লোকটার সেঁতো হাসি দেখেই সব বুঝে গেল রাধা। “আমরা এয়ারপোর্টে চলে এসেছি মাই ডিয়ার।” ব্যঙ্গের স্বরে বলে উঠল লোক। “ওয়েলকাম টু ইন্দিরা গান্ধী ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট।” একেবারে নিখুঁতভাবে নকল করল ঘোষণাটা। আর লোকটার গলার স্বরও হুবহু মিলে গেল ইংরেজি সেই ঘোষণার সাথে। “সিটবেল্ট বেঁধে নাও সোনামণি। তোমাকে এখন দীর্ঘ একটা ভ্রমণে যেতে হবে।”
.
আইজিআই ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট, মেট্রো স্টেশন
হতভম্ব হয়ে স্টেশনের দিকে তাকিয়ে আছে বিজয়। দশ মিনিট আগে পৌঁছে দেখে যে আবার সেন্ট্রাল দিল্লির উদ্দেশ্যে ছেড়ে গেছে ট্রেন। এদিকে প্লাটফর্মে রাধার কোনো চিহ্নও নেই। চারপাশে শুধু পরবর্তী ট্রেনের জন্য অপেক্ষারত প্যাসেঞ্জার যারা এই মাত্র ফ্লাইট থেকে নেমেছে। গেল কোথায় মেয়েটা!!
স্টেশনের এ মাথা থেকে ও মাথা পর্যন্ত আরো একবার চক্কর দিয়ে এলো বিজয়; যদি রাধাকে মিস করে থাকে এই আশায়। এর সম্ভাবনা যথেষ্ট কম হলেও ঝুঁকি নিতে চায়নি।
বৈদ্যের এজেন্টের আশায় বাকিদেরকে রেখে এয়ারপোর্টে ছুটে এসেছিল বিজয়। ট্রাফিক জ্যাম বিরক্তিকর হলেও জানে ও কথা দেয়াতে রাধা ঠিক ঠায় দাঁড়িয়ে থাকবে। কিন্তু এখন কী করবে কিছুই মাথায় আসছে না। ফোনে কল করেও লাভ হচ্ছে না। সুইচড অফ। এ ব্যাপারটাও বেশ ভাবাচ্ছে। ফোন কেন বন্ধ রেখেছে?
কোথাও একটা গড়বড় হয়েছে মনে হচ্ছে। যদি এমন হয় যে কথা বলার সময়েও আসলে রাধা বন্দিই ছিল! হয়ত জোর করেই বলিয়েছে যে কিডন্যাপাররা চলে গেছে। ধারণাটা অস্বস্তিকর হলেও ইমরানের সাথে যা ঘটে গেছে তারপর আর স্বাভাবিকভাবে কিছুই ভাবতে পারছে না।
কলিনকে ফোন করে এখানকার পরিস্থিতি জানিয়ে দিল বিজয়। সাথে সাথে এলিস, ডা. শুক্লা আর তিনজন আইবি এজেন্টকে নিয়ে এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেল কলিন। বিজয় আসার একটু পরেই চলে এসেছে এজেন্টের দল আর তাদের আইডেন্টিটি বৈদ্য নিজে ভেরিফাই করেছেন।
আইবি এজেন্টরা ওদেরকে জোনগড়ে পৌঁছে দেবার কথা। কোথায় ফিরবে সেটা নিয়েও বিস্তর আলোচনা হয়েছে। তবে এই মুহূর্তে আর কোনো স্থানকে সুরক্ষিত মনে হয়নি। তাই সবাই মেনে নিয়েছে বিজয়ের যুক্তি; তা হল এলিস যতক্ষণ পর্যন্ত অন্যদের সাথে দুর্গে ছিল লোকগুলো ততক্ষণ পর্যন্ত শত্রুপক্ষ হাত গুটিয়ে রাখতে বাধ্য হয়েছিল।
“আমার মনে হয় কেল্লাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে নিরাপদ।” সবাই বিনা বাক্য ব্যয়ে মেনে নিল বিজয়ের রায়।
রাধাকে আর কিভাবে খুঁজবে বুঝতে না পেরে ইমরানের নাম্বার ডায়াল করল বিজয়। বৈদ্য নিজের নাম্বার বিজয়কে না দিয়ে বলেছেন কিছু সময়ের জন্য এই নাম্বারেই যোগাযোগ রাখতে।
“সবকিছু ঠিক আছে তো? ফোন কানে দিয়েই জানতে চাইলেন বৈদ্য।
“না, নেই।” সবকিছু খুলে বলল বিজয়। সাথে আরো জানাল, “আমার আরেকটা অনুরোধ আছে, রাধার ফোনের জিপিএস ধরে আরো একবার ট্রেস করার চেষ্টা করা যায় না?”
