সাক্সেনার চেহারায় বিরক্তি ফুটে উঠল, “আমি একটা উত্তর জানতে চাইছি”, দৃঢ় স্বরে জানালেন, “নীরবতা কোনো পথ নয়। চাইলে তোমাকে কথা বলাবার জন্য কষ্টদায়ক রাস্তাও বেছে নিতে পারি। তবে এখন বেশ ভদ্র আচরণ করছি। তাই আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিও না।”
“আমি জানি না আপনি কী সম্পর্কে কথা বলছেন।” ওর কাছ থেকে কথা বের করার জন্যে সাক্সেনা কী করতে পারে খুঁজে দেখার কোনো মনোবাসনাই নেই রাধার।
“কিন্তু এটা তো বিশ্বাস করা শক্ত। তুমি আমার অফিসে এসেছ, চারপাশে নাক গলিয়ে সাংবাদিকের ভান করেছ। ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর সাথেও জড়িত। যদিও কোন দক্ষতা বলে সেটা এখনো জানি না। পূর্ব দিল্লির মেডিকেল ফ্যাসিলিটির অগ্নিকাণ্ড সম্পর্কেও তুমি সবকিছু জানো। এমনকি পেশেন্টদের জন্য তৈরি সেলগুলোর কথাও। তাই এটা পরিষ্কার যে তুমি আমাদের সম্পর্কে অনেকটাই জানো।”
বিস্মিত হয়ে গেল রাধা। আইবি’র সাথে ওর সম্পর্কের কথা এরা কিভাবে জানল? “আপনি যে কী বলছেন সে সম্পর্কে আমার সত্যিই কোনো ধারণা নেই।” ক্ষীণকণ্ঠে আপত্তি জানাল রাধা; যদিও ওদের জ্ঞানের বহর দেখে যারপরনাই অবাক হয়ে গেছে।
“ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর সাথে আমার কোনো যোগাযোগ নেই।”
মুখ ভেংচি কাটলেন সাক্সেনা। সাবধান করে দিয়ে বললেন, “আমাদেরকে এত হেলা করোনা। আমাদের দ্বিতীয় দল তোমাদের উপর সারাক্ষণ চোখ রেখেছে। তাই জানি যে আইবি এজেন্টসহ তোমরা সকলেই জোনগড় দুর্গে একসাথে ছিলে। যেটা কিনা বলা বাহুল্য তোমার বাগদত্তার সম্পত্তি।”
“ওকে। মানছি যে আমি ইমরান কিরবাঈকে চিনি। কিন্তু বাকিটা কিন্তু সত্যি বলছি”, জোর দিল রাধা। “সন্দেহ করেছিলাম। ভেবেছিলাম যে ছাই হয়ে যাওয়া সেন্টারে যা ঘটছিল তার সাথে হয়ত টাইটনও জড়িত। কিন্তু আসল কারণটা জানি না।”
প্রথমে ফ্রিম্যানের দিকে একবার ফিরে তারপর রাধার দিকে তীব্র দৃষ্টিতে তাকালেন সাক্সেনা, “তোমাকে বিশ্বাস করব নাকি করব না কিছুই বুঝতে পারছি না।” যদি নাই জানো যে আমরা কী করছি তাহলে তদন্ত করতে এসেছিল কেন?
