রাধা ভেবে দেখল যে কেল্লায় ফেরার আগে অন্যদেরকে কিছু খাওয়াতে তো হবেই। জোনগড় এখান থেকে অনেক দূর। যেতে যেতে ক্ষিধের চোটেই মরে যাবে সকলে। কিন্তু তাড়াতাড়ি ডিনার বানাবার আগে চট করে একটু গোসল করে নিলে কেমন হয়?
যেই ভাবা সেই কাজ। শাওয়ার সেরে, কাপড় বদলে রান্না শুরু করল রাধা। শেষ করার পর ঘড়ির দিকে তাকাল; রাত সাড়ে আটটা। বাকিরা এখনো বাইরে কী করছে? জাদুঘরে কি সত্যিই আকষর্ণীয় কিছু পেয়ে গেল নাকি? মনে হল একবার ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করে; তারপর আবার ভাবল না থাক; বিজয় যেহেতু ফোন করছে না তার মানে কোনো না কোনো কারণ নিশ্চয়ই আছে।
টিভির সুইচ অন করে তাই একের পর এক চ্যানেল পাল্টাতে লাগল। ওরা ফিরে এলে সবকিছু একসাথে শুনবে।
.
খতম
প্যাটারসনের ফোনটা কেটে দিয়েই দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ইমরান। টাস্ক ফোর্স লিডারের সাথে তাঁর প্রথম অ্যাসাইনমেন্টেই ঝামেলা লেগে গেছে। সবসময় যুক্তি মেনে চলা, খুঁতখুঁতে স্বভাবের প্যাটারসনের সাথে কাজ করা বেশ দুরূহ ব্যাপার। অন্যদিকে তারকা খ্যাতি নিয়ে আইপিএস ছেড়ে আসা ইমরান। আইবি’তেও বেশির ভাগ সময়ে নিজের মত করেই কাজ করেন। আর তা না। হলে নিয়ম ভঙ্গ করে হলেও কাঙ্ক্ষিত ফলাফল ঠিকই আদায় করে ছাড়েন। যে কোনো ব্যক্তি কিংবা পরিস্থিতিকে সামাল দেয়ার তার ক্ষমতা আর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের শক্তি এ পর্যন্ত উপরঅলার সমীহই জাগিয়েছে কেবল। তাই নিজের কাজ আর অনুমানশক্তি নিয়ে কখনো কোথাও কৈফিয়ত দিতে হয়নি।
কিন্তু প্যাটারসন একেবারে আলাদা। সবসময় ফ্যাক্টস চায়। আর টাইটান কড়কড়া প্রমাণ। টাইটান ফার্মার কেউই যে মেডিকেল ফ্যাসিলিটির ঘটনার সাথে জড়িত আছে, ইমরানের সেই ধারণাকেও এক কথায় খারিজ করে দিল।
“আপনার বক্তব্যে তো নজর দেবার মতন বিশেষ কিছুই পেলাম না।” টাইটান সিএমওর সাথে রাধা আর সিইওর সাথে তার নিজের মিটিংয়ের কথা জানাতেই তেতে উঠলো প্যাটারসন। “আমি কার্ট ওয়ালেসের সাথে কথা বলেছি। ভদ্রলোক শুধু যে পুরো সহযোগিতার নিশ্চয়তা দিয়েছে তা নয় বরঞ্চ ভারত কিংবা ইউএসে তার ম্যানেজমেন্ট টিম থেকে কেউ যে এতে জড়িত নয় তার স্বপক্ষেও জোরালো যুক্তি দেখিয়েছে। এটা তো লোকাল অপারেশন হিসেবেই মনে হচ্ছে না। কোনো গ্লোবাল টেররিস্ট সংস্থার ফান্ডও থাকতে পারে। তাই আমার পরামর্শ হচ্ছে টাইটানকে ধাওয়া বাদ দিয়ে এসবের পেছনকার মাস্টারমাইন্ডকে খুঁজে বের করুন।”
