“বুঝতে পেরেছি তুমি কী বলতে চাইছ” বলে উঠল এলিস, “অলিম্পিয়াস আলেকজান্ডারকে কিউব আর পার্চমেন্ট দিয়েছেন। তার মানে হয়ত এ অভিযান গোপন রাখার কথাও বলেছেন। সারা দুনিয়া জয় করে পৃথিবীর শেষ মাথা অব্দি যাওয়ার পেছনে এটাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু মেসিডোনিয়া ত্যাগ করার সময়ে সেনাবাহিনিকে কেবল পারস্যে আক্রমণের কথাই বলেছেন। ইন্দুস উপত্যকার কথা নয়। এমন না যে সৈন্যদের অপারগতার কথা ভেবে ভয় পেয়েছেন; চেয়েছেন যেন তারা “দেবতাদের রহস্য সম্পর্কে না জানে। আর যদি আমার ধারণা সঠিক হয় তাহলে তুমিও ভাবছ যে বীজ নদী তীরে বিদ্রোহের মাধ্যমে আলেকজান্ডারের মিশন সফল হবার ঘটনা আর দেশে ফেরার বাসনাকে ঢেকে দেয়া হয়েছে।”
“ঠিক তাই।” উজ্জ্বল হয়ে উঠল বিজয়ের চেহারা। “যা খুঁজছিলেন তা পেয়ে যাওয়ায় বীজের কাছাকাছি নির্মিত বেদির নিচে ধাতব পাতটাকে সমাধিস্থ করে গেছেন। মনে নেই, ইউমিনেস লিখেছেন যে পাঁচ মাথাঅলা সাপের গুহায় ঢোকার পর থেকে আলেকজান্ডার দেবতা হয়ে গেছেন? আর এটাও জানি যে ব্যাকট্রিয়ার উপজাতিদেরকে হারানোর পর থেকেই আলেকজান্ডার নিজেকে দেবতা হিসেবে দাবি করা শুরু করেছেন-এই কারণে ক্যালিসথিনসকে জীবনও দিতে হল।”
“তুমি তাহলে বলতে চাচ্ছো যে”, ধীরে ধীরে বলে উঠল কলিন, ‘অলিম্পয়াস যে পার্চমেন্টটা দিয়েছিলেন তার সাথে আলেকজান্ডার পারস্য থেকে ভারতে আসার জন্য যে পথ অনুসরণ করেছেন সেটাও জড়িত। তাই তুমি এই রাস্তাটাই খুঁজছিলে।”
‘বিঙ্গো!” উত্তেজনায় চকচক করছে বিজয়ের চেহারা। এটা ওর নিজের যুক্তি। দেখে ভাল লাগছে যে বাকিরাও তাকে অনুসরণ করছে। নিজের অনুমানের বৈধতাও প্রতিষ্ঠিত হল। এর মধ্যেই পরবর্তী পদক্ষেপও ঠিক করে ফেলেছে। নির্ভর করছে কেবল এই আলোচনার শেষাংশের উপর।
“তো, তুমি কী খুঁজে পেলে?” জানতে চাইল কলিন।
.
৪২. বন্দী
ঘুম ভাঙ্গতেই চমকে গেল রাধা। কয়েক মুহূর্ত লাগল ধাতস্থ হতে। চারপাশের একেবারে শ্বেতশুভ্র এই পরিবেশ ওর কাছে পুরোপুরি অপরিচিত।
তারপরেই মনে পড়ল সবকিছু। এয়ারপোর্ট এক্সপ্রেস। পিস্তল হাতে একটা লোক। চেতনা হারালো। হাসপাতাল গাউন। হাতের বাঁধন। অস্বস্তিকর এক ধরনের উপলব্ধির সাথে সাথে ক্রোধে ফেটে পড়া। কিন্তু বহু চেষ্টা করেও তারপরে আর কিছু মনে করতে পারছে না। কী হয়েছিল? এবার বুঝতে পারল যে আগেরবার যেখানে ঘুম ভেঙেছিল তার চেয়ে ওকে ছোট আরেকটা রুমে নিয়ে আসা হয়েছে।
নিচে তাকাল। পরনে এখনো গাউন। কিন্তু বাঁধনগুলো আর নেই। কতক্ষণ ধরে এভাবে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে?
