কিন্তু ক্লিটাস দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। “এসব থামাতেই হবে। আর যদি আপনাদের কারো সাহস না হয় আমিই করব। গ্রাণিকাসে আমিই বাঁচিয়েছি আলেকজান্ডারকে। আর ভুলে যাবেন না যে পিলোটাসকে হত্যা করার পর সেনাবাহিনির অর্ধেক আমাকে আর বাকি অর্ধেক হেফাসনকে সমর্পণ করেছে। তাই আমার কথা না মেনে পারবে না।”
ধাক্কা দিয়ে ভিড়ের মাঝে পথ করে একেবারে প্রাণিকাসের টেবিলে পৌঁছে গেলেন ক্লিটাস।
“যথেষ্ট হয়েছে!” প্রাণিকাসকে আদেশ দিয়ে বললেন, “আর না!” আবৃত্তির মাঝপথে থেমে গিয়ে হেফাসন আর আলেকজান্ডারের দিকে তাকাল প্রাণিকাস।
টলতে টলতে উঠে দাঁড়ালেন অ্যালকোহলের নেশায় আচ্ছন্ন তরুণ রাজা।
“কেন থামবে?” ক্লিটাসকে জিজ্ঞেস করলেন আলেকজান্ডার, “সে তো সত্যি কথাই বলছে।”
পুরো হল রুমে নেমে এলো পিনপতন নীরবতা। ব্যাপারটা এখন আর প্রাণিকাস আর ক্লিটাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আলেকজান্ডারও জড়িয়ে পড়েছেন।
আস্তে করে টেবিল থেকে নেমে পিছু হটল প্রাণিকাস। পরস্পরের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন ক্লিটাস আর আলেকজান্ডার।
“তোমার পিতার আমল থেকেই এ ঐহিত্য চলে আসছে যে বিজয়ের দাবিদার আর পরাজয়ের জন্য দায়ী,..” ক্লিটাস শুরু করলেও শেষ করতে পারলেন না, মাঝপথে বাধা দিলেন আলেকজান্ডার।
“আমার পিতা!” থু করে থুথু ফেলে বললেন, “এমনভাবে বলছেন যেন তার মত নীতিবান আর কেউ নেই। তার বিজয়ে আমিও যে কত ভূমিকা পালন করেছি তার জন্য আমাকে কখনো প্রশংসা করেছেন? পিতার ঐতিহ্যের কথা বলছেন? আমি তো শুধু জানি আমার প্রতি তার অন্যায় অভিপ্রায়ের কথা। আমার প্রতি উনার প্রতিহিংসার কথা। সেসব কি তাহলে? সেগুলো কি একজন ন্যায়বানের চিহ্ন?” ক্লিটাসের দিকে তাকিয়ে ওয়াইনের কাপে চুমুক দিলেন আলেকজান্ডার। ‘
“তুমি তোমার পিতার স্মৃতিকে অবজ্ঞা করছ। পারস্যের উপর আক্রমণ তিনিই শুরু করেছিলেন আর আজ তুমি যা করেছ তা বহু বছর আগে উনিই করতেন যদি না এক আততায়ীর ছোরা তার জীবন কেড়ে নিত।” থেমে গেলেন ক্লিটাস। আবেগের তোড়ে হারিয়ে যাচ্ছে যুক্তিবোধ। “ভুলে যাচ্ছো যে আজ তুমি যা তা কেবল পিতার কল্যাণেই পেয়েছ। আজ তোমার যা কিছু অর্জন তিনিই সবকিছুর ভিত্তি করে গেছেন। তোমার চেয়েও তার অর্জন কয়েক গুণ বেশি। আর আজ তুমি পিতা ফিলিপকে অমান্য করে আমনের সন্তান হিসেবে ভান করে নিজেকে অনেক বড় কিছু ভাবছ?”
শেষ শব্দটার সাথে সাথে সবাই যেন নিশ্বাস নিতেও ভুলে গেল।
“বদমায়েশ!” ক্ষিপ্ত স্বরে উত্তর দিলেন ওয়াইনের নেশামত্ত আলেকজান্ডার। “আমাকে তিরস্কার করে মেসিডোনিয়ানদের মাঝে অসন্তুষ্টি জাগানোর ইচ্ছে তাই না?”
কিন্তু নিজের জায়গায় অনড় রইলেন ক্লিটাস, “যদি তুমি কারো যুক্তি শুনতে চাও তাহলে কেন তাদেরকে নিমন্ত্রণ করেছ? দাস আর দুবৃত্তদেরকে সঙ্গে রাখলেই পারতে। তারা নতমুখে তোমার চাটুকারিতা করত!”