দ্বিধায় পড়ে গেল রাধা। এই লোকটাকে যে সব বলে দিচ্ছে তা মোটেই ভাল লাগছে না। আবার খানিকটা ভয়ও পাচ্ছে। ব্যথা আর তার হাত পায়ের কাটা দাগ দেখে ভীত হয়ে পড়েছে। একটু আগেও তো নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিল। জানে এদের পক্ষে সবকিছুই করা সম্ভব। আর যা চায় তার জন্য যে কোনো কিছু করতেও এরা দু’বার ভাববে না।
“আমরা ভেবেছিলাম যে টাইটান বায়োটেররিজমের সাথে জড়িত। মানে এখানে এমন কোনো নতুন ধরনের জীবাণু তৈরি হচ্ছে যা সন্ত্রাসীরা আর একনায়কতান্ত্রিক দেশসমূহ ব্যবহার করতে পারবে?” মনের কথা উগরে দিল রাধা।
এক মুহূর্তের জন্য যেন হয়ে গেল সাক্সেনা। আর তার পরপরই অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন, “বায়োটেররিজম!” কনুই দিয়ে আলতো করে ফ্রিম্যানকে তো দিতেই সেও মিটিমিটি হেসে উঠল। “নতুন ধরনের জীবাণু!” মাথা নেড়ে বললেন, “আমাদের প্রজেক্ট সম্পর্কে তুমি সত্যিই জানো না, তাই না?” ফ্রিম্যানের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমার মনে হয় ওকে আর আমাদের কোনো দরকার নেই। তাই ঝেরে ফেলার আগেই আরো কয়েকটা পরীক্ষার কাজে ব্যবহার করে নেয়া যাক।”
দ্বিধান্বিত আর আতঙ্কগ্রস্ত রাধাকে একা রেখে রুম থেকে বেরিয়ে গেল দুই ডাক্তার। নিজের ভাগ্য সম্পর্কে এখন আর কোনো সন্দেহই নেই। গিনিপিগ হিসেবে ব্যবহৃত না হলে এতক্ষণে মরে ভূত হয়ে যেত।
.
৪৩. ধাঁধার একটা অংশ
“দেখো” ডেস্ক থেকে এক তাড়া কাগজ তুলে কফি টেবিলের চারধারে বসে থাকা অন্যদের কাছে নিয়ে এলো বিজয়, “এই ভ্রমণে আলেকজান্ডার যে রাস্তা ব্যবহার করেছিলেন সেটাকে ঘিরে দুটো রহস্য আছে।”
আধুনিক কালের আফগানিস্তান, পাকিস্তান আর ভারতের উপর দিয়ে আলেকজান্ডারের গমন পথ চিহ্নিত করা একটা মানচিত্র বিছিয়ে দিল বিজয়। উজ্জ্বল লাল কালি দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে সব রাস্তা।
“প্রথমটা এখানে” উপকূলের কাছাকাছি দক্ষিণ পাকিস্তানের একটা অঞ্চল ইশারা করে বলল, “ইন্দাস থেকে নেমে ব্যবিলনে ফেরার পথে আলেকজান্ডার সেনাবাহিনিকে দু’ভাগে ভাগ করে ফেলেন। একাংশকে সমুদ্র পথে পারস্য উপসাগরের পথে পাঠিয়ে দেন। উপকূল থেকে তারবাত পর্যন্ত বাকি অংশকে তিনি নিজে নেতৃত্ব দিয়েছেন।”
মানচিত্রে শহর দেখিয়ে বলল, আর তারপর কোনো এক ব্যাখ্যাতীত কারণে পাসনির মধ্য দিয়ে দক্ষিণের সমুদ্রমুখে চলে যান; বিপদ সংকুল পথের মধ্য দিয়ে পার হয়েছেন একশত মাইল মাকরান মরুভূমি। মাকরান পার হতে পুরো ষাট দিন লেগে যায়, আর সেনাবাহিনির বেশ বড় একটা অংশও খুইয়ে বসেন।”
“অদ্ভুত তো।” মন্তব্য করলেন ডা. শুক্লা, “ফেরার পথে কেন সমুদ্র পথে না গিয়ে সেনাবাহিনিকে বিভক্ত করে দিলেন?”
“আর শুধু তাই নয়” এই গল্পটা জানা থাকায় এবারে আলোচনায় অংশ নিল এলিস, “তারাবাত থেকে পারসেপোলিস একেবারে সোজা একটা লাইন।” মানচিত্রের দিকে ইশারা করে বলল, “আলেকজান্ডার মাকরান থেকে পাসনি গিয়ে সোজা পারসেপোলিসের পথ ধরেছিলেন। যদি সেনাবাহিনিকে দু’ভাগে ভাগ করার কোনো যুক্তিও থাকে কিংবা স্থলপথে পারসোপোলিস গেলেও মরুভূমি পার হবার কিন্তু আদৌ কোনো প্রয়োজন ছিল না। আধুনিক কালের লেখকদের ধারণা, আলেকজান্ডার এ মরুভূমিও জয় করতে চেয়েছিলেন। কারণ রানি সেমিরামিস আর দ্য গ্রেট সাইরাসও পার হয়েছিল এ মরুভূমি।”
