আবারো মাথা নাড়ল বিজয়। মনে পড়ল তাদের বিশ্লেষণের সময় এলিসের প্রত্যাখ্যানের কথা। বিভিন্ন রেকর্ডে আলেকজান্ডার সম্পর্কে প্রচুর পরিমাণে লোকজ গল্প মেলে ধরা হয়েছে যার সবকটিকে বিশ্বাস করা শক্ত।
হাত বাড়িয়ে দিল ভ্যান ক্লক, “কিউবটা প্লিজ।”
বিজয় কিউবটা ক্লকের হাতে তুলে দিতেই ধাতব পাতের গায়ে লাগিয়ে দিল ভ্যান কুক। সাথে সাথে চমৎকারভাবে বসে গেল, কিউব।
“তো তোমরা কিভাবে জানো যে আলেকজান্ডারের গল্পের কতটুকু সত্য আর কতটুকু অতি কল্পনা?” কৌতূহলী হয়ে উঠল বিজয়। এই লোকটার ক্ষমতার আর জ্ঞানের উৎস কী?
“জেনে কী তোমার ভালো লাগবে?” ব্যঙ্গ করল ভ্যান ক্লক। “কিন্তু একটা কথা বলতে পারি, অলিম্পিয়াস আমাদের অর্ডারের একজন সদস্য ছিলেন। আর তিনি এই কিউবের কথা জানতেন কারণ অর্ডারের একেবারে প্রথম দিককার এক সদস্যই এর সৃষ্টিকর্তা। সে হাজার হাজার বছর আগেকার কথা।”
হতভম্ব হয়ে গেল বিজয়। গত বছর টাক্স ফোর্সে যোগ দেবার পর ইমরান কিরবাঈয়ের কাছ থেকে যতটুকু জানতে পেরেছে তাতে ভেবেছিল যে তাদের অদৃশ্য প্রতিপক্ষ নিশ্চয় অত্যন্ত শক্তিশালী। তবে তারা যে এতটা প্রাচীন সে সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না। ভ্যান কুকের কথা যদি সত্য হয় তো এই অর্ডার গত বছর আবিষ্কৃত মহান অশোকের ব্রাদারহুডের চেয়েও আরো পুরনো।
বিজয়ের চমকে যাওয়া দেখে উল্লসিত হয়ে উঠল ভ্যান কুক, “তাই আমরা জানি যে ইন্দাস-ভূমিতে আলেকজান্ডারের অভিযান কোনো মস্তিস্কপ্রসূত কল্পনা নয়। যা চেয়েছিলেন তা খুঁজে পাবার রাস্তাও আমরাই সরবরাহ করেছিলাম।”
তবে এবার একটা ফোকর বের করল বিজয়, “এখানে একটা খটকা আছে।” পাল্টা মন্তব্য করে বলল, “আজ তার সেই রহস্য খুঁজছে। কিন্তু যেমনটা দাবি করলে যদি দুই হাজার চারশ কিংবা তার চেয়েও বেশি বছর আগে থেকেই উপায়গুলো জানো তাহলে তখনই কেন খোজোনি? কেন থালায় সাজিয়ে আলেকজান্ডারের হাতে তুলে দিলে, ধাতব পাতটাকেও লুকিয়ে রাখতে দিলে আর তারপর দুই হাজার বছর পর এসেছ খুঁজতে?”
