মাত্র সেকেন্ড খানেকের মধ্যেই এত কিছু ঘটে গেল যে রাইলি নড়াচড়ারও সুযোগ পেল না। খাপ থেকে ছুরি বের করার আগেই বাইরে বেরিয়ে গিয়ে ঠাস করে দরজা আটকে দিল চার বন্দী।
প্রাথমিক বিস্ময় কাটিয়ে উঠতেই লাফ দিয়ে পিছু নিল রাইলি। কিন্তু হঠাৎ করেই অন্ধকার হয়ে গেছে পুরো গ্যালারি। নিশ্চয় চারজনের কেউ একজন মাথা খাঁটিয়ে যাবার আগে করিডোরের বাতি নিভিয়ে দিয়ে গেছে।
এটা সেটার সাথে ধাক্কা খেতে খেতে অতি সন্তর্পণে দরজার কাছে এলো রাইলি। কিন্তু খোলার পর দেখা গেল করিডোরেও নিকষ কালো আঁধার। উন্মুক্ত জানালা দিয়ে কানে এল মিউজিয়ামের বাইরে গাড়ি স্টার্ট দেবার আওয়াজ।
রাগে জ্বলে উঠল সর্বাঙ্গ। খেপে গিয়ে সিঁড়ির কাঠের হাতলের গায়ে ছুরির কোপ মারলেও শান্তি হচ্ছে না। কুপারকে সবকিছু জানাতে হবে। কিন্তু কুপারের প্রতিক্রিয়া চিন্তা করে যে রাগ হচ্ছে তা না; আজ রাতের এ ঘটনা তার রেকর্ডে দাগ ফেলে দিল। নিজের লোকেরাই হল এ ভরাডুবির কারণ।
তবে ভবিষ্যতে আর কখনোই এমনটা হবে না।
.
৩৪. নিউ দিল্লি
তাড়াহুড়ো করে মিউজিয়াম থেকে বেরিয়েই সেন্ট্রাল দিল্লির রাস্তা ধরে গাড়ি ছোটাল বিজয়। ব্যস্ত ট্রাফিকের মাঝেও এঁকেবেঁকে ছুটতে ছুটতে মিউজিয়াম আর তাদের মাঝে যতটা সম্ভব দূরত্ব কমাতে চাইছে। সবার চোখের সামনেই ভাসছে ঠাণ্ডা মাথায় কিউরেটরকে হত্যার দৃশ্য।
একটু পরে অবশ্য খানিকটা টেনশন কমলেও হুইলে ধরা হাত একটুও নরম হল না। “লোকটা কী কুপার নাকি?” এলিসকে জিজ্ঞেস করল বিজয়।
কোনোমতে মাথা নাড়ল এলিস। এখনো নিজেকে সামলাতে পারছে না। সোনালি চুলের তরুণটাকে না চিনলেও এটা বেশ বুঝতে পারছে, তাকে এত সহজে ছাড়বে না ওরা। সেই গ্রিস থেকে এতদূর পিছু ধাওয়া করে দিল্লি পর্যন্ত চলে এসেছে। এমনকি বিজয়ের দুর্গের কথাও জানে!
“ইমরানকে জানাতে হবে। কুপার হোক বা না হোক আজ রাতের ঘটনাটা এমনি এমনিই ঘটেনি। কেউ একজন সারাক্ষণ তোমার উপর চোখ রাখছে এলিস।” ঠিক যেন মেয়েটার মনের কথাই টের পেয়েছে বিজয়। কলিনকে নিজের ফোন দিয়ে জানাল, “ইমরানকে ফোন করো। স্পিড ডায়ালে নাম্বার আছে।”
মাথা নেড়ে স্মার্টফোনের স্ক্রিনসেভার সরাতে বিজয়ের পাসওয়ার্ড টাইপ করল কলিন, “আরে, রাধা তোমাকে একটা মেসেজ পাঠিয়েছে।”
“পড়ো তো!” অবাক হয়ে গেল বিজয়।
পড়ার সাথে সাথে কলিনের চোয়াল ঝুলে পড়ার দশা।
“কী হয়েছে?” ভেতরের সীট থেকে জানতে চাইলেন ডা. শুক্লা। পাশেই এলিস।
“ইমরান” কেঁপে উঠল কলিনের গলা। যা পড়েছে তা কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না। “আজ সন্ধ্যায় উনার অ্যাপার্টমেন্টে বোমা বিস্ফোরণ হয়েছে। এখন হাসপাতালে আছেন? কে একজন আইবি’র লোকের সাথে রাধাও ওখানে গেছে। বলল আমরাও যেন যাই।” হাসপাতালের ঠিকানা জানাতেই তৎক্ষণাৎ গাড়ি ঘোরাল বিজয়। আর হয়ত পনের মিনিটের মাঝেই পৌঁছে যাবে।
.
