কিন্তু যদি এরা আইবি এজেন্টের ভান ধরে এসে থাকে তাহলে এতক্ষণও ওকে খুন করেনি কেন? কোনো প্রত্যক্ষদর্শী না থাকায় বাড়িতেই তো কাজটা সারতে পারত। কেন তাহলে ইমরানকে দেখানোর বাহানা করে হাসপাতালে নেবার কথা বলেছে? তার মানে ইমরানের কথাটা আসলে অজুহাত। এ চিন্তা মাথায় আসতেই খানিকটা আশাও জাগল। হয়ত ইমরান সুস্থই আছেন; উনার কিছুই হয়নি। কিন্তু নিজের কথা মনে হতেই আবার খুশি উবে গেল।
নিজের সিটে প্রায় ডুবে গেল রাধা। হতে পারে ও একটু বেশিই ভয় পাচ্ছে। কিন্তু ওর ধারণাটা যদি সত্যি হয় তাহলেও সন্দেহের কথাটা এদেরকে বুঝতে দেয়া যাবে না। দুপাশের দরজার উপর চোখ বোলাল সেন্ট্রাল লকিং মেকানিজম দিয়ে তালা দেয়া হয়েছে। কিন্তু তার মানে এই না যে খোলা যাবে না। তবে চলন্ত গাড়ি থেকে ঝাঁপ দেবার কোনো মানে নেই। আহত হলে আবার ওকে বয়ে নিয়ে যাবে লোকগুলো।
বুঝতে পারল পালানোর জন্য হয়ত কেবল একটাই সুযোগ পাবে। তাতে যদি ব্যর্থ হয় তাহলে লোকগুলোও সতর্ক হয়ে যাবে আর দ্বিতীয় কোনো সুযোগ পাওয়া যাবে না।
চোখ বন্ধ করে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল রাধা। এত সহজে হাল ছাড়া যাবে না। ধৈর্য ধরে কোনো একটা ট্রাফিক ইন্টারসেকশনে গাড়ি না থামা
পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। সেটাই হবে একমাত্র সুযোগ।
একদৃষ্টে রাস্তার দিকে তাকিয়ে অজানা গন্তব্যের কথা ভাবল রাধা; কী ঘটতে যাচ্ছে ওর সাথে?
.
৩৫. হাসপাতাল
হাসপাতালের পার্কিং লটে ঢুকেই ঘঁাচ করে ব্রেক কষল বিজয়। চারজন আরোহীর সবাই একসাথে বেরিয়েই ছুটল ইমারজেন্সি রুমের দিকে। বিজয় আর কলিন রিসেপশনে হুমড়ি খেতেই পিছনে চলে এলো এলিস। তরুণদের মত এত জোরে না পারলেও আস্তে আস্তে এলেন ডা. শুক্লা।
“ইমরান কিরবা?” রুদ্ধশ্বাসে জানতে চাইল বিজয়, “আমরা উনার বন্ধু।”
“জাস্ট আ মোমেন্ট প্লিজ” মাপা কণ্ঠে জবাব দিল রিসেপশনিস্ট। কিছু কাগজপত্র চেক করে কি-বোর্ডে কী যেন টাইপ করল। তারপর কম্পিউটার মনিটর দেখে অবশেষে মাথা নেড়ে জানাল, “নাহ, এই নামে এখানে কেউ নেই।”
পরস্পরের দিকে তাকাল দুই বন্ধু, “আপনি নিশ্চিত?” বিশ্বাসই করতে পারছে না বিজয়। “আমরা তো শুনেছি যে উনি নাকি কিছুক্ষণ আগেই এখানে ভর্তি হয়েছেন। বোমা বিস্ফোরণে আহত হয়েছেন। ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোতে কাজ করেন।”
দৃঢ় ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল রিসেপশনিস্ট, “আমি সমস্ত রেকর্ড চেক করে দেখেছি। কোনো বোমা বিস্ফোরণে আহত রুগী নেই। আর ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো থেকে তো নয়ই। আয়্যাম সরি। হয়ত আপনারা ভুল হাসপাতালে এসেছেন।”
এতক্ষণে সবার কাছে পৌঁছে সবকিছু শুনলেন ডা. শুক্লা। সাথে সাথে উদ্বেগে ভরে গেল চেহারা। কাউকে বলতে হল না। বাকিরাও বুঝতে পারছে। সবার মাথায় ঘুরছে একই চিন্তা। যদি ইমরান হাসপাতালে না থাকে তো রাধার সাথে কাদের দেখা হয়েছে আর ওকে কোথায়ই বা নিয়ে গেছে?
