.
৪৭. জালালাবাদ, আফগানিস্তান
জালালাবাদের রাস্তায় ঝাঁকি খেতে খেতে এগোচ্ছে ল্যান্ড রোভার। কুপারের পাশেই বসে আছে বিজয়। এয়ারপোর্টে পৌঁছানোর সাথে সাথেই তড়িঘড়ি ওকে একটা অপেক্ষারত গাস্ট্রিম জিফাইভ ফাইভ জিরো জেটে তুলে নেয়া হয়েছে।
তারপর নব্বই মিনিটের ফ্লাইটে চড়ে উড়ে এসেছে দিল্লি থেকে কাবুল। সাথে কুপারের দলের আরো পাঁচজন এসেছে, স্থূলকায়, পেশিবহুল লোকগুলোর ক্ষতচিহ্ন দেখেই বোঝা যাচ্ছে কতটা তেজী, সকলেই সশস্ত্র।
কাবুল এয়ারক্রাফট ল্যান্ড করার সাথে সাথেই টারম্যাকে পার্ক করা আরেকটা প্রাইভেট জেট দেখল বিজয়। গাস্ট্রিম সিক্স ফাইভ জিরো ই আর, দূরপাল্লার জেট। এগুলো যে কার সেটা ভেবেই বেশি অবাক লাগছে। কুপার ওকে আগেই জানিয়েছে যে তারা সরাসরি জালালাবাদ যেতে পারবে না। কারণ বিমানবন্দরগুলো এখন সামরিক উদ্দেশ্যেই ব্যবহৃত হয় আর এ মুহূর্তে কেবল জাতিসংঘের বিমান ওঠা-নামা করে। আশেপাশে আরো দুটো মোটাসোটা কর্মাশিয়াল এয়ারলাইন্স থাকলেও ছোট খাটো কোনো প্লেন নজরে পড়ল না।
ইমিগ্রেশনের ঝামেলা চুকিয়ে নকুই মিনিটের জন্য ল্যান্ড রোভারে চড়ে বসল জালালাবাদের উদ্দেশ্যে। সচরাচর বাহন নিয়ে কোনো কথা বলে না বিজয়। রাস্তাটা বেশ ভালো আর মসৃণ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাহায্য পুষ্ট একটা প্রজেক্ট ২০০৬ সালে নতুন করে গড়ে তুলেছে এ অংশ। কিন্তু মনে হচ্ছে দু’ধারের গ্রাম্য-দৃশ্যকে চ্যালেঞ্জ জানানোর জন্য আফগান ড্রাইভারদেকে আরো উৎসাহ দিয়েছে রাস্তার এই বৈশিষ্ট্য।
কাবুল নদীর প্রায় ২০০ ফুটেরও বেশি উপর দিয়ে বয়ে চলা রাস্তার আশেপাশের শ্বাসরুদ্ধকর দৃশ্য দেখে মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না। যদিও সারাক্ষণ যেন বিপদ আর মৃত্যু ওঁৎ পেতে ছিল মাথার উপর। হাইওয়েতে মাত্র দুটো লেন আর পাশাপাশি খুব বেশি হলে দুটো গাড়ি চলতে পারবে এতটুকু মাত্র চওড়া।
ভেতরের লেনে, রাস্তার উপর টাওয়ারের মত উঁচু হয়ে আছে খাড়া একটা চূড়া। প্রায় নব্বই ডিগ্রি কোনে বাঁকানো। আর বাইরের লেনকে সুরক্ষা দিচ্ছে মাত্র এক ফুট উঁচু তাক। যার ওপারে খোলা আকাশ আর নিচে উপত্যকার মেঝে।
প্রাচীন লাডাস-সেই সোভিয়েত যুগ থেকেই টিকে আছে। দুর্বল, ভাঙ্গা-ভাঙ্গা বাস আর ক্ষয়ে যাওয়া টয়েটো ট্যাক্সিগুলো একে অন্যের সাথে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে এলোপাথারি গাড়ি চালাচ্ছে। একটু পরেই অবশ্য আবার সোভিয়েত আক্রমণের সাক্ষী খানা-খন্দে পড়ে এদিক সেদিক ছিটকে পড়তে হয়। ল্যান্ড রোভারের পাশ দিয়ে হুশ হাশ করে বেরিয়ে যাচ্ছে স্থানীয় গাড়ি। একে অন্যের কাছ থেকে মিলিমিটার মাত্র দূরত্বে হাই স্পিডে পার হচ্ছে চুলের মত চিকন আর তীক্ষ্ণ বাক। এসব কিছুর মাঝে অসামঞ্জস্য হচ্ছে বোঝা বহনকারী ধীরগতির ট্রাকটার ট্রেইলার। কর্কশ শব্দ করে এমনভাবে গড়িয়ে চলেছে যেন সময় নিয়ে কোনো মাথা ব্যথা নেই। ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে চলা বাকি যানবাহন থেকে একেবারেই আলাদা।
