জীবনে প্রথমবারের মত ভিন্নমত পোষণকারী কাউকে হত্যা করলেন আলেকজান্ডার। আর একই সাথে ভঙ্গ হল দুটো মেসিডোনীয় প্রথা। প্রথমটা হল, সেনাবাহিনির উপস্থিতিতে বিচার ছাড়াই কাউকে হত্যা করা। আর দ্বিতীয়টি হল জিউসের আতিথ্য নীতি, নিমন্ত্রিত অতিথিকে হত্যা করা। যে
অতিথি কিনা সারাজীবন বিশ্বস্ততার সঙ্গে রাজপরিবারের সেবা করে গেছে।
অশ্রুজলে পূর্ণ হয়ে উঠল সে রাত। প্রথমবারের মত নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষার রাশ টানতে ব্যর্থ হলেন আলেকজান্ডার।
তবে এটাই কিন্তু শেষ নয়।
.
৩৭. বর্তমান সময়
তৃতীয় দিন
পলায়ন...
খেয়ালের বশেই কাজটা করে ফেলল রাধা। গাড়ির বাকি তিন আরোহী ওর দিকে তাকাবার সাথে সাথেই মোবাইলের রিং আগ্রহ করে ভোর নবে হাত দিয়ে খুলে ফেলল গাড়ির দরজা। পাশের গাড়ির ফেন্ডারে ঠাস করে লাগায় কতটা ক্ষতি হয়েছে দেখতে নেমে এল ড্রাইভার।
উত্তেজিত ড্রাইভার, পেছনের একগাদা গাড়ির হর্ন সবকিছুকে উপেক্ষা করে ট্রাফিক জ্যামের মধ্য দিয়ে ছুটল রাধা। উদ্দেশ্য যত দ্রুত সম্ভব কয়েক মিটার দূরের মেট্রো স্টেশনে পৌঁছানো।
গ্লকের (পিস্তল) মাজল ঝলসে উঠায় তাড়াহুড়া করে আবার নিজের জায়গায় চলে গেল ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ির ড্রাইভার। প্রচন্ড ভয় আর আত্মরক্ষার চিন্তায় ভুলে গেছে অন্য সবকিছু।
এদিকে গাড়ি থেকে বেরিয়ে তিনজনই রাধার পিছু নিল। ফুটপাত ধরে এগিয়ে ত্রস্তপায়ে লাফ দিয়ে মেট্রো স্টেশনের এসকেলেটর লিফটে চড়ে বসল রাধা। ড্রাইভারদের দল সামনে এতক্ষণ হর্ন বাজালেও নকল আইবি এজেন্টদের
উদ্যত পিস্তল দেখে সবাই আবার চুপ করে গেল।
“ট্রেন আসছে!” স্টেশনের গায়ে হলুদ আলো পড়তেই চিৎকার করে উঠল তিনজনের একজন। নিজেদের হাঁটার গতি বাড়িয়ে আশপাশের গাড়িগুলোকে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে রাধার পিছু পিছু এসকেলেটর লিফটে উঠে গেল।
চট করে দেখবার জন্য পিছনে তাকানোর ঝুঁকি নিল রাধা। দেখল এত ট্রাফিক সত্ত্বেও থামল না পিছু ধাওয়াকারীরা। হাতের পিস্তল স্পষ্ট দেখা গেলেও কেন যেন এখনো গুলি করেনি। খানিকটা অবাকই লাগল ঘটনাটা।
কিন্তু এত শত ভাবার মত সময় নেই হাতে। প্লটফর্মে পৌঁছেই ঘঁাৎ করে থেমে গেল ট্রেন। একই সময়ে এসকেলেটর থেকে নামল রাধা। সৎ নাগরিকের মত টিকিটের জন্য লম্বা লাইনে দাঁড়াবার সময় নেই। অন্যদের চিৎকার অগ্রাহ্য করে সবাইকে টপকে সামনে চলে এল রাধা। তারপর প্লাটফর্মের একেবারে শেষ মাথা পর্যন্ত দৌড়ে উঠে পড়ল একেবারে শেষ কোচে। মনে মনে শুধু আশা করছে যেন নকল তিন এজেন্ট প্লাটফর্মে আসার আগেই ট্রেনটা ছেড়ে দেয়।
