সাথে সাথে বুঝে গেল বিজয়। প্রথমত, কোনো না কোনোভাবে এরা দুর্গে নজরদারি করেছে। কিভাবে সেটা ধরতে পারলেও ওদের নাম-ধাম এমনকি কজন আছে সেটাও তারা জানে। আর আরেকটা ব্যাপার হল ইমরান আর রাধাকেও ধরে ফেলেছে। তবে এই লোকটার ইনফরমেশন কারেক্ট না। ডা. শুক্লার কথা জানে না। প্রাজ্ঞ নোকটা কেন লুকিয়ে আছেন বুঝতে না পারলেও এটুকু আশা যে উনি সবকিছু দেখছেন।
দাটাকে টানতে টানতে কেসের পেছন থেকে বেরিয়ে এলো বিজয়; সহজ স্বরে জানালো, “এই যে আমি।”
খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল রাইলির চেহারা। যাক সব তার ইচ্ছে মতই এগোচ্ছে। এরপর কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই হঠাৎ করে সাহুর দিকে ফিরে এক পোচ দিয়েই গলাটা কেটে ফেলল। ধপ করে মেঝের উপর আছড়ে পড়ল কিউরেটরের দেহ। রক্তে ভেসে যাচ্ছে চারপাশ। “ওকে আসলে আর কোনো দরকার নেই।” ব্যাখ্যা দিল রাইলি।
ভীতি বিহ্বল অন্যদের সামনে এবারে এলিসকে ধরে রক্তমাখা ছুরির ফলা চেপে ধরল মেয়েটার গলায়, “এবার বলো মেটাল প্লেটটা কোথায়?” ফিসফিস করে উঠল রাইলি।
পিস্তল তাক করে বিজয় আর কলিনের দিকে এগোল দুজন গানম্যান। একটু নড়াচড়া করলেই পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জ থেকে হাত কিংবা পায়ের দিকে উড়ে যাবে বুলেট।
চামড়ার উপর গেঁথে বসায় গড়িয়ে পড়ল এক ফোঁটা রক্ত। কথা বলতে চেষ্টা করল এলিস; কিন্তু গলায় কোনো স্বর ফুটল না।
মিটিমিটি হাসছে রাইলি, “দেখা যাক কতক্ষণ সহ্য করতে পারো।”
“ওয়েট” নিজেকে সামলাতে না পেরে এক পা আগে বাড়ল বিজয়। চোখের সামনে দেখছে এলিসের আতঙ্কিত চেহারা, “ওর কাছে মেটাল প্লেটটা নেই। ওটা ওই দরজার পেছনের আরেকটা রুমে রাখা হয়েছে। কয়েক মিনিট আগে তালা মারা রুমটাকে ইশারায় দেখিয়ে বলল, “চাবি আমার কাছে।” উদ্যত অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে থাকা গানম্যানের দিকে তাকাতেই লোকটাও মাথা নাড়ল।
“খুব সাবধান” বিজয়কে সতর্ক করে দিল গানম্যান। স্কি মাস্কের আড়ালে খসখস করে উঠল গলা, “এই রেঞ্জ থেকে কোনো চালাকি করেই কিন্তু বাঁচতে পারবে না।”
আস্তে আস্তে চাবির রিং তুলে রাইলির দিকে ছুঁড়ে মারল বিজয়। খানিকটা ঝুঁকে এলিসকে টানতে টানতে দরজার কাছে নিয়ে তালা খুলে ফেলল রাইলি। কিন্তু ভেতরের সারি সারি ট্যাবলেট আর সিলমোহর দেখেই অসহিষ্ণু হয়ে জানতে চাইল, “এর মাঝে কোনটা?”
ধাতব পাতটা দেখিয়ে দিন এলিস। মেয়েটাকে ধাক্কা দিয়ে তৃতীয় গানম্যানের কাছে সরিয়ে ছুরিটাকে খাপে ভরে নিল রাইলি। তারপর সিলটাকে হাতে নিয়ে দেখল।
আর ঠিক তখনি এমন এক ঘটনা ঘটল যে বিস্মিত হয়ে গেল বিজয় আর কলিন।
.