.
উদয় হল সুযোগ
ধোলা কুয়ানে পৌঁছে গেল গাড়ি। এইমাত্র ফ্লাইওভার পার হয়েছে। পাশেই এয়ারপোর্ট এক্সপ্রেস মেট্রো লাইন। এবার সোজা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের দিকে ছুটছে।
মেট্রো স্টেশনের পরের সিগন্যালেই প্রচুর গাড়ি দেখা যাচ্ছে। রিং রোডের চারপাশ থেকে আসছে বিভিন্ন ধরনের যানবাহন। কার, বাস, টু-হুঁইলার মিলে যত্রতত্র মোড় ঘোরার কারণে সৃষ্টি হয়েছে প্রচন্ড ট্রাফিক জ্যাম।
বুঝতে পেরেই শক্ত হয়ে গেল রাধা। এই-ই সুযোগ। এই সিগন্যালটা পার হলেই দিল্লি থেকে গুড়গাঁওগামী এক্সপ্রেসওয়ে। তারপর গাড়ি এত জোরে ছুটবে যে আর কোনো সুযোগ পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না।
চট করে একবার জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল রাধা। পাশের গাড়িটা এতটাই কাছে যে দুটোর মধ্যে খুব বেশি হলে ফুট খানেকের ব্যবধান। তাই দরজা খুলে বের হওয়াটা বোকামি হবে।
ধীরে ধীরে এগোচ্ছে গাড়ি। শত চেষ্টা করেও এলোমেলো ট্রাফিকের মধ্য দিয়ে চালাতে পারছে না ড্রাইভার। দুটো গাড়ির মাঝখানের গ্যাপ খানিকটা বাড়লেও টেনশনে আছে রাধা! সবুজ বাতি জ্বলে উঠল। দ্রুত কেটে যাচ্ছে জ্যাম।
এখন নয়ত কখনোই নয় ভাবতে ভাবতে অবচেতনেই ডোরনবে হাত দিল রাধা।
আর ঠিক সেসময়েই বেজে উঠল ফোন। গাড়ির বাকি তিনজনই সাথে সাথে ওর দিকে তাকাল। অথচ শেষ ভরসা এটাই।
.
কোনটা সত্যি?
“ও তত ফোন ধরছে না” চিন্তিত স্বরে জানাল বিজয়। ডা. শুক্লাও বেশ দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছেন। নিঃশব্দে পরস্পরের যাতনা আর অনুভূতি ভাগ করে নিলেন একজন পিতা আর এক ফিয়ান্সে।
“ইমরানকে দেখো তো” বলে উঠল কলিন, “উনাকে তো এমনিতেও পিটার সম্পর্কে জানাতে হবে। হয়ত রাধা কোথায় আছে উনি জানেন।” এ বিষয়ে তার যথেষ্ট সন্দেহ থাকলেও মানসিক স্পৃহাকে হারাতে চায় না। তাহলে বিজয় আর ডা. শুক্লা আরো ভেঙে পড়বে।
মাথা নেড়ে ইমরানের নাম্বার ডায়াল করল বিজয়। অদ্ভুত আর অপরিচিত একটা স্বর বলে উঠল, “ইয়েস?”
“আ…আমি আসলে ইমরান কিরবাঈয়ের সাথে কথা বলতে চাই” খানিকটা দ্বিধা নিয়ে উত্তর দিল বিজয়।
“তুমি কে?” বেশ কর্তৃত্বের স্বরে পাল্টা প্রশ্ন করল আগন্তুক।
এক মুহূর্তের জন্য শক্ত হয়ে গেল বিজয়। মনে হচ্ছে লোকটা ইমরানকে চেনে। তারপরেও এটা নিশ্চিত যে ইমরান নন। তাহলে কে?