পথিমধ্যে দু’বার প্রতিদিন হাইওয়েতে ঘটে চলা দুর্ঘটনার নজির দেখতে পেল বিজয়। প্রথমটা হচ্ছে গিরিখাতের তলায় দোমড়ানো মোচড়ানো একটা গাড়ির অবশিষ্টাংশ। দ্বিতীয়টা একটা কন্টেইনার ট্রাক আর সেডানের মুখোমুখি সংঘর্ষ। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে দুর্ভাগা ড্রাইভার সময় মত নিজ লেনে ফিরতে
পেরে পূর্ণ গতিতে গিয়ে ট্রাকের গায়ে আছড়ে পড়েছে। ফলে রাস্তার সংকীর্ণ অংশে বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে যানবাহনের অবাধ গতি। বিশাল ট্রাক আর গাড়ির নষ্ট হয়ে যাওয়া অংশের পাশ দিয়ে আস্তে আস্তে প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে পার হচ্ছে বাকি গাড়ি।
যাক, অবশেষে জালালাবাদ পৌঁছাতে পেরেছে। এখন স্থানীয় এসকর্টের সাথে যাচ্ছে বাকিদের সাথে মোলাকাৎ করার জন্য। এই লোকটাই কাল সকালে তাদেরকে কুনার ভ্যালিতে নিয়ে যাবে।
জীর্ণদশা এক দালানের সামনে এসে থামল ল্যান্ড রোভার। প্লাস্টার উঠে যাচ্ছে, জানালাগুলো ভাঙ্গা। কোনো সন্দেহ নেই যে খুব শিঘ্রই মেরামত প্রয়োজন। তবে মনে হচ্ছে বিলাসিতা এদের কাছে তেমন জরুরি কিছু না। কুপার যে কাদের জন্য কাজ করছে তা ভেবে যারপরনাই বিস্মিত বিজয়।
অবশ্য দোতলা দালানের প্রায় পুরো গ্রাউন্ড ফ্লোর জুড়ে থাকা হলে ঢুকতে গিয়ে খানিকটা উত্তর পেয়েও গেল। কোনো এক কালে হয়ত হালকা হলুদ ছিল এমন এক পোকায় কাটা গদিঅলা সোফায় বসে আছে স্বতন্ত্র চেহারাবিশিষ্ট লম্বা এক লোক। ভদ্রলোকের উন্নত কপাল, ঈগলের মত বাকা নাক আর মাথায় রুপালি ধূসর চুল। ভেতরে ঢোকার সাথে সাথে বিজয়কে মেপে দেখল রীমলেস চশমার ওপারে থাকা ধূসর চোখজোড়া।
সামনেই টেবিলের উপর পড়ে আছে জাতীয় জাদুঘরে দেখা ধাতব পাত, বীজ নদীর কাছাকাছি জিউসের বেদির নিচে যেটি সমাধিস্থ করে গেছেন আলেকজান্ডার।
“শুভ সন্ধ্যা, ক্রিশ্চিয়ান”, লোকটার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল কুপার। একটুও না হেসে পাল্টা মাথা ঝাঁকাল লোকটা।
কোনো কথা না বললেও ঠিক বোঝা যাচ্ছে তার ক্ষমতা আর প্রতিপত্তির বহর। বিজয় জানে না সে কে তবে সন্দেহ নেই যে কুপারের বস। এই পুরো প্রজেক্টের পুরোধা।
এখানেই এই সময়ে আগন্তুকের উপস্থিতি ভালো না মন্দ সেটাও বুঝতে পারছে না। তবে আশা করছে অন্তত এতদিন ধরে তাদের মনের মাঝে জমে উঠা একগাদা প্রশ্নের কয়েকটা উত্তর পাওয়া যাবে।