৩২. ৩৩৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দ
মেসিডোনিয়া
প্রাসাদের কক্ষে বসে আছেন আলেকজান্ডার। ভাবনায় বিভোর হয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন জানালার দিকে। এমন সময় কোনো রকম ঘোষণা ছাড়াই ভেতরে এলেন রানি মাতা।
“পুত্র” বলে উঠলেন অলিম্পিয়াস, “দেখো তোমার জন্য আমি কোন উপহার এনেছি।”
ভ্রু-কুঁচকে এদিকে ফিরলেন আলেকজান্ডার। শৈশব থেকেই মায়ের এমন আচরণ দেখলেও এখনো কেন যেন অভ্যস্ত হতে পারেননি। যখন তখন গান গাওয়া, ইচ্ছে হলেই নাচ, সাপের প্রতি দুর্বোধ্য এক ভালোবাসা আর না
জানিয়ে রুমে ডোকা মাঝে মাঝে সত্যিই খুব বিরক্ত লাগে। কিন্তু মাকে এত ভালোবাসেন যে এসব বলার কোনো মানেই হয় না।
গাঢ় আর গভীর চোখ জোড়া দিয়ে নিজের গিফট খুঁজলেন আলেকজান্ডার কিন্তু মায়ের হাত দু’খানা তো খালি।
“উফ, মা” অভিযোগ করলেন তরুণ রাজা, “এরকম করোনা তো। বলল কী এনেছ। জানো আমি উপহার কত পছন্দ করি।”
“তার আগে আমার কাছে একটা প্রমিজ করো” ছেলের দিকে তাকিয়ে হাসলেন অলিম্পিয়াস। একমাত্র পুত্রের সাথেই তিনি কোনো ছলা-কলা করেন
কিংবা কোনো সুবিধাও আদায় করতে চান না। কেবল এটুকুই অভিপ্রায় যে একদিন দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়বে পুত্রের মহিমা। আর এর জন্য যা যা দরকার তিনি তাই করবেন।
কপালে ভাঁজ ফেলে আলেকজান্ডার জানালেন, “নির্ভর করছে এটা কী তার উপর।”
“ওহ্, আমার মনে হয় এই প্রমিজটাকে পূর্ণ করতে পারলে তুমি খুশিই হবে” ছেলের কৌতূহল বাড়িয়ে তুললেন অলিম্পিয়াস, “আর সেটা পারস্যের বিরুদ্ধে তোমার অভিযান নিয়ে।”
তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মায়ের দিকে তাকালেন আলেকজান্ডার, “মা, তুমি জানো এ ব্যাপারে আমি কতটা আগ্রহী। পারসীয়রা আমাদেরকে যে অবমাননা করেছে, আমাদেরই ভূমিতে আমাদেরকেই যতটা নিগ্রহ করেছে, সেটার প্রতিশোধ নেয়াই এখন আমার একমাত্র লক্ষ্য। পারস্য সাম্রাজ্যকে মেসিডোনিয়ান শাসনাধীনে না আনা পর্যন্ত আমার শান্তি হবে না।”
“আমি জানি” পুত্রের দিকে তাকিয়ে শেহের হাসি হাসলেন অলিম্পিয়াস। “কিন্তু এতটুকুতেই থামবে কেন? পারস্যের ওপারে পূর্বে আরো বিস্তৃত ভূমি পড়ে আছে।” এবার প্রায় ফিসফিস করে জানালেন, “পূর্বদেশীয় দেবতাদের ভূমি, যেখানে ইন্দাসসহ আরো বিশাল সব নদী বয়ে যায়।”
“পৃথিবীর শেষ মাথা! সমৃদ্ধিশালী সেসব স্থান সম্পর্কে অবশ্য আমিও শুনেছি।” গভীর চিন্তায় পড়ে গেলেন আলেকজান্ডার। ইন্দাস উপত্যকার সোনা আর মূল্যবান সব পাথরসহ স্থানীয়রা পারসীয়দেরকে স্বর্ণধূলির আকারে যে কর দেয় তার বহু গল্পও শুনেছেন। কিন্তু তার মানে তো নিজ দেশ থেকে বহু বছর বাইরে কাটাতে হবে। সেটার যথাযথ মূল্য পাবো তো? তাহলে তো পারস্য সাম্রাজ্য আমাদের বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য হবে।”
