তবে এতে বর্তমানের আনন্দে কোনো ভাটা পড়েনি। আলেকজান্ডার এখন পারস্য সম্রাট। আগামীতে রকও জয় করে নেবেন। কোনো কিছুই তার পথে বাধা হতে পারে না।
প্রাসাদের ভেতরে উপচে পড়ছে ভোজনশালা। পানির মত বইছে ওয়াইন, আর টেবিলগুলোও উপাদেয় সব সগডিয়ান খাবারে পূর্ণ।
বিশাল কক্ষে একসাথে মিশে গেছে সাধারণ সৈন্য আর জেনারেল, মেসিডোনীয় আর অ-মেসিডোনীয় সকলেই। মনে হচ্ছে কিছুক্ষণের জন্য ভুলে গেছে সমস্ত শক্রতা আর রাজনীতি। যুদ্ধের কথা বিস্মৃত হয়ে সবাই বেশ আন্তরিক আচরণ করছে।
তবে বেশিক্ষণ স্থায়ী হল না এ পরিবেশ।
হলের একপাশে হেফাসন আর নিজের অন্তরঙ্গ কজন পুরুষকে নিয়ে আসর জমিয়েছেন আলেকজান্ডার। চিৎকার-চেঁচামেচি আর হাসির হল্লায় বোঝ গেল সুরার মাত্রা।
কিন্তু ওয়াইনে মত্ত হবার আগেই এগিয়ে এলেন হেফাসন।
“এবার চুপ হও সবাই!” গুটিকয়েক সৈন্য আর জেনারেল এদিকে মনোযোগ দিলেও বেশিরভাগই কোনো পাত্তা দিল না। কেউ একজন আবার এমন এক মন্তব্য করল যে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়লেন আলেকজান্ডার।
এবার নিজের কর্তৃত্ব জাহির করার সিদ্ধান্ত নিলেন হেফাসন। খাবার ভর্তি একটা টেবিলের উপর লাফ দিয়ে উঠে ব্রোঞ্জের দুটি সার্ভিং ডিশের সমস্ত কিছু ফেলে বেশ কয়েকবার জোরে জোরে করাঘাত করলেন।
অবশেষে নিশ্চুপ হল পুরো কক্ষ। কিছু একটা ঘটছে আঁচ করে সবাই এদিকে মনোযোগ দিল। আলেকজান্ডারের প্রিয়ভাজন যখন এভাবে টেবিলের উপর উঠে বাসন বাজাচ্ছে আর সম্রাট নিজেও শান্ত হয়ে আছেন তখন ব্যাপার নিশ্চয় গুরুতর।
সন্তুষ্ট হেফাসন এবার আলেকজান্ডারের পাশে বসা একজনকে ইশারা দিলেন।
“আমাদের স্থানীয় কবি প্রাণিকাসের লেখা কবিতা শোন”, মিটিমিটি হেসে লাফ দিয়ে টেবিল থেকে নেমে এলেন হেফাসন।
সবাই হাততালি দিয়ে উৎসাহ দিল। টেবিলের উপর উঠে আবৃত্তি শুরু করলেন প্রাণিকাস।
সাথে সাথে পাল্টে গেল সমস্ত চিত্র। প্রাণিকাসের আবৃত্তির সাথে সাথে হলের বেশির ভাগ লোক হেসে কুটি কুটি হল। আবার বিভিন্ন ধরনের মন্তব্যে ভারী হয়ে উঠল বাতাস। অন্যদিকে কবিতা শুনে কয়েকজনের চেহারা হয়ে উঠল কালো আর কঠোর।
এরা সকলেই বেশ প্রাচীন পন্থী। আলেকজান্ডারের পিতা ফিলিপের আমলের রাজনীতিবিদ। তবে তরুণ রাজাকেও কম সহায়তা করেন নি। একসাথে লড়েছেন বিভিন্ন লড়াই। বিশেষ করে বলা যায় মেসিডোনিয়ানদের ভাগ্যের পাল্লা ভারী করা গগাঁমেলার যুদ্ধ। তাই যা শুনছেন তা কিছুতেই মনঃপুত হচ্ছে না।
সমরকন্দে আলেকজান্ডারের জেনারেলদের পরাজয়ের উপর রচিত এ কবিতায় বলা হয়েছে গত শীতে বাধ্য হয়ে বাল্কে পিছিয়ে আসার কথা। ব্যাকট্রিয়ান গোত্রের হাতে এরকম অবমাননার জন্য উপহাসের পাত্র হয়েছেন। জেনারেলগণ।
এ কথা কানে আসতেই নিজেদের মাঝে মৃদু গুঞ্জন শুরু করলেন প্রাচীনপন্থী রাজনীতিকেরা। এদের মাঝে সবচেয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন মাত্র কিছুদিন আগেই ব্যাকট্রিয়া ও সগডিয়ায় নিয়োগপ্রাপ্ত প্রাদেশিক শাসনকর্তা ক্লিটাস।
“বর্বর আর শত্রুদের সামনে মেসিডোনিয়াদেরকে অপমান করা হচ্ছে।” দাঁতে দাঁত ঘষে বুঝিয়ে দিলেন রাগের মাত্রা। “দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কি এসব সহ্য করব নাকি? আমাদের মাঝে কী কোনো সত্যিকারের পুরুষ নেই? আমাদেরকে ব্যঙ্গ করছে তাই কী দেখতে হবে?”
