“সমস্ত সম্ভাবনাই খতিয়ে দেখছে আইবি”, ধৈর্য বজায় রেখেই জানাল বিজয়। ডা. শুক্লার খাতিরে চেষ্টা করছে নিজেকে স্বাভাবিক রাখতে। “আমাদেরকে আসলে ওদের উপর ভরসা রাখতে হবে। আশা করি শীঘ্রিই কোনো না কোনো খবর পাওয়া যাবে।”
এবার কথা বলল এলিস, “যাদুঘরে সোনালি চুলের লোকটা একটা কথা বলেছিল।” বিজয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “মনে আছে যখন আমাদেরকে শুনেছিল? তখন ইমরান আর রাধা সম্পর্কে কী যেন একটা বলেছিল।”
“বলেছিল যে ওদের ব্যবস্থা করা হয়েছে।” গোমড়ামুখে উত্তর দিল বিজয়। রাধা আর ইমরান দুজনেই যে টার্গেট হবে সেটা যে কেন ওর মাথায় এল না। তবে জানে যে এর জন্য কাউকে দায়ী করা যায় না। তখন তো সুতোর উপর ঝুলছিল তাদের নিজেদের ভাগ্য! কপালের জোর বলতে হবে বেঁচে ফিরতে পেরেছে। লোকগুলো তো পেশাদার খুনিই ছিল।
“হ্যাঁ, কিন্তু মনে নেই এটাও তো বলেছিল যে ওরা দুজন চারপাশে নাক গলাচ্ছিল।” সতর্ক চোখে তাকাল এলিস। জানে এসময় এটা বলাটা হয়ত ঠিক হবে না। কিন্তু একই সাথে এর মাধ্যমে নতুন একটা দিকও পাওয়া যাবে।
“ইয়াহ্, মনে আছে।” কলিন ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই বিজয় আর ডা. শুক্লাও মাথা নাড়লেন। তবে এবারে উরুতে চাপড় মেরে উঠল কলিন। বুঝতে পারল না এলিস কী বলতে চাইছে, “ও ঈশ্বর! দুটো ঘটনা আসলে একসাথে জড়িত।”
এখনো দ্বিধায় ভুগছে বিজয় আর ভা, শুক্লা। এলিস বুঝতে পারল দুজনেই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ায় চিন্তাশক্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। তাই ব্যাখ্যা করে বলল, “এতদিন ধরে আমরা ভেবে এসেছি যে গ্রিসের খনন কাজ আর আমার সাথে যা ঘটেছে তার সাথে পিটারের জড়িত থাকা আর এখানে, ভারতে ইমরানের বায়ো-টেররিজমের সম্ভাব্য উদয় খুঁজে পাবার মাঝে কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু এটা কি হতে পারে যে এই দুই ঘটনা আসলে পরস্পরের সাথে সংযুক্ত?”
বিজয়ের দিকে তাকালেন ডা. শুক্লা। বুঝতে পারছেন না খবরটা ভালো না মন্দ। কিন্তু সাথে সাথে কোনো উত্তর দিল না বিজয়। এতক্ষণ সে নিজেও জাদুঘরে ঘটে যাওয়া সমস্ত আলাপচারিতা আর ঘটনা নিয়ে মনে মনে বিশ্লেষণ করছিল আর এলিস ঠিক তার চিন্তার সূত্রগুলোকেই শব্দ হিসেবে উচ্চারণ করেছে। দুজনের সম্পর্কের শুরু থেকেই মেয়েটা বিজয়কে বেশ ভালোভাবেই বুঝতে পারত। বিজয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করার চমৎকার দক্ষতা আছে, একই সাথে নিজের সহজাত বোধের উপরও নির্ভর করে, কিলার কম্বিনেশন বলা যায়। এলিস বুঝতে পারল যে বিজয় মনে মনে তার দক্ষতা আর বোধশক্তি ব্যবহার করে ওর কথার সত্যতা যাচাই করছে।