ভ্যান ক্লকের চেহারাতে আঁধার ঘনাল, “কারণ অলিম্পিয়াস আমাদের সাথে ছল করেছিল। আলেকজান্ডারেরও হাজার বছর আগে থেকেই সুরক্ষিত ছিল এ রহস্য। মনে রাখবে এটা দেবতাদের রহস্য। ইন্দাস-ভূমির দেবতাদের। কিউব আর ধাতব পাতটাকেও এই কারণেই তৈরি করা হয়েছে যেন সিক্রেটটা আজীবন সুরক্ষিত থাকে। আর পাহারা দেবার জন্য সৃষ্টি হয়েছে বেদের পুরোহিতদের এক ছোট্ট ব্রাদারহুড। কেবল তারাই এটা জানত। অর্ডারেরও উৎপত্তি সম্পর্কে জানার অযুহাতে নিজ দরবারে পুরোহিতদের একজনকে আমন্ত্রণ করেছিলেন অলিম্পিয়াস। আর কোনো একভাবে পুরোহিতের কাছ থেকে সিক্রেট লোকেশনটাও জেনে নিয়েছেন। এরকম সীমালঙ্ঘনের জন্যই আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর অর্ডার তার উপর থেকে সব ধরনের প্রতিরক্ষাবহ সরিয়ে ফেলে। যদি অর্ডার নিরাপত্তা দিত তাহলে এতটা অবমাননাকর মৃত্যু সইতে হত না।”
“এটা কোন ধরনের অর্ডার?” আবারো নিজের প্রশ্নের ঝাঁপি খুলে বসল বিজয়।
কিন্তু মাথা নাড়ল ভ্যান কুক। “তোমাকে ইতোমধ্যেই আমি অনেকটুকু বলে ফেলেছি। শুধু জেনে রাখো যে আমরা মানবজাতির মতই পুরনো। এমন একটা সময় ছিল যখন সারা দুনিয়া আমাদের কথা জানত আর ভয়ও পেত। তারপর আমরাই সিদ্ধান্ত নিলাম যে লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকলেই প্রভাব প্রতিপত্তি খাটানোটা আরো সহজ হবে।”
আবারো শুরু করার আগে একটু বিরতি দিয়ে জানাল, “যাই হোক, আলেকজান্ডার সিক্রেটটা খুঁজে পেলেও তারপরের ঘটনাসমূহ জট পাকিয়ে যায় আর উনি মৃত্যুবরণ করেন। ইতিহাস নিশ্চয় জানো। তাঁর শেষকৃত্যের শবাধার টলেমি হাইজ্যাক করে আর মমি আলেকজান্দ্রিয়ায় সমাধিস্থ করে যা সেখানেই ছিল চতুর্থ শতক পর্যন্ত।”
“মানে, যখন রহস্যময়ভাবে গায়েব হয়ে গিয়েছিল।” বিড়বিড় করে নিজের গবেষণা স্মরণ করল বিজয়।
“গায়েব হয়ে যায়নি” জানাল আত্মতৃপ্ত ভ্যান কুক, “সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল খ্রিস্টানবাদ। চিহ্নগুলো আমরা পরিষ্কারভাবেই দেখেছি। পৌত্তলিক দেবতাদের সাথে সম্পৃক্ত সবকিছুই ধ্বংস করে ফেলা হচ্ছিল। আর আলেকজান্ডারকে দেবতা হিসেবেই পূজা করা হত। বহু আগেই তার সমাধিস্থান ভেঙে মমি নষ্ট করে ফেলার কথা ছিল। তাই লাগাম টেনে নিলাম আমাদের হাতে। আলেকজান্দ্রিয়া থেকে মমি তুলে আরেকটা গোপন জায়গায় নিয়ে যাওয়া হল। সেই সমাধিস্থান সম্পর্কে কাউকেই জানানো হয়নি। কিন্তু অর্ডারের অজ্ঞাতে একটা মানচিত্র তৈরি হল। এত শতক ধরে যা লুকানোই ছিল। মাত্র কয়েক দশক আগে দুর্ঘটনাবশতই তা আবার পুনরাবিষ্কৃত হয়েছে।
আমরা খনন করে মমিটাকে তুলেছি। যা আমাদের জন্য অত্যন্ত অনুগ্রহ বয়ে এনেছে বলতে পারো। তিনি যে সিক্রেটটা আবিষ্কার করেছিলেন শত শত বছর ধরে সে গল্প এক রূপকথায় পরিণত হয়েছে। আমরাও বিশ্বাস করিনি যে এমন কিছু সম্ভব। আর মমিটাকে পরীক্ষা করে দেখেছি। তখনই বুঝতে পারলাম যে রূপকথা আসলে সত্যি। দেবতাদের রহস্য আদৌ কোনো বানোয়াট নয়। আর আলেকজান্ডার প্রকৃত অর্থেই তা আবিষ্কার করেছিলেন। আর তখনই ঠিক করি যে এবার সিক্রেটটাকে খুঁজতে হবে। কিন্তু আমাদের হাতে কিউব আর ধাতব পাতটা ছিল না। তবে জানতাম, অলিম্পিয়াসের সাথে যে পুরোহিত দেখা করেছিলেন তার কাছেই এগুলো শেষবারের মত দেখা গিয়েছিল। কিন্তু মিটিংয়ের পরপরই উধাও হয়ে যান সেই পুরোহিত। আর, কেউ জানে না যে তার সাথে কী হয়েছিল। এরপর যখন অলিম্পিয়াসের সমাধি আবিষ্কৃত হবার সম্ভাবনার কথা শুনলাম, বুঝতে পারলাম যে কিউব আর ধাতব পাতটাও সেখানে পাবার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে।”
