“আমরা কিন্তু কথা বলেছিলাম মিঃ সাহু” বাধা দিল বিজয়। “ডা. দত্তই বলেছেন আপনাকে জানাতে। তখন তো আপনি রাজি হয়েছিলেন।”
“আমি কেবল ভিজিটরস আওয়ারের শেষে মিউজিয়ামে ঢুকতে দিতে রাজি হয়েছি।” এখনো নজর শুধু এলিসের উপর, “যেটা আসলে সরকারের নিয়ম বিরুদ্ধ। কিন্তু আমি মানা করিনি। আমি শুধু মিস টার্নারের আগ্রহটাই জানতে চাইছি। উনি পাবলিক ডিসপ্লের বাইরে থাকা একটা আর্টিফ্যাক্ট দেখতে চাইছেন। নিশ্চয় বুঝতে পারছেন, যে কেউ এসে নিজেকে অ্যার্কিওলজিস্ট দাবি করার সাথে সাথে আমি অনুমতি দিতে পারি না। এমনকি ডা, দত্ত পাঠালেও আমার কিছু করার নেই।”
আগ্রহ নিয়ে আবারো এলিসের দিকে তাকালেন, কিউরেটর।
“আমি একজন অ্যার্কিওলজিস্ট।” খানিকটা উত্তপ্ত হয়েই জানালো এলিস, “এ ব্যাপারে আপনি সন্দেহ করছেন? ইন্টারনেটে আমাকে সার্চ দিন। প্রাচীন গ্রিক ইতিহাস আমার পছন্দের বিষয়। বিশেষ করে হেলেনিস্টিক পিরিয়ড। শুনেছি যে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের সাথে জড়িত একটা নিদর্শন আছে আপনার কাছে; তাই দেখতে এসেছি।”
“আপনার সাথে নিশ্চয় কোনো আইডেন্টিফিকেশন আছে?” এলিসের কথা যেন শুনতেই পাননি এমনভাবে বললেন কিউরেটর, “যেমন ধরুন আইডি কার্ড? আপনার স্বপক্ষে প্রমাণ দেয় এমন কিছু?”
রাগে লাল হয়ে গেল এলিসের গাল। তারপরেও ব্যাগ হাতড়ে গ্রিসে জয়েন্ট মিশনের আইডি কার্ড বের করে সাহুর হাতে দিল। খানিকক্ষণ নেড়েচেড়ে দেখে আবার এলিসকে ফিরিয়ে দিলেন কিউরেটর।
“এবারে আপনি ধাতব প্লেটটা দেখতে পারেন।” পকেট থেকে সিংগল একটা চাবি বের করে জানালেন, “চলুন দেখিয়ে দিচ্ছি। সেকেন্ড ফ্লোরে স্টোর করে রাখা হয়েছে।” অন্যদের দিকে তাকিয়ে খানিকটা অসন্তুষ্টের ভঙ্গিতে জানালেন, “সবাই কী আপনার সাথেই যাবে?”
“হ্যাঁ।” দৃঢ় স্বরে উত্তর দিল এলিস, “থ্যাংক ইউ ভেরি মাচ।”
“ফলো মি” আদেশ দিয়েই হাঁটতে শুরু করলেন কিউরেটর। সিঁড়ি বেয়ে পার হলেন আর্মস অ্যান্ড আর্মার গ্যালারি। এ কক্ষের সর্বত্র কাঁচের কেসে থরে থরে সাজানো
তলোয়ার, বর্শা আর সব ধরনের প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় অস্ত্র। গ্যালারির শেষ মাথায় প্রাইভেট লেখা একটা দরজা। তালা খুললেন সাহু।
সবার মনের মাঝে একটাই চিন্তা; না জানি কী দেখতে পাবে!
.
