কলিন স্টাডিতে ঢুকে দেখে ডেস্কে হাতের উপর মাথা রেখে অঘোরে ঘুমাচ্ছে বিজয়। সর্বত্র ছড়িয়ে আছে প্রিন্ট আউটের কাগজ। বিজয়ের নোটবুকও খোলা। তার উপরে কলম। সারা রাত যে বিজয় কত ব্যস্ত ছিল তা পরিষ্কার ভাবেই বোঝা যাচ্ছে। শুধু চিন্তা এটাই যে ওর বন্ধু কী করছিল আর এমন কিছু কি খুঁজে পেয়েছে যাতে উপকার হবে?
বিজয়ের কাছে হেঁটে গিয়ে আস্তে করে নাড়া দিল কলিন, “হেই, দোস্ত, উঠো।”
ডেস্ক থেকে মাথা তুলে ঝাপসা চোখে কলিনের দিকে তাকাল বিজয়, “ঘুমিয়ে পড়েছিলাম” বিড়বিড় করে বলে উঠল।
“কোনো সমস্যা নেই। দেখো নিজে কী হাল করেছ। যাও নিচে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে এসো।”
বিজয় মাথা নাড়লেও এখনো ঘুমের রেশ কাটেনি। আর তারপরই কী যেন একটা মনে পড়তেই একেবারে সিধে হয়ে বসল।
“একটা জিনিস পেয়েছি” কলিনকে জানাল, “চলো নাশতা করার সময়ে তোমাদেরকে জানাব।”
রাতে কী খুঁজে পেয়েছে না জানিয়ে বিস্মিত কলিনকে রেখে তাড়াহুড়া করে স্টাডি থেকে বেরিয়ে গেল বিজয়।
এক ঘণ্টা পরেই আবার স্টাডিতে এসে মিলিত হল সবাই। ডেস্কে বসে কাগজপত্র গুছিয়ে তূপ করে রাখল বিজয়।
এদিকে কৌতূহল আর এক রাশ প্রত্যাশা নিয়ে স্থির দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে আছে তিন জোড়া চোখ।
“দ্য গ্রেট আলেকজান্ডারের উপর আমি বেশ খানিকটা গবেষণা করেছি” শুরু করল বিজয়, “মাইকেল উডের বিবিসি ডকুমেন্টারি ডাউনলোড করে সেটাও দেখেছি, পুরো চার ঘণ্টা। উনার সম্পর্কে লেখা বিভিন্ন বইয়ের অংশ পড়েছি। তোমরা বিশ্বাসই করতে পারবে না যে কতজন উনার সম্পর্কে লিখে গেছেন। মেসিডোনিয়া থেকে ভারতে আসার জন্য যে রাস্তা অনুসরণ করেছিলেন। তাও পড়েছি। পথিমধ্যে কাদের সাথে যুদ্ধ করেছেন, বিভিন্ন শহরে কী কী করেছেন সেসব গল্প পড়েছি। তাই অনেক কিছুই জানতে পেরেছি। যেমন উনি ছিলেন ভয়ানক জেদি। একগুয়েমির জন্য কোনো কিছুই তাঁকে রুখতে পারত না। আর ছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
“শুনে মনে হচ্ছে অনেকটা তোমার মত”, দাঁত বের করে হেসে ফেলল কলিন, “নিজেকে বর্ণনা করতে হলেও এসবই বলতে হবে তোমাকে।”
বিজয় কুদ্ধ দৃষ্টিতে তাকালেও কোনো উত্তর দিল না।
এলিস কিছু না বললেও মনে মনে সেও একই কথাই ভাবছে। বিজয়ের দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মনোভাব, অধ্যবসায় আর সবকিছুকে একবাক্যে বিশ্বাস না করার প্রবণতা ওকে অনেক ক্ষেত্রেই সফল হতে সাহায্য করেছে। এলিস নিজেও এ কারণেই ছেলেটার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল। এমন এক পুরুষ যে নিজের সম্পর্কে জানে। আর তাকে অনুসরণ করতে ভয় পায় না। কিন্তু একই সাথে ওদের ব্রেক আপের কারণও এটাই।