“সফলতা এলে আলেকজান্ডার হয় এর দাবিদার আর যখন পরাজিত হই তখন জেনারেলরা হয় দায়ী।” অসন্তোষে অভিযোগ করলেন আরেকজন। “ফিলিপের সময়তো এমনটা কখনো হত না।”
ওনার দিকে তাকালেন ক্লিটাস, “তাহলে কিছু বলছেন না কেন? বন্ধ করুন এসব বাজে কথা! ফিলিপ আর এমনকি আলেকজান্ডারের সামনেও আমাদের কথা বলার যথেষ্ট স্বাধীনতা আছে। আমাদের যুক্তি নিশ্চয় আগ্রাহ্য করবে না।
“লোকগুলো সব মাতাল হয়ে গেছে।” ভর্ৎসনা করে উঠলেন আরেকজন প্রাজ্ঞ। “মাত্রাতিরিক্ত ওয়াইনের প্রভাবে ওদের মাথা কাজ করছে না। তাই এ সময়ে কিছু বলাটা ঠিক হবে না। পারসেপোলিসে কী হয়েছে মনে নেই?” পারস্য সাম্রাজ্যের রাজধানী পারসেপোলিসে প্রবেশ করে এরকমই এক ভোজনের আয়োজন করেছিলেন আলেকজান্ডার। আর সেই অনুষ্ঠানেই মদ্যপ আলেকজান্ডার সিদ্ধান্ত নেন পুরো পারসেপোলিসে আগুন ধরিয়ে দেবেন। ফলে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে অনিন্দ্য সুন্দর সে শহর।
“আর মাতাল হয়ে ফিলিপ যে আলেকজান্ডারকেও খুন করতে চেয়েছিল সে কথাও মনে রেখো।” অভিজাত বংশ থেকে আসা এক রমণী, ক্লিওপেট্রা আর ফিলিপের বিবাহ অনুষ্ঠানের কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন আরেক প্রৌঢ়। আলেকজান্ডারকে অবৈধ ইশারা করে ক্লিওপেট্রার চাচা অ্যাটালাস মন্তব্য করেছিলেন যে এবার ফিলিপ এক বৈধ উত্তরাধিকারী জন্ম দিতে পারবে। অলিম্পিয়াস নিজে ফিলিপ নয় বরঞ্চ জিউসকেই আলেকজান্ডারের পিতা দাবি করলেও ক্ষেপে উঠেন আলেকজান্ডার। অ্যাটালাসের উদ্দেশ্যে ছুঁড়ে মারেন নিজের কাপ আর মাঝখানে ফিলিপ পড়ে যাওয়ায় সাথে সাথে তরবারি বের করে আলেকজান্ডারকে খুন করতে উদ্যত হন মৃত সম্রাট। কিন্তু নেশাগ্রস্ত থাকায় মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়াটাই সার হয়।
তবে এতে স্পষ্ট হয়ে উঠে যায় সুরামত্ত রাতে ঘটনা কতদূর এগোতে পারে। আজ রাতটাও ঠিক তেমন। তাই তুচ্ছ কিছু নিয়ে উত্তেজিত হয়ে উঠাকে সায় দিলেন না প্রাচীন রাজনীতিকেরা।