২৮. এক নতুন রহস্য
রুমটা পুরোপুরি অন্ধকার। মোবাইল ফোনের ফ্ল্যাশ লাইট ব্যবহার করে লাইটের সুইচ অন করল বিজয়। সিলিংয়ের বা চিরে দিল আঁধার। বিস্ময়ে মুখে হাত চাপা দিল এলিস।
সারি সারি তাক ভর্তি বিভিন্ন ধরন আর গড়নের ট্যাবলেট। এমন সব ভাষায় লেখা যার একটাও চেনে না। বুঝতে পারল এ কক্ষ ইতিহাসের এক গুপ্ত ভান্ডার।
ডা. শুক্লারও প্রায় একই অবস্থা। এমনভাবে চারপাশে তাকাচ্ছে যেন তিনি একটা ছোট্ট বাচ্চা; যাকে খেলনার দোকানে ছেড়ে দেয়া হয়েছে আর কোন খেলনাটা নেবে সেটা নিয়ে দ্বিধায় পড়ে গেছে ছোট্ট মানুষটা।
“আমরা যে পাতটা খুঁজছি সেটা কোনটা?” উঁচু গলায় বলে উঠল বিজয়।
“এটা।” কালো রঙের ছোট গোলাকার একটা প্লেট নিয়ে বাকিদেরকে দেখালেন ডা. শুক্লা। ট্যাবলেটের একপাশে খোদাই করা ছয়টা চিহ্নও দেখা যাচ্ছে।
সবাই হা করে তাকিয়ে রইল ট্যাবলেটের দিকে। ছয়টা চিহ্নের কোন অর্থই বুঝতে পারছে না।
ঘড়ির দিকে তাকাবার ভান করলেন সাহু। “আমি আপনাদেরকে পনের মিনিটের বেশি দিতে পারব না। প্লিজ শেষ করে তালা লাগিয়ে যাবেন। আমি অফিসেই থাকব।” আর একটাও কথা না বলে গটগট করে হেঁটে সিঁড়ির কাছে চলে গেলেন কিউরেটর।
এখনো সবাই একদৃষ্টে সিলগুলোই দেখছে।
“তো?” স্থির দৃষ্টিতে খানিকক্ষণ পরীক্ষা করে এলিস জানতে চাইল, “কোনো ধারণা?”
মাথা নাড়লেন ডা. শুক্লা। “কিউবের সাথে কানেকশন আছে এমন কিছুই তো দেখছি না। বোধহয় আমার অনুমান ভুল হয়েছে।” বিব্রত ভঙ্গিতে হেসে ফেললেন, “যাই হোক আশা করা খারাপ না। তবে সত্যি হলে ব্যাপারটা বেশি ভালো হত।”
“আমিও কিছু দেখতে পাচ্ছি না। এই ট্যাবলেটটার আসলে কোনো মানে নেই।” একমত হল বিজয়।
“ওকে, তাহলে চলো বেরিয়ে যাই। রাধার রান্না খেতে হবে তো।” সাগ্রহে হাত ঘষল কলিন।
“দাঁড়াও, কয়েকটা ছবি তুলে নেই।” মোবাইল ফোন বের করে দ্রুত কয়েকটা ছবি তুলে নিল বিজয়।
এরপর রুমে তালা দিয়ে গ্যালারি পার হয়ে এলো। আধো অন্ধকারেও সাজিয়ে রাখা অস্ত্রগুলো দেখতে বেশ ভয়ংকর লাগছে। যুদ্ধের সময় না জানি কতটা ভয়ংকর রূপ ধারণ করত এগুলো।
করিড়োর ধরে সিঁড়ির দিকে যেতেই হঠাৎ করে কানে এল কারো আর্তচিৎকার। ঠিক কিউরেটরের অফিস থেকেই এসেছে শব্দটা। কেউ একজন প্রচন্ড ব্যথায় কাতড়াচ্ছে। তীব্র আক্রোশ নিয়ে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে আরেকজন।
.
সমস্যার পর সমস্যা
অফিসের দিকে হাঁটতে গিয়েও সাহুর মনটা কেন যেন খচখচ করে উঠল। আজ সময়মত চলে যাবার কথা থাকলেও দত্তের অপ্রত্যাশিত ফোনটা সব ভন্ডুল করে দিল। দত্তের অনুরোধ উপেক্ষাও করতে পারলেন না। বিশেষ করে বারবার জানিয়েছেন যে খুব বেশি সময় লাগবে না। কিন্তু একজন আমেরিকান অ্যার্কিওলজিস্ট প্রায় তিন দশক আগে আবিষ্কত একটা অখ্যাত ধাতব পাত নিয়ে কেন এত আগ্রহ দেখাচ্ছে সেটাই তো মাথায় আসছে না। আলেকজান্ডারের বেদিগুলো আবিষ্কার হওয়ার পর সেসময়ে বেশ শোরগোল হলেও আদৌ এগুলো সেই বিখ্যাত স্থাপনা কিনা তা কেউ প্রমাণ করতে পারেনি। দ্রুত আবার ব্যাপারটা সবাই ভুলে গেছে। আর আলেকজান্ডারের বেদিগুলোও এখন পর্যন্ত বলতে গেলে অনাবিষ্কৃতই রয়ে গেছে। মিডিয়াও এ গল্পে আগ্রহ হারিয়ে ফেলায় তখন থেকেই উপর তলায় নির্জীবের মতন পড়ে আছে বেচারা ধাতব প্লেট। মেয়েটা যে কিভাবে এটা জানল সেটা সম্পর্কেও উনার কোনো আইডিয়া নেই। শুধু দত্ত সাহেব ফোন করে জানালেন যে ওর পুরনো বন্ধু ডা. শুক্লা আসতে চায়।