আইবি? নাকি না?
গাড়িতে বসে একদৃষ্টে চারপাশের দৃশ্য দেখছে বিষণ্ণ রাধা। মাথায় যদিও একগাদা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। ইমরানকে কেন টার্গেট করল? উনাকে কেন কেউ খুন করতে চাইবে? এর সাথে কী আগের দিন টাইটানে ভিজিটের কোনো সম্পর্ক আছে? যদি তাই হয় তাহলে তো ওর নিজের জীবনও সংশয়ের মধ্যে পড়ে গেছে।
কাঁধ ঝাঁকিয়ে চিন্তাটা দূর করে দিল রাধা। ভেবে ভাল লাগছে যে সে অন্তত তিনজন ইন্টেলিজেন্স কর্মকর্তার সাথে এই গাড়িতে নিরাপদেই আছে।
“ডাক্তারেরা ইমরানের সম্পর্কে কী বলেছেন?” পাশেই বসে থাকা এজেন্টের দিকে তাকাল রাধা। গোঁফঅলা লোকটার চেহারা বেশ রুক্ষ।
কিন্তু উত্তর না দিয়ে লোকটা কেবল কাধ ঝাঁকাল। সামনের প্যাসেঞ্জার সিট থেকে এদিকে ঘুরে উত্তর দিল হোশিয়ার সিং, “আমরা শুধু জানি যে উনার প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে। বাকিটা পৌঁছানোর পর জানা যাবে।”
বহুকষ্টে চোখের জল আটকাল রাধা। গত বছর থেকেই ইমরানের সাথে তার একটা বিশেষ সম্পর্ক হয়ে গেছে। কিডন্যাপড হবার পরে আরেকটু হলে মারাই যাচ্ছিল। ইমরান এসে বাঁচিয়েছে; এখন পর্যন্ত নিশ্বাস নিতে পারছে।
গোলচত্বরের কাছে এসে বামদিকে ঘুরে গেল গাড়ি। এখনো জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আত্মমগ্ন থাকলেও খানিকটা চমকে উঠল রাধা। কোন পথ ধরে এগোচ্ছে এতক্ষণ কেন যেন খেয়াল করেনি। সাউথ দিল্লি থেকে হাসপাতালের দিকেই এসেছিল। কিন্তু ইমরানকে হারাবার চিন্তায় অস্থির থাকায় বুঝতেই পারেনি কখন দূরে সরে এসেছে। এইমাত্র উপলব্ধি করল যে চানক্যপুরীর মধ্য দিয়ে ধোলা কুয়ানের দিকে ছুটছে গাড়ি; আর এই রাস্তায় ওদেরকে গুড়গাঁও নিয়ে যাবে।
ঝট করে একবার পাশের কর্কশ চেহারার এজেন্টের দিকে তাকিয়ে সামনের দুজনেকেও দেখে নিল রাধা। কেউই বুঝতে পারছে না যে তারা ভুল রাস্তায় যাচ্ছে বা বুঝতে পারলেও কোনো প্রক্ষেপ নেই। গাড়ির রেডিও অন করা আর লেটেস্ট বলিউড গানের সাথে গুনগুন করছে হোশিয়ার সিং।
কোথায় কোনো একটা গন্ডগোল হচ্ছে। অস্বস্তি বোধ হল। এরা সত্যিই আইবি এজেন্ট তো? নাকি এসব কিছুই আচমকা টাইটানে উদয় হবার পরিণতি? এজেন্টের আইডি কার্ড স্মরণ করার চেষ্টা করলেও বুঝতে পারল একটুও মনে নেই। হয়ত ড্রাইভিং লাইসেন্স দেখেছে। এতটা অসাবধান হবার জন্য মনে মনে নিজেকে গালও দিল।
