এতক্ষণে বুঝতে পারল যে গায়ে একটা হসপিটাল গাউন জড়িয়ে শুয়ে আছে। তাহলে তার নিজের জিন্স আর টপ কোথায় গেল? কে তার পোশাক বদলে দিয়েছে? অজানা একজন এরকমটা করেছে ভাবতেই অপমানবোধের পাশাপাশি হঠাৎ এক ক্রোধে দিশেহারা বোধ করল রাধা।
আস্তে আস্তে রাগ বাড়তেই ভেসে গেল সমস্ত যুক্তিবোধ। প্রচণ্ড জোরে চিৎকার করতে করতে শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে লড়াই শুরু করল এ বন্দীদশা
থেকে মুক্তি লাভের জন্য।
.
… নাকি গিনিপিগ?
সেন্টারের কন্ট্রোল রুমের একটা ব্যাঙ্কে বসে কৌতূহল নিয়ে একদৃষ্টে ক্যামেরার ভিডিও মনিটরের দিকে তাকিয়ে আছেন ডা, বরুন সাক্সেনা। এরপর সঙ্গীর দিকে ঘুরে মাথা নেড়ে জানালেন, “তুমি ঠিকই বলেছ গ্যারি। আমি জানতামই না যে এই ড্রাগের এতটা শক্ত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হবে।”
দাত বের করে হেসে ফেলল গ্যারি ফ্রিম্যান। “হেই, আপনাকে বলেছিলাম বলতে ভাল লাগছে না; কিন্তু সত্যিই তা বলেছিলাম। হঠাৎ করে আবেগপ্রবণ হয়ে উঠা রাধাকে যে ভিডিও মনিটরে দেখা যাচ্ছে তার উপর বুড়ো আঙুল নাচিয়ে জানাল, “আমার মনে হয় এখনই ওকে অ্যান্টিভোট দেয়া উচিত। যদি ওকে সম্পূর্ণ অক্ষত রাখতে চান। নয়ত আগামী দু’ঘণ্টায়ও কাটবে না এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আর ততক্ষণে মেয়েটা একটা কিংবা দুটো হাতই হারিয়ে ফেলবে।”
অন্যদিকে পর্দায় দেখা যাচ্ছে এখনো বাধন নিয়ে লড়াই করছে রাধা। হাতের ইনজেকশন সূচের কথা যেন ভুলেই গেছে। অসম্ভব জোরে ঝাঁকি খাচ্ছে টিউবে লাগানো স্যালাইনের প্যাকেট।
শেষ বারের মত ভিডিও মনিটরের দিকে তাকিয়ে ইন্টারকমে কয়েকটা নির্দেশ দিলেন সাক্সেনা। কিছুক্ষণের মধ্যেই রুমে ঢুকে স্যালাইনের মধ্যে কিছু একটা মিশিয়ে দিল নার্স। অ্যান্টিডোট দ্রুত কাজ করায় প্রায় সাথে সাথে শান্ত হয়ে গেল রাধা।
“রেগুলার নমুনার ক্ষেত্রে এ ধরনের দৃশ্য হয়ত দেখার সুযোগ পাবেন না।” মিটিমিটি হাসছে ফ্রিম্যান। “ওদের শরীরে আমরা এতকিছু ইনজেকশনের মাধ্যমে ভরেছি যে ড্রাগের সাথে মিশে কোনটা যে কোন প্রতিক্রিয়া করে তা বলা মুশকিল। তবে এটাকে সময় মত পাওয়াতে ভালই হয়েছে। একেবারে সঠিক সময়ে।”
“ওকে পাইনি” রুম থেকে বেরোবার সময় জানালেন সাক্সেনা, “এখানে কুপার নিয়ে এসেছে। আজ নয়ত কাল ওকে ঝেরে ফেলতেই হবে। তার আগে জানতে হবে যে মেয়েটা অপারেশন মহাভারত সম্পর্কে কী কী জানে।”
“সত্যি?” উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল ফ্রিম্যানের চেহারা। “দেখুন আপনারা আমাকে এখানে বন্দী করে রেখেছেন আর তাই বাইরের দুনিয়ায় যে কী ঘটেছে আমি কিছু জানি না।”
“আর কিছু তো করারও নেই।” পাল্টা জবাব দিলেন সাক্সেনা, “আমরা এখানে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল করতে এসেছি। এমনকি আমিও তো খুব একটা বাইরে যেতে পারি না। এই ফ্যাসিলিটিকে কোনোভাবেই টাইটানের সাথে জুড়তে দেয়া যাবে না। আর তোমরা এখানে যে বিষয়ে পড়াশোনা করো তা যেকোনো মূল্যেই গোপন রাখতে হবে। এ কথা তুমিও জানেনা। যদি একটা শব্দও বাইরে যায় ধুন্ধুমার লেগে যাবে। বিশেষ করে যদি প্রকাশ পায় যে টাইটানের জেনেটেকিস হেড এই গবেষণা চালাচ্ছে।”
“ইয়াহ, আমি জানি, জানি। কিন্তু তার মানে তো এই না যে এতে খুশি হতে হবে।” ঘোৎ ঘোঁৎ করে উঠল ফ্রিম্যান, “কোনো ঝুঁকি কি দেখা দিয়েছে?”