“তোমার কথাই হয়ত ঠিক” অবশেষে জানাল বিজয়, “ওরা আমাদের সবার সম্পর্কেই জানে কেবল ডা. শুক্লা ছাড়া। তাদের কাছে এমন প্রযুক্তি আছে যাতে আমাদের সমস্ত গতিবিধি ধরা পড়ে। সেভাবেই দুর্গে এলিসের উপস্থিতির কথা জেনে জাদুঘর পর্যন্ত আমাদেরকে অনুসরণ করেছে। রাধা আর ইমরানকে অনুসরণ করেছিল। তাই জানত যে ওরা টাইটান ফার্মাতে যাবে। জাদুঘরের সোনালি চুলের লোকটার কথা থেকে এটুকু স্পষ্ট বোঝা গেছে। আর তারপর থেকে ইমরান আর রাধাকে টার্গেট করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে: গ্রিসের খনন কাজ আর বায়োটেররিজমের মধ্যে সম্পর্কটা কোথায়? জানি যে তারা কিউবটার পেছনে লেগেছে। এখন জানি যে আলেকজান্ডারও কিছু একটার খোঁজে ভারতে এসেছিলেন। এমন কিছু যাকে ইউমেনিস ‘দেবতাদের সিক্রেট নামে অভিহিত করে গেছেন।” সমস্বরে নিজের চিন্তা সকলের কাছে খুলে বলল বিজয়।
অন্যেরা চুপ করে বসে শুনছে। বিজয়কে এলিস আর কলিন ভালভাবেই চেনে; তাই মাঝখানে কোনো কথা বলে ওকে বাধা দিল না। রাধার জন্য দুশ্চিন্তায় অস্থির ডা. শুক্লা ঠিকভাবে শুনতেই পেল না যে বিজয় কী বলছে।
“তো” আবারো বলে উঠল বিজয়, “উপসংহারে বলা যায় আলেকজান্ডার যেটা খুঁজছিল সেটাই আসলে বায়োটেররিজমের সম্ভাব্য উৎস। আমার মাথায় শুধু একটাই ধারণা আছে আর তা হল এটা এমন এক ভাইরাস কিংবা ব্যাকটেরিয়া যা মানুষকে ধ্বংস করে দিতে পারে। এমন কিছু যা সন্ত্রাসীরা নিজেদের কাজে লাগাবে। আর কিই বা হতে পারে? এর মাধ্যমে টাইটানের ক্লিনিক্লাল ট্রায়ালে যেসব ঘোট ঘোট সেলগুলো ছিল সেগুলোর উপস্থিতির কারণও স্পষ্ট হয়ে গেছে। টেস্ট রিপোর্টেও অজানা এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া আর ভাইরাসের কথা পাওয়া গেছে। কিন্তু তাতে তো আরো বহু প্রশ্নর উদয় হয়েছে। একটা ব্যাকটেরিয়া কিংবা ভাইরাসকে কেন “দেবতাদের রহস্য” বলা হবে? আলেকজান্ডারই বা কেন এই রহস্য খুঁজছিলেন? যদি পেতেন তাহলে কী করতেন? নাকি অন্য কিছু যা আমাদের চোখে পড়ছে না?”
পুরো ব্যাপারটা হজম করতে গিয়ে বাকিরা একেবারে নিশ্চুপ হয়ে গেল। বিজয়ের উপসংহার পুরোপুরি যৌক্তিক মনে হচ্ছে। ও যে প্রশ্নগুলো তুলেছে সেগুলোও প্রাসঙ্গিক। কিন্তু পরিষ্কার কোনো উত্তর নেই। বিশেষ করে আলেকজান্ডারের অভিযানে যদি কোনো ব্যাকটেরিয়া কিংবা ভাইরাসই মুখ্য উদ্দেশ্য হয় তাহলে বায়োটেররিজমের সাথে এর সম্পর্ক কী?
উঠে দাঁড়ালেন ডা. শুক্লা, “রাত হয়ে গেছে। আমি আসি।” বিষণ্ণ ভঙ্গিতে অন্যদেরকে জানালেন, আসলে এ মুহূর্তে একটু একা থাকতে চাইছেন। তাই আলেকজান্ডার আর বায়োটেররিজমের মাঝে সম্পর্ক নিয়ে কোনো আগ্রহই পাচ্ছে না। তার অপহৃত কন্যা সম্পর্কে কেউ কিছু জানে না। এমনকি গোয়েন্দা সংস্থাও না। আর যদি এতে সন্ত্রাসীরা জড়িত থাকে তার মানে মেয়েটা কতটা বিপদের মধ্যে আছে। একজন সিনিয়র আইবি অফিসারের অ্যাপার্টমেন্টে যদি বোমার বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে তাহলে তাদের হাতে বন্দী রাধার সাথে কী কী ঘটতে পারে?