ইমরান একবার ভেবেছিলেন যে হঠাৎ করে এলিসের ভারতে আসা আর কার্ট ওয়ালেসের সাথে তার কানেকশনকে বায়ো-টেররিজমের অ্যাংগেলে দেখার কথা জানাবেন কিনা। তবে প্যাটারসনের অবজ্ঞা পেয়ে সেই ইচ্ছেটাই উঠে গেল। তাছাড়া এলিসের সাথে কথা বলার পর মনে হয়েছে যে নাহ মেয়েটা সত্য কথাই বলছে। গ্রিসে তার অভিজ্ঞতা আর এখানকার ঘটনার মাঝে আসলে কোনো মিল নেই; যদিও ওয়ালেস উভয় ক্ষেত্রেই কমন ফ্যাক্টর।
সেই সাথে মনে পড়ে গেল এলিস স্ট্যাভরস আর পিটারের ছবি দিয়েছে। ছবিগুলো নিয়ে ইন্টারন্যাশনাল ডাটাবেইজ ঘাটাঘাটি করতেই বাজিমাৎ করে দিলেন।
তাড়াতাড়ি বিজয়ের নাম্বারে ফোন করে জানিয়ে দিলেন সবকিছু।
গাড়ি নিয়ে চলে এলেন নিজের বাসায়। চৌকষ গার্ড স্যালুট করতেই ইমরানও উত্তরে হাসলেন। একেবারেই সামান্য বেতন দেয়া এ কনস্টেবলদেরকে কেউ ধন্যবাদ না দিলেও তাদের কাজটা বেশ কঠিন। তিনি নিজে অনেক সিনিয়র পুলিশ অফিসারকে দেখেছেন চলার পথে ওদের দিকে না তাকিয়ে অগ্রাহ্য করতে। তবে ইমরানের ধাঁচ তা নয়। মানুষ হিসেবে অন্তত আরেকজন মানুষের দিকে তাকিয়ে হাসা, কাজের জন্য ধন্যবাদ দেয়াই তো মনুষত্বের পরিচয়।
নিজের অ্যাপার্টমেন্ট ব্লকে পৌঁছে তাই ড্রাইভারকেও হাসিমুখে বিদায় দিলেন ইমরান। গ্রাউন্ড ফ্লোর থেকে লিফটে চড়ে সিক্সথ ফ্লোরে উঠে এলেন ইমরান। লিফট থেকে নামার সাথে সাথে কেন যেন কাঁপতে লাগল ল্যান্ডিংয়ের সিলিং লাইট। মেইনটেন্যান্সের জন্য কমপ্লেইন করার কথা ভাবতে ভাবতে খুলে ফেললেন ঘরের দরজা।
গাঢ় অন্ধকারে ডুবে আছে লিভিং রুম। লাইট অন করেই জানালার কাছে। এগিয়ে গেলেন। বিরক্ত চোখে দেখলেন রাস্তার ওপারে নির্মাণাধীন টাওয়ারের কুৎসিত দৃশ্য। পাঁচটা ফ্লোর সম্পূর্ণ হয়ে গেল, তার অ্যাপার্টমেন্ট সোজাসুজি ছয় নম্বর ফ্লোরটায় এখনো কাজ চলছে। প্রথম দিকে তেমন আমল না দিলেও এখন প্রায় প্রতিদিনই শ্রমিকদেরকে দেখে।
ব্যাপারটা ডেইলি রুটিনের মত হয়ে গেছে। হাউজকিপার কাজ সেরে পর্দা মেলে দিয়ে চলে যায়। আর ইমরান বাসায় ফিরে টাওয়ারের দৃশ্য ঢাকতে আবার টেনে দেয়।
রুমে ঢোকার সাথে সাথে বিপ বিপ করে উঠল ব্ল্যাকবেরি। বেডরুমের দিকে হাঁটতে হাঁটতে ফোনের স্ক্রিন দেখে তো চোয়াল ঝুলে পড়ার জোগাড়।
এই মাত্র পাওয়া টেক্সট মেসেজটা দেখে রীতিমত চমকে উঠলেন। এমনকি পর্দা টানার কথাও ভুলে গেলেন। তাই সিক্সথ ফ্লোরে ছায়ার মধ্যে উঠে দাঁড়ানো লোকটাকেও দেখতে পেলেন না।
বেডরুম থেকে মাত্র দুকদম দূরে থাকতেই ঝনঝন করে ভেঙে পড়ল জানালার কাঁচ। হুশহুশ শব্দ করে কিছু একটা উড়ে এলো রুমে।
সহজাত বোধ আর ট্রেনিংয়ের কল্যাণে সাথে সাথে বুঝে গেলেন কী হচ্ছে। অ্যাপার্টমেন্টের দরজা আর তার মাঝখানে পড়েছে খোলা একটা রকেট প্রপেলড বোমা।
