“অবশেষে বিজয়ের উপর স্থির দৃষ্টি মেলে ধরল লোকটা, ধূসর চোখ জোড়া এখনো ওকে মূল্যায়ন করে চলেছে। কাছেই পড়ে থাকা শতছিন আরেকটা সোফা দেখিয়ে বসতে ইশারা করল। বিজয়ও বসে পড়ল।
“আমার নাম ক্রিশ্চিয়ান ভ্যান ক্লক” নিজের পরিচয় জানাল আগন্তুক, “আমার কথা কখনো শোন নি, না?”
মাথা নেড়ে সম্মতি দিল বিজয়। সত্যিই শোনে নি।
“যাই হোক সেটা কোনো সমস্যা না; তুমি কে সেটা আমি জানি। বলে চলল ভ্যান কুক; কুপারের দিকেও একবার তাকাল, “বেশ ভালো কাজ দেখিয়েছে কুপার। কাল আমাদের অভিযানের জন্য বিশ্বস্ত লোকজনকে তৈরি করো ততক্ষণে আমি এই ভদ্রলোকের সঙ্গে খানিক কথা বলি?”
সম্মত হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে লম্বা লম্বা পা ফেলে চলে গেল কুপার। এরপর ভ্যান ক্লক ওর দিকে তাকাতেই বিজয় বুঝতে পারল যে কাবুল এয়ারপোর্টের গাস্ট্রিম জেট এ লোকটার হবে নিশ্চয়। কে সে? কণ্ঠস্বরে পুরোপুরি ইউরোপীয় টান। সম্ভবত জার্মানি কিংবা অস্ট্রিয়া থেকে এসেছে। অসম্ভব ধনী, সে ব্যাপারেও কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু বিজয়কে কিভাবে চেনে?
“তুমি হচ্ছ আমাদের জন্যে একটা কাটা।” বিজয়কে জানাল ভ্যান কুক। তবে এরকম মন্তব্য সত্ত্বেও তাকে বিরক্ত কিংবা দুঃখী মনে হচ্ছে না, “তোমার জন্য গত বছর আমি একজন ভালো বন্ধুকে হারিয়েছি। আর অর্ডার হারিয়েছে এক কর্মোদ্যমী সদস্য।” মাথা নেড়ে জানাল, “আগামী হাজার বছরেও তোমার কথা ভুলব না।” এবারেও অভিব্যক্তি কিংবা গলার স্বরে কোনো তিক্ততা প্রকাশ পেল না।
কিন্তু শব্দগুলো শোনার সাথে সাথেই বিজয়ের মেরুদন্ড বেয়ে নেমে গেল ভয়ের শীতল স্রোত। ভ্যান কুক কি গত বছর মহাভারতের রহস্য অনুসন্ধানের কথা বলছে? অনুমান করতে কষ্ট হচ্ছে না যে কাদের প্রতি ইঙ্গিত করেছে।
“অবশ্য এখন আর এসবের কোনো মানে হয় না” আবার শুরু করলো ভ্যান, “এসবই অতীত আর আমি অতীতে বসবাস করায় বিশ্বাস করিনা। আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে ভবিষ্যৎ। তাই সামনের দিনগুলোর উপরেই মনোসংযোগ করতে হবে। এখনো অনেক কিছু পাবার বাকি আছে। কিন্তু অতীতও গুরুত্বপূর্ণ, তাই না?” বিজয়কে চিরে দিল মর্মভেদী দৃষ্টি, “অতীত থেকেই শিক্ষা নিয়ে নিরাপদ ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে হবে।”
লোকটা যে কী বলছে সে সম্পর্কে বিজয়ের কোনো ধারণাই নেই। মনে হচ্ছে সব অর্থহীন কথাবার্তা। কিন্তু সামনে বসে থাকা লোকটাকে দেখে তো অসংলগ্ন বলেও মনে হচ্ছে না। তাকে তো বরঞ্চ পুরোপুরি নির্ভুল, পরিকল্পনা মত হিসেব কষে পা ফেলাদের দলেই ফেলা যায়। মোটেই আবেগতাড়িত নয়।