ক্রোধে ফেটে পড়লেন আলেকজান্ডার। ক্লিটাসের দিকে ছুঁড়ে মারলেন হাতের কাপ। দুজনের গায়েই ছিটিয়ে পড়ল ওয়াইন। হন্তদন্ত হয়ে সকলেই ছোটাছুটি করছে। এরই মাঝে পরিবেশন টেবিল থেকে একের পর এক ফল তুলে ক্লিটাসের দিকে ছুঁড়তে লাগলেন তরুণ রাজা। আশেপাশে অস্ত্রের খোঁজে হাত বাড়ালেও একটাও পাওয়া গেল না।
“প্রহরীদেরকে ডাকো!” চিৎকার করে উঠলেন আলেকজান্ডার, “আমার’ গার্ডেরা কোথায়? ডাকো ওদেরকে!”
এদিকে ক্লিটাসের কয়েক জন বন্ধু এসে টানতে টানতে জেনারেলকে প্রাসাদের বাইরে নিয়ে গেল। একেবারে পরিখার ওপারে; যেন আলেকজান্ডারের রোষানল থেকে তিনি নিরাপদে থাকতে পারেন। তারপর আলেকজান্ডারের ক্রোধ প্রশমিত হলে তিনি আবার এসে নৈশ দাওয়াতে যোগ দিতে পারবেন। যদি তা ততক্ষণ পর্যন্ত টিকে তো।
পৌঁছে গেল আলেকজান্ডারের দেহরক্ষী দল। গোল করে দাঁড়িয়ে তরুণ রাজাকে ঘিরে ফেলল।
একটু পরেই ক্লিটাসের বন্ধুরা ফিরে এসে আনন্দ উৎসব পুনরায় শুরু করার ইশারা দিল। আগামীকাল হ্যাংওভার কেটে গেলেই সবাই আবার সবকিছু ভুলে যাবে।
কিন্তু অদৃষ্ট আজ রাতের ভাগ্যে লিখে রেখেছে এক ভিন্ন পরিণতি।
হঠাৎ করেই দরজার কাছে শোনা গেল হৈ চৈ। তারপরই ভেতরে এলেন ক্লিটাস। যুদ্ধ ময়দান থেকে পালিয়ে যাওয়াটা তার স্বভাব নয়। সবসময় এ নীতিতেই অটল থেকেছেন। তাই আজও তার ব্যতিক্রম হবে না।
“আহ, আমি! গ্রিসে রাজত্ব করছে এক দুষ্ট প্রবৃত্তি!” পুরো হলরুম জুড়ে গমগম করে উঠল ক্লিটাসের কণ্ঠ। তরুণ রাজার দিকে এগোতে গিয়ে আবৃত্তি করলেন ইউরিপিডেসের লেখা আন্দ্রোমাচের এক পংক্তি। গলার স্বরে স্পষ্ট ঔদ্ধত্য।
বন্ধুদের কাছে ফিরে আসতে গিয়েও ঘুরে তাকালেন আলেকজান্ডার। ক্লিটাসকে দেখার সাথে সাথেই মাথায় চড়ে উঠল রাগ। তাই প্রতিক্রিয়াও হল একেবারে তৎক্ষণাৎ। এক গার্ডের কাছ থেকে বর্শা নিয়েই সোজা জেনারেলের দিকে দৌড় দিলেন।
“বিসাসের চেয়ে তো ভিন্ন কিছু নও!” বর্শা বিদ্ধ ক্লিটাস মাটিতে পড়ে যেতেই ফিনকি দিয়ে ছুটল রক্ত। হলের মাখখানে তৈরি হল রক্তের খাড়ি। সবাই সভয়ে এমনভাবে পিছিয়ে গেল যেন এ রক্ত অভিশপ্ত। এর আগে আলেকজান্ডারের এ রূপ আর দেখা যায়নি। যেন তার উপর অন্য কেউ ভর করেছে।
রক্তের সাথে বেরিয়ে গেল ক্লিটাসের প্রাণশক্তি। হাটু ভেঙে বসে পড়লেন আলেকজান্ডার। মাতাল হলেও ঠিকই বুঝতে পেরেছেন যে কী করেছেন। ক্লিটাসের প্রাণহীন দেহের উপর নুইয়ে পড়ে তাই কান্না আটকাতে পারলেন না। জেনারেলের রক্তে ভেসে গেল তার পোশাক আর জুতা; কিন্তু এবার কোনো ভ্রূক্ষেপ করলেন না।