“যেটা মনে হয়েছে তা হল প্রতি পদক্ষেপে আলেকজান্ডাকে কিছু একটা প্রেরণা জুগিয়ে ছিল যখন মেসিডোনিয়া ছেড়েছেন এটা ছিল পোথোস আকাঙ্ক্ষা, বহুদিনের অপেক্ষা-পারসীয়দের হাতে গ্রিকদের পরাজয়ের প্রতিশোধ নেয়া। তাই তিনি পারস্যের অগ্রযাত্রা আর তারপর দারিয়ুসকে পরাজিত করলেন। শুধু তাই না, দারিয়ুস যখন তার নিজের সভাসদদের হাতে প্রাণ হারায় তখন আলেকজান্ডার তাদের পিছু ধাওয়া করে পার্বত্য অঞ্চল পর্যন্ত চলে যান। তারপর সবাইকে ধরে হত্যা করেন। এবার তিনি হন পারস্যের শাসনকর্তা; কিন্তু সেখানেই থেমে থাকেন নি। আরেক আকাঙ্ক্ষার বশবর্তী হয়ে পূর্বদিকে গমন করেছেন। আমি যতগুলো লেখা পড়েছি সে সমস্ত লেখকেরা এ মনোবাসনাকে সারা দুনিয়া জয় করে একেবারে শেষ প্রান্ত পর্যন্ত যাবার উচ্চাকাঙ্ক্ষা হিসেবেই বর্ণনা করেছেন। এরই মাঝে এরিস্টোটলের কাছ থেকে আলেকজান্ডার জেনে গেছেন যে ইন্দুসেই আছে এক বিশাল মহাসমুদ্র আর পৃথিবীর শেষ প্রান্ত।”
কিছুক্ষণ থেমে এলিসের দিকে তাকাতেই মাথা নেড়ে সায় দিল মেয়েটা, “বলে যাও, চমৎকার হচ্ছে।”
“তারপর এখানে এসেই সবকিছু রহস্যময় হয়ে উঠেছে।” সমর্থন পেয়ে আবার শুরু করল বিজয়, “প্রথমত, গ্রিস ত্যাগ করার সময় আলেকজান্ডার তার সেনাবাহিনিকে কখনোই বলেন নি যে তারা পথিবীর শেষ মাথা পর্যন্ত যাবে। শুধু পারস্য জয়ের পরেই জানান যে এবার পূর্বদিকে যাবেন। তবে হ্যাঁ এর যৌক্তিক ব্যাখ্যাও আছে। সৈন্যদেরকে জানালে হয়ত নিজ দেশ থেকে এতদূরে যেতে তারা রাজি হত না। কিন্তু কেন যেন আমার একটু খটকা লাগছে। নেতা হিসেবেই আলেকজান্ডার ছিলেন অসাধারণ। নিজ বাহিনিকে নেতৃত্ব দিয়ে বিশ হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে মেসিডোনিয়া থেকে গ্রিস এসেছেন তারপর আবার ব্যাবিলনে ফিরে গেছেন। সকলে মিলে হাঁড় কাঁপানো ঠাণ্ডায় পার্বত্য অঞ্চল, উত্তপ্ত মরুভূমি পার হয়েছেন। কখনো কখনো খাবার আর পানিও ছিল না। বিনা বাক্য ব্যয়ে সৈন্যরা সর্বত্র আলেকজান্ডারকে অনুসরণ করেছে। কেবল মাত্র পাঞ্জাবের বীজ (Beas) নদী পর্যন্ত গিয়ে আলেকজান্ডারকে দেশে ফেরার আকুতি জানিয়ে আর না এগোনোর বায়না ধরে। তার মানে আলেকজান্ডার যদি চাইতেন তাহলে এ সৈন্যরা হয়ত পৃথিবীর একেবারে গভীর পর্যন্ত চলে যেত।”
চারপাশে তাকিয়ে বাকিদের অবস্থা দেখে নিল বিজয়। তারাও তার দিকে তাকিয়ে আছে দেখে সন্তুষ্ট হয়ে আবার শুরু করল, “তবে লেখকদের কাছ থেকে এ সম্পর্কে ভিন্ন মত পাওয়া গেছে। কারণ তাদের কাছে সিক্রেট জার্নাল কিংবা কিউবটা ছিল না। তারা এটাও জানত না যে আলেকজান্ডার এক গোপন অনুসন্ধানে লিপ্ত হয়েছিলেন; যে সম্পর্কে কেবল তিনি আর তার মা জানতেন। কিন্তু আমাদের ধারণা যা ঘটেছে তার পিছনে যৌক্তিক ব্যাখ্যা আছে।”
