভেবে দেখল রাধা। কিন্তু আয়তাকার একটা অ্যাট্রিয়ামের চারপাশের লম্বা ব্যালকনিতে পৌঁছে মাথা থেকে দূর হয়ে গেল সমস্ত চিন্তা। বিশাল স্থানটাকে আলোকিত করে তুলেছে ছাদের শক্তিশালী লাইট আর ব্যালকনির বাতি। অ্যাট্রিয়ামের চারপাশেই আছে এ ব্যালকনি। গুণে দেখল পুরো দালানে আটটা সিঁড়িপথ আছে।
সবিস্ময়ে ভেবে দেখল যে পুরো স্থাপনাটা তাহলে কত বড়। অথচ সেল থেকে টয়লেট ব্লক পর্যন্ত করিডোরের মাঝেই সীমাবদ্ধ ওর গতিবিধি। এজমালি টয়লেট আর বাথরুম এ কারাগারের অন্যান্য বন্দী নিবাসীদেরকে দেখলেও ধারণা করতে পারেনি যে দালানটা এত বড়।
“আড়াইশো সেল আছে।” রাধার দম বন্ধ ভাব দেখে জানালেন সাক্সেনা। “এই ফ্যাসিলিটির আটটা তলাই ভূগর্ভে তৈরি যা এখন চোখের সামনে দেখছ। মাটির উপর কেবল দুই তলা। তাই বাইরে থেকে পুরো ভবনটাকেই নিচু আর বৈশিষ্ট্যহীন দেখায়। কেউ জানেই না যে এখানে কী আছে।”
“কুপার কে?” প্রাথমিক বিস্ময় সামলে উঠে জানতে চাইল রাধা।
“তুমি জানো না? আমি তো ভেবেছিলাম যে আমেরিকান প্রত্নতাত্ত্বিক হয়ত তোমাকে জানিয়েছে। তার খনন কাজের কো-ডিরেক্টরই ছিল কুপার। পুরো নাম পিটার কুপার। আমরাই তাকে ওখানে নিয়োগ দিয়েছি।”
আরো একবার চমকে উঠল রাধা। তার মানে গ্রিসে এলিসের অভিজ্ঞতা আর এই লোকগুলোর মাঝে সম্পর্ক আছে। কিন্তু কী সেই সম্পর্ক? আর “আমরা” মানেই বা কী?
হঠাৎ করেই কথাটা মাথায় এলো। অন্যরা যখন মিউজিয়ামের দিকে যাচ্ছে তখন বিজয়ের সাথে যে আলোচনা হয়েছে তা মনে পড়ে গেল। বিজয় ওকে ইউমেনিসের জার্নাল আর আলেকজান্ডারের দেবতাদের রহস্য অভিযানের কথা বলেছিল। এটাই কি সাক্সেনার অপারেশন আর গ্রিসের প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কাজের মাঝে সম্পর্ক?
“তার মানে আপনারা কিউবের ধাঁধার মাঝে লুকায়িত সিক্রেট খুঁজে পাবার চেষ্টা করছেন?” জার্নালের কথা উল্লেখ না করেই জানতে চাইল রাধা। যদি জার্নালটা গোপনীয় হয় তাহলে সাক্সেনাকে জানানো উচিত হবে না।
