“হয়ত নিজের বাহিনিকে দেখাতে চেয়েছিলেন যে তিনি সত্যিই এক দেবতা।” অনুমান করল কলিন।
“কেন, সেটা কোন ব্যাপার না” উত্তর দিল বিজয়, “আমি শুধু দেখাতে চেয়েছি যে গোপন এক অভিযানের প্রমাণ করার জন্য আমাদের হাতে দুটো উপায় আছে। মাকরান মরুভূমি হল একটা। যদি আলেকজান্ডার কোনো কিছুর অনুসন্ধানে এসে থাকেন তাহলে মাকরান মরুভূমিতে সেটাই খুঁজছিলেন। এর জন্যই এত ঘুরপথে গিয়েছিলেন।”
“কিন্তু তা তো না” শুরু করল কলিন, “কেননা ততদিনে বীজ নদীতীরে নির্মিত বেদির নিচে তো ধাতব পাতটাকে সমাধিস্থ করে গেছেন। তার মানে নিজের অভিযানের উদ্দেশ্য উপলব্ধি করে ফেলেছেন। তাহলে দ্বিতীয় রহস্যটা কী? আমার মনে হয় তুমি আরো কিছু পেয়েছ?”
বন্ধুর দিকে তাকিয়ে সেঁতো হাসি দিল বিজয়, “মাকরান অভিযানেই যে আলেকজান্ডার কোনো কারণ ছাড়া নিজ সেনাবাহিনিকে ভাগ করে ফেলেছেন তা না; বরঞ্চ এটা ছিল দ্বিতীয় বার। প্রথমবার করেছেন এখানে।” মানচিত্রে একটা শহর দেখিয়ে দিল বিজয়, “এই হল জালালাবাদ। এখান থেকেই সেনাবাহিনির একাংশসহ হেফাসনকে খাইবার পাস পাঠিয়ে দিয়েছেন যেটা বর্তমান দিনের পাকিস্তান। বাকি অংশ নিয়ে তিনি নিজে প্রথমে এই নদী উপত্যকা আর তারপর নাওয়া পাস হয়ে পাকিস্তান চলে যান; যেটি খাইবার পাস থেকে একেবারে উত্তরে।” আরেকটা ম্যাপ টেনে নিল; আফগানিস্তানের মানচিত্র। “আর খেয়াল রেখো-আলেকজান্ডার কেন উত্তরে আর তারপর পূর্বে গেছেন তা নিয়ে কেউ কোনো সন্তুষ্টজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। কয়েকজন লেখক আর কয়েকটা ওয়েবসাইটে সামরিক কিছু ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে–আর তা হল তিনি নিজ বাহিনিকে পাহাড়ি গোত্রদের হাত থেকে রক্ষা করতে চেয়েছেন। কিন্তু পাহাড়ি গোষ্ঠীদের জয় করার জন্য যে লড়াই করেছেন তা কিন্তু কুনার উপত্যকাতে নয়। এর সবকটিই এখানে হয়েছে-বর্তমান সময়ে পাকিস্তান আর আফগানিস্তান বর্ডারে। তিনি চাইলে খাইবার পাস পার হয়ে তারপর পাহাড়ি গোষ্ঠীদেরকে এড়ানোর জন্য সেনাবাহিনি ভাগ করে এক অংশ পূর্ব আর আরেক অংশ উত্তরে পাঠিয়ে দিতে পারতেন।”
“পারসারে পাহাড়ি গোত্রদের সাথে সর্বশেষ যে যুদ্ধটা হয়েছিল তাকে গ্রিকরা ডাকে আর্নস। আর সেটা অবশ্যই পাকিস্তানে, কুনার উপত্যকায় নয়। যদিও আলেকজান্ডারের গতিবিধির এরকম সামরিক ব্যাখ্যা আমার ঠিক মনঃপুত হয়নি।
‘দ্য কুনার রিভার ভ্যালি” মানচিত্র দেখে নামটা পড়ল কলিন, “তোমার ধারণা এখানেই লুকায়িত ছিল সেই গুপ্ত রহস্য?”
“আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।” এলিস এখনো দ্বিধায় ভুগছে, “এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই যে নির্দিষ্ট কোনো কারণেই আলেকজান্ডার এই কুনার উপত্যকাতে গিয়েছিলেন আর বিশেষ অনুসন্ধানই হচ্ছে সেই কারণ। কিন্তু এটা তো কেবলই একটা অনুমান। তাহলে অন্যদের চেয়ে তোমার ব্যাখ্যা আমাদের অনুমান কেন আরো বেশি বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে করতে হবে?”
“এই জন্য।” ইউমেনিসের অনুবাদিত জার্নাল মেলে ধরল বিজয়, “আর কিউবের সেই কবিতাগুলো।” ডা. শুক্লার দিকে তাকিয়ে বলল, “আরো একবার কিউবের পদ্যগুলোকে অনুবাদ করে শোনাবেন প্লিজ?”
মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন ডা. শুক্লা। বিজয়ের মনে কী আছে না জানলেও একটা ব্যাপার স্পষ্টভাবেই বুঝতে পারছেন এটাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে বিজয়। নিজের বাগদত্তার যখন জীবন সংশয় তখন ছেলেটা নিশ্চয় কোনো উপকারে না লাগলে অহেতুক এরকম কোনো রহস্য সমাধানে নেমে পড়ত না।
তাই ডা. শুক্লা কিউবটাকে হাতে নিয়ে পদ্যগুলো পড়তে শুরু করলেন। প্রতিটা কবিতার শেষে মাথা নেড়ে অনাগ্রহ দেখাল বিজয়। একে একে তিনটা পদ্য শেষ হবার পর চতুর্থ পদ্যের সময় বলল, “এটাই। এটাই সেটা।” সবার দিকে তাকাল বিজয়, “এবারে বুঝতে পেরেছ?”
.
৪৪. প্রথম সূত্র
শূন্য চোখে বিজয়ের দিকে তাকিয়ে আছে সবাই। কেউ কিছুই বুঝতে পারছে না। ডা. শুক্লা এইমাত্র যে পদ্যটা পড়লেন তা হল :
“তারপর প্রবেশ করো সেই পাতালে
পূর্ব আর পশ্চিমে যাকে বিভক্ত
করেছে উপত্যকাদ্বয়
সাবধানে বেছে নিও, মনে রাখবে
কোথায় যাচ্ছে, যেথায় সূর্য ঘুমায়।
“ওকে, হাত তুলল বিজয়, “মেনে নিলাম যে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। যাওয়ার কথাও নয়। পুরো অভিযানটাই তো গোপন, তাই না? সাংকেতিক সব পদ্য দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। কী খুঁজছে না জানলে পদ্যগুলোর অর্থই বুঝতে পারবে না। ধাঁধাগুলো তো এভাবেই কাজ করে।”
গত বছর মহাভারতের রহস্য সমাধান করা ধাঁধাগুলোর কথা স্মরণ করল কলিন আর ডা. শুক্লা। যখনই বুঝতে পেরেছে যে কী খুঁজছে তখনই কেবল সংকেত ভেঙে পদ্যগুলোর মর্মোদ্ধার করতে পেরেছিল।
“তার মানে আমরা এমন কিছু খুঁজছি যেটা সম্পর্কে আলেকজান্ডার জানতেন” মওকা বুঝে পাণ্ডিত্য জাহির করল কলিন, “পার্চমেন্টে লেখা এই ছয়টা পদ্যই আলেকজান্ডারকে গাইড করে সিক্রেটের কাছে নিয়ে গেছে; তার মানে প্রতিটা পদ্যই কোনো না কোনো ল্যান্ডমার্ক কিংবা লোকেশনকে ইশারা করছে।”
“রাইট” খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল বিজয়ের চেহারা। “সারা রাত ধরে আমিও এ কথাটাই ভেবেছি। তাই গবেষণা করতে গিয়েই ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার হয়ে ভোর হয়ে গেছে। তখনই খুঁজে পেয়েছি সমাধান।”