অত্যন্ত সতর্কভাবে বিছানার উপর উঠে বসে পাশ দিয়ে পা ঝুলিয়ে দিল। বেশ দুর্বল লাগছে। অবসন্ন; যেন কঠিন কোনো শারীরিক পরিশ্রমে সব শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেছে।
হঠাৎ করেই বুঝতে পারল যে কব্জি আর গোড়ালিতে অসম্ভব ব্যথা করছে। একে একে পরীক্ষা করতে গিয়ে মাংস কেটে বসে যাওয়া নাইলনের দড়ির ক্ষতচিহ্ন দেখে অবাক হয়ে গেল।
বিছানা থেকে নামতেই খালি পায়ে সাদা মার্বেলের মেঝে বেশ ঠাণ্ডা মনে হল। রুমে কোনো স্লিপারও নেই। দেয়ালগুলো একেবারে ইস্পাত কঠিন শক্ত। কাঁচের দরজা থাকলেও তালা লাগানো। হ্যাঁন্ডেল ধরে কয়েকবার ঝাঁকুনি দিয়ে চেষ্টা করলেও কোনো লাভ হল না। দরজাটা কেবল বাইরে থেকেই খোলা যায়। মানুষ চাইলে ভেতরে আসতে পারবে; কিন্তু ও বাইরে যেতে পারবে না। দরজার পাশের সেন্সরকে সক্রিয় করে তোলার অ্যাকসেস কার্ড ছাড়া তো নয়ই। তার মানে ও এখন সত্যিকারের বন্দী।
হাতল থেকে হাত সরাতেই হঠাৎ করে একপাশে সরে গেল দরজা। বাইরের দিকে খুলে গেল। সভয়ে পিছিয়ে এলো রাধা। রুমে ঢুকলেন সাক্সেনা আর ফ্রিম্যান।
“আজ আমাদের রোগিণী কেমন আছে?” আমুদে কন্ঠে জানতে চাইলেন সাক্সেনা।
“আমি রোগী নই!” রাগে জ্বলে উঠল রাধার চোখ,”এখানে কেন আনা হয়েছে আমাকে?”।
“আজ প্রশ্ন কেবল আমিই করব।” বিছানার দিকে ইশারা করলেন সাক্সেনা, “বসো।”
বমি বমি ভাবসহ হঠাৎ করেই দুর্বল বোধ করল রাধা। তাড়াতাড়ি ফিরে গিয়ে বিছানায় উঠে বসল। দাঁড়িয়ে থাকতে না হওয়াতে ভালই লাগছে। জানে না কেন পা দুটোতে কোনো শক্তি পাচ্ছে না।
“মানসিক যাতনা বেড়ে যাবার পরবর্তী অবস্থা” রাধার অস্বস্তি দেখে সাক্সেনাকে মন্তব্য করল ফ্রিম্যান; কারণটাও একেবারে সঠিকভাবে অনুমান করেছে, “বমি ভাব আর দুর্বলতা।”
“উনি কে?” কঠিন স্বরে জানতে চাইল রাধা।
“আহ তোমার সাথে পরিচয়ই করানো হয়নি” ফিম্যানের দিকে তাকালেন সাক্সেনা, “ডা, গ্যারি ফ্রিম্যান। জেনেটিক বিশেষজ্ঞ এবং টাইটান ফার্মাসিউটিক্যালসের জেনেটিকস্ হেড। বহু বছর ধরেই আমাদের হয়ে একটা অতি গোপনীয় প্রজেক্টে কাজ করছেন। আর যুগান্তকারী এক আবিষ্কারের একেবারে কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন। এবার, কয়েকটা উত্তর দাও তো। প্রথম প্রশ্ন : ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো আমাদের মিশন সম্পর্কে কী কী জানে?”
শূন্য চোখে তাকাল রাধা। লোকটা কোন মিশনের কথা বলছে সে সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই নেই। কেবল এটুকু বুঝতে পারছে যে ইমরানের সন্দেহই সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। ধ্বংস হয়ে যাওয়া মেডিকেল সেন্টারের গোপন বেজমেন্টের ক্লিনিকাল ট্রায়ালের সাথে কোনো না কোনো ভাবে টাইটান ফার্মাও জড়িত। কিন্তু একজন জেনেটিকস হেড ক্লিনিকাল ট্রায়ালের সাথে কিভাবে জড়িয়ে গেলেন?