ট্রেনের দরজা বন্ধ হতেই ভয়ার্ত চোখে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল রাধা। লোকগুলো এখনো প্রাটফর্মেই আছে। হঠাৎ করেই একজন ওর দিকে হিংস্র দৃষ্টিতে তাকালেও গতি বাড়িয়ে স্টেশন থেকে বের হয়ে গেলো ট্রেন।
হঠাৎ করেই শুরু হয়ে গেল জোর হট্টগোল। তিনজনের যে লোকটা একটু আগে ওকে দেখে ফেলেছিল সে এবারে তার সাথীদেরকে নিয়ে লাফাতে লাফাতে এক্সিটের দিকে চলে গেল। ট্রেনের গতি বাড়লেও কী ঘটেছে বুঝতে পারল রাধা। এসকেলেটর থেকে গেটের কাছে ছুটে এলো সাধারণ পোশাকধারী পাঁচজন আগন্তুক। সবার হাতেই হ্যান্ডগান। এই পাঁচজন এবার নকল তিন আইবি এজেন্টের পিছু নিল। এরা কারা না জানলেও লোকগুলোর পিছু নেয়াতে বোঝ গেল সাধারণ পোশক হলেও তারা আইনের লোক।
ধপ করে খালি একটা সিটে বসে কপাল মুছল রাধা। এতক্ষণ মনে পড়ল মোবাইল ফোনের কথা। রিং বাজছিল, উত্তর দেয়া হয়নি। ফোনটা বের করেই চেক করে দেখল বিজয়ের নাম্বার। দেখো একেবারে সময় মত এসেছিল ফোনটা! তাড়াতাড়ি করে নাম্বার ডায়াল করল রাধা।
“আয়্যাম ফাইন”, ঘটে যাওয়া সবকিছু জানিয়ে একেবারে শেষ মুহূর্তে উদয় হওয়া পাঁচজন সশস্ত্র লোকের কথাও খুলে বলল।
কিডন্যাপারদের অবস্থা শুনে মিটিমিটি হাসল বিজয়, “ওরা আসলে বৈদ্যের পাঠানো আইবি এজেন্ট। তোমার জিপিএস ট্রেস করে সাহায্য করার জন্য পাঠিয়ে দিয়েছেন। মনে হচ্ছে উনার পরিকল্পনা কাজ করেছে।”
রাধাও হেসে ফেলল; কিন্তু আবার একটা কথা মনে হতেই মুছে গেল হাসি। “তার মানে ইমরানের হাসপাতালে ভর্তি হবার ঘটনাটা মিথ্যাকাহিনি।”
“না, তা না।” এবারে বিজয়ের খবর পরিবেশনের পালা। “আর খুব বেশি হলে দশ মিনিটের মধ্যেই এয়ারপোর্টে পৌঁছে যাবে। আমি এক্ষুনি রওনা দিচ্ছি। তুমি শুধু চুপচাপ ভালো একটা জায়গা দেখে অপেক্ষা করো।”
বিজয়ের আমেরিকান সুলভ হাবভাব দেখে অট্টহাসি দিল রাধা। মনে পড়ে গেল লুইস লামারের উপন্যাসের কথা। ওর সাথে এত কিছু ঘটে যাবার পরেও হাসি আসছে দেখে ভালোই লাগল আর একই সাথে বিজয় যে ওকে এয়ারপোর্টে আনতে যাচ্ছে তাতেও স্বস্তি পেল।
জিন্সের পকেটে ফোনটাকে রেখে দিয়েই চোখ বন্ধ করে ফেলল। সন্ধ্যার টেনশন নাকি জোনগড় থেকে গুড়গাঁও আবার দিল্লি আসার ধকল বুঝতে পারছে না।
বহুক্ষণ পর মনে হল ট্রেনটা থেমে গেল। ঝাঁকুনি খেয়ে জেগে উঠল রাধা। কিন্তু পুরোপুরি ধাতস্ত হবার আগেই দেখল চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে একগাদা লোক।
আস্তে আস্তে ঝাপসা দৃষ্টি স্পষ্ট হতেই বুঝতে পারল পেছনে ছয় জন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক ককেশীয় পুরুষ। সবাই সশস্ত্র। আর শ্বেতাঙ্গ লোকটা ঠিক ধর উপর ধরে আছে একটা হ্যান্ডগান। পুরো কোচ খালি। একটাও। প্যাসেঞ্জার নেই। পালিয়ে গেছে নাকি!