কাঁধ ঝাঁকালেন সাক্সেনা, “জানি না। এই কারণেই তো মেয়েটাকে ধরে এনেছি। খুঁজে বের করা প্রয়োজন। আমার কাছে তো সাংবাদিক সেজে এসেছিল। সে সময়ে জানতাম না। টের পেলাম যখন কুপার এসে মেয়েটা আর স্বরূপের কাছে আসা আইবি এজেন্টের মধ্যেকার যোগাযোগের কথা জানাল। তখন শুনলাম যে মেয়েটা আন্ডারকাভার হিসেবে কাজ করছে।”
শিস দিয়ে উঠল ফ্রিম্যান। তার মানে সেও আইবি লোকটার সাথে কাজ করছে? ভারতীয় গোয়েন্দা বাহিনিতে?”
“এখনো জানি না। কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না। আইবির লোকটা মারা গেছে…কিংবা যাচ্ছে। কুপার সেটা সামলেছে। আর মেয়েটা কী জানে, জানার পর তারও একই পরিণতি হবে। ততক্ষণ পর্যন্ত কুপার ওকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। তার মানে যতক্ষণ এখানে আছে, আমাদেরও ব্যবহার করতে দ্বিধা নেই। এতটা ভালো আর একেবারে তাজা নমুনা পাওয়াটা চাট্টিখানি কথা নয়।” কদর্যভাবে হেসে ফেললেন সাক্সেনা; ফ্রিম্যানও মিটিমিটি হাসছে।
.
৩৯. পাওয়া গেল সম্পর্ক
কেল্লার স্টাডিতে একসাথে বসে আছে বিজয়, কলিন, এলিস আর ডা. শুক্লা। কিছুক্ষণ আগে সবাইকে এসকর্ট দিয়ে পৌঁছে দিয়ে গেছে ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর এজেন্টরা। তারপর আবার ফিরে গেছে। যদি আরো কেউ তাদের পিছু নিয়ে থাকে কিংবা নজরদারি করে সেজন্য খুব সাবধান থাকতে হয়েছে।
দুর্গে ফেরার পর থেকেই বেশ স্বস্তি আর নিরাপদ বোধ করছে বিজয়। এখানে অন্তত কোনো ভয় নেই। কিন্তু জোনগড়ে ফেরা আর তারপরেও এখন পর্যন্ত রাধার কোনো সংবাদ না পাওয়ায় সবাই বেশ উদ্বিগ্নও বটে। মনে হচ্ছে যেন একেবারে বাতাসে মিলিয়ে গেছে মেয়েটা।
কন্যার শোকে মনমরা হয়ে বসে আছেন ডা. শুক্লা, “বৈদ্য টাইটানে গিয়ে তদন্ত করছেন না কেন? নির্দিষ্ট কাউকে না হলেও এতক্ষণে প্রায় দশবারের উপর করে ফেলেছেন এ প্রশ্ন। যদিও বিজয় এই বলে আশ্বস্ত করেছে যে বৈদ্য নিজে টাইটান ফার্মাসিউটিক্যালসের সিইও স্বরূপ ভার্মার সাথে কথা বলেছেন। ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর খোদ ডিরেক্টরকে নিজ অফিসে দেখে লোকটা রীতিমত ঘাবড়ে গেলেও ইমরান আর রাধার ব্যাপারে অকৃত্রিম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এমনকি তদন্ত কাজ আর রাধাকে খোঁজার ব্যাপারেও পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। পাশাপাশি ভারতে টাইটানের প্রতিটি অফিস আর আউটসোর্সড ফ্যাসিলিটিতে আইবি এজেন্টদের পরিদর্শনের প্রস্তাবও দিয়েছেন।