“কুপার আমাকে বলেছে তুমি না-কি পদ্যগুলোর একটার মর্মোদ্ধার করেছ” বিজয়ের বিস্ময়কে পাত্তা না দিয়ে ভ্যান ক্লক জানাল, “তো কুনার উপত্যকায় কী আছে?” সামনে ঝুঁকে বিজয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “বলো।”
পুরো আলোচনার মধ্যে এই প্রথমবারের মত বিজয়ের পরিচিত একটা কিছু নিয়ে কথা বলল ইউরোপীয়ান লোকটা। কিন্তু এবারেও ওর কাছে কোনো উত্তর প্রস্তুত নেই।
“আমি জানি না” উত্তরের পরিবর্তে তাই কাঁধ ঝাঁকিয়ে জানাল বিজয়, “পদ্যটাতে কেবল জালালাবাদের অবস্থান বর্ণনা করা হয়েছে। এই অঞ্চলে আসার জন্য আলেকজান্ডার যে রাস্তা ব্যবহার করেছিলেন তা থেকে কুনার উপত্যকা একটা অনুমান মাত্র।” এরপর ব্যাখ্যা করে জানাল যে কেমন করে কনার উপত্যকাতেই রহস্যটা লুকিয়ে থাকার জোরালো সম্ভাবনা খুঁজে বের করেছে।
বিজয়ের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনল ভ্যান কুক, “তার মানে তুমি সঠিক। অবস্থানটা জানো না। কিন্তু ভাবছ যে এখানেই হয়ত আমাদের অনুসন্ধান শেষ হবে।”
উত্তর দেবার আগে খানিক দ্বিধা করল বিজয়। এতক্ষণ এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিল, “তোমরা আসলে কী খুঁজছ জানতে পারলে আমি সাহায্য করতে পারব। এখন তো কেবল কিছু না জেনেই পদ্যগুলোকে মমোদ্ধার করেছি। আলেকজান্ডার সেটা জানতেন। আমরাও যদি জানতে পারি। তাহলে সম্ভবত কাজটা আরো দ্রুত হবে।” এমন এক মানুষের মত একগুয়ে দৃষ্টিতে তাকাল যার কিছুই হারাবার নেই। প্যাটারসন তো জানিয়েছেন যে তার আর রাধার দিন শেষ। আর যদি মৃত্যু এত কাছেই থাকে তবে তার আগে উত্তরটাও ঠিকই জেনে যাবে।
চিন্তায় পড়ে গেল ভ্যান কুক। বিজয়ের কাছ থেকে এ ধরনের কোনো তেজ প্রত্যাশা করেনি। যাই হোক অবশেষে মাথা নেড়ে হাসল; বরফ শীতল এক হাসি যা চোখে ফুটে উঠেনি। “হয়ত তুমিই ঠিক। যদি আরো কিছু জানতে পারো তাহলে হতে পারে আরেকটু বেশি কাজে লাগবে।”
বিজয় অপেক্ষা করছে; আর ইউরোপীয়টা মনে মনে ভাবছে যে কতটা বলবে আর কতটা গোপন রাখবে।
.
৪৮. আলেকজান্ডার সম্বন্ধে সত্য উদঘাটন
“দ্য গ্রেট আলেকজান্ডার সম্পর্কে খানিকটা সত্য বোধ হয় তুমি ইতিমধ্যে বের করে ফেলেছ।” অবশেষে জানাল ভ্যান কুক। “বাস্তব ক্ষেত্রে তার জীবন সম্পর্কে আমরা যতটা জানি-সেটার ভিত্তি হল অসংলগ্ন কিছু তথ্য কিংবা অধিকাংশ ক্ষেত্রে যিনি রেকর্ড করে গেছে সেই ব্যক্তির উদ্দেশ্য, দর্শন অথবা ধ্যান-ধারণা। ফলে কোনটা যে আসল মানুষটা সম্পর্কে লেখা ঐতিহাসিক সত্য আর কোনটা যে মহিমান্বিত হিসেবে ফুটিয়ে তোেলা গল্প তা বের করা আসলেই কঠিন।”
বিজয় যেন এ মন্তব্যে সায় দেয় তাই খানিক অপেক্ষা করল ভ্যান কুক। বিজয় তাই মাথা নেড়ে সম্মতি দিতেই আবার শুরু করল, “আর এ কারণেই কিউবের মত আর্টিফ্যাক্ট গুলো দরকারি। এদের সাহায্যে আলেকজন্ডারের তাবেদারি আর উচ্চকিত প্রশংসা করে লেখা অতি কল্পনার অংশগুলোকে বাদ দেয়া যাবে।”