“আমি এক্ষুনি কাউকে পাঠিয়ে দিচ্ছি” উত্তরে জানালেন বৈদ্য, “কিন্তু ফোন খোলা না থাকলে কোনো লাভ নেই। যেমনটা তুমি বললে সেরকমই যদি সুইচ অফ থাকে তাহলে বেশি কিছু করা যাবে না।
মুষড়ে পড়ল বিজয়। ভয় পাচ্ছে যদি রাধাকে আবারো অপহরণ করা হয়ে থাকে তাহলে নিশ্চয় আততায়ীরা ওর ফোন ভোলা রাখবে না। আর যদি খোলেও তাহলেও জিপিএস নিষ্ক্রিয় করে রাখবে যেন ওর কোনো হদিসই না পাওয়া যায়।
বেশ বুঝতে পারছে যে তাদেরকে মিউজিয়ামে যে দলটা আক্রমণ করেছে তাদের কাছে বিজয়দের সবার স্মার্টফোনের জিপিএস ট্র্যাক করার আধুনিক টেকনোলজি আছে। সবার পরিচয় আর অবস্থান জানতে পাবার এটাই হল রহস্য। কিন্তু ডা. শুক্লার কাছে কোনো ফোন না থাকায় আক্রমণকারীরা উনার কথা জানত না। ব্যাপারটা উপলব্ধি করার সাথে সাথেই সবাই যার যার জিপিএস বন্ধ করে দিয়েছে।
তবে এখন বেশ ভয় হচ্ছে। এই লোকগুলো মোটেই আনাড়ি নয়। আর আইবি যে ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে তারাও যদি সে ধরনেরই হয় তাহলে তো বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না যে তারা কতটা শক্তিশালী। তার মানে বিজয়ের দুঃস্বপ্নই সত্য হল। এবার হয়ত রাধাকে হারাতেই হবে।
.
৩৮. বন্দী…
তিরতির করে কেঁপে উঠে খুলে গেল চোখের পাতা। চারপাশে তাকিয়েই গুঙ্গিয়ে উঠল রাধা। সবার আগে চোখে পড়ল আশেপাশের রঙ।
সাদা। একেবারে শ্বেতশুভ্রই বলা চলে। একটা সাদা সিলিং। সাদা দেয়াল আর সম্ভবত সাদা মেঝে। বুঝতে পারল ওকে একটা বিছানার সাথে বাধা হয়েছে। কব্জি আর গোড়ালি এমনভাবে আটকানো যে একটুও নড়াচড়ার সাধ্য নেই। বাম হাতে আবার স্যালাইন চলছে।
খানিকক্ষণ মুক্তি পাবার জন্য বহু কসরত করেও অবশেষে হাল ছেড়ে দিতে বাধ্য হল। কোনো লাভ নেই।
মাথাটা অসম্ভব ভারী হয়ে আছে। দেহও যেন সীসা। কোথায় শুয়ে আছে ও? এখানে এসেছেই বা কিভাবে? অস্পষ্টভাবে শুধু মনে পড়ছে যে ট্রেনের কোচে ওর দিকে পিস্তল ধরেছিল একটা লোক। তারপর ট্রেন থেকে প্লাটফর্মে নামার পর আর কিছু মনে নেই।
জোর করে একটা কেমিকেলের গন্ধ নিঃশ্বাসের সাথে ভেতরে নিতে বাধ্য করেছিল লোকগুলো। সেই কটু ধোয়ার গন্ধে এখনো জ্বালা করছে না। বজ্রমুষ্টি একটা হাত রাধার ঘাড়ের নিচে ধরে জোর করে ভেজা এক টুকরো কাপড়ে মুখ ডুবিয়ে দিয়েছিল। ঘাড়ের কাছে সে জায়গাটায়ও ব্যথা হচ্ছে।
