ফাইলের বেশ কয়েকটা পাতা উল্টে কাঙ্ক্ষিত আর্টিকেলটা বের করে আনল বিজয়। ১৯৮৫ সালের একটা নিউজ আইটেম। পড়ব? তোমরা শুনবে?”
অন্যেরা একযোগে মাথা নেড়ে অপেক্ষা করল বিজয়ের জন্য। “দ্য গ্রেট আলেকজান্ডার নির্মিত বেদির ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে” আর্টিকেলের হেডলাইন পড়ে বাকিটা শোনাল, “ইস উপত্যকার ধ্বংসাবশেষের জন্য ভূমি খনন করতে গিয়ে হোশিয়ারপুর জেলার দাশুয়া শহরে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা অসংখ্য বিশালাকার কাঠামোর কাদা-মাটি দিয়ে তৈরি ইটের ভিত্তি খুঁজে পেয়েছেন। ফাউন্ডেশন অনুযায়ী প্রতিটা কাঠামো অন্তত ১৭ মিটার চওড়া। প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা দেশে ফেরার দীর্ঘ ভ্রমণ শুরু করার আগে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট বীজ (Beas) নদী তীরে যে বারোটা বেদি নির্মাণ করেছিলেন এগুলো তারই ধ্বংসাবশেষ। দুহাজার বছর ধরে লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা এসব বেদিতে আলেকজান্ডারের মৃত্যুর চারশ বছর পরেও ভারতীয় রাজারা উপাসনা করতেন।”
চোখ তুলে অন্যদের দিকে তাকিয়ে বলল, “এবারে এটা শোন। বেদিগুলো পরীক্ষা করে দেখার সময় একটা ভিত্তিপ্রস্তরের নিচে অজ্ঞাত এক কৃষ্ণরঙা ধাতু দিয়ে তৈরি গোলাকার ছোট্ট একটা পাত পাওয়া গেছে। প্রকৃতপক্ষে গ্রিক না হওয়ায় প্লেটটির উৎস নিয়ে রহস্য রয়ে গেছে। এ আবিষ্কার সম্পর্কে পুরো দল মুখ না খুললেও এটুকু জানিয়েছে যে অত্যন্ত প্রাচীন আমলের এই ধাতব পাত আলেকজান্ডারেরও বহু আগের কোনো এক সময়ের হতে পারে। এটির গায়ে খোদাই করা রহস্যময় চিহ্নগুলো হায়ারোগ্লিফিক কিংবা এ জাতীয় চিত্রসদৃশ লেখা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। পরীক্ষা নিরীক্ষা আর সংরক্ষণের জন্য পাতটাকে নিউ দিল্লির ন্যাশনাল মিউজিয়ামে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে।”
হেসে ফেললেন ডা. শুক্লা। বুঝতে পেরেছেন বিজয় এরপর কী বলতে পারে। তার মানে তোমার ধারণা ইউমিনেস উনার চিঠিতে এই পাতটার কথাই লিখে গেছেন?”
“রাইট” টেবিলের উপর ফাইলটাকে রেখে দিল বিজয়। “আমার মনে হয় না এতে তেমন কোনো ভুল আছে। প্রথমত, পাতটা আলেকজান্ডারের চেয়েও বয়সে প্রাচীন। দ্বিতীয়ত, সেটা তাহলে আলেকজান্ডারের নির্মিত বেদির নিচে কিভাবে গেল? যদি না আলেকজান্ডার নিজে সেখানে না রাখেন? ইউমিনেস নিজেই তো বলে গেছেন যে আলেকজান্ডার তা করেছিলেন।”
“তোমার যুক্তিতে এখনো অনেক ফাঁক-ফোকড় আছে বিজয়” কপালে ভাঁজ ফেলে জানাল এলিস, “সবচেয়ে জরুরি কথা হচ্ছে প্রত্নতাত্ত্বিকের ধারণা যে
ধ্বংসাবশেষগুলো আলেকজান্ডারের নির্মিত বেদির হতে পারে। আরো একবার বলছি তাদের কাছেও জোরালো কোনো প্রমাণ নেই। যদি এগুলো এমনই কোনো ধ্বংসাবশেষ হয় যার সাথে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের কোনো সম্পর্কই নেই?”
ভ্রু-কুটি করলেন ডা. শুক্লা, “১৯৮৫ সালে পাতটা আবিষ্কার হয়েছে? কই আমি তো কখনো ন্যাশনাল মিউজিয়ামে তা দেখিনি।”
“তাহলে একবার মিউজিয়ামে ফোন করে জিজ্ঞেস করলে হয় না?” পরামর্শ দিল কলিন। “হয়ত পাবলিক ডিসপ্লেতে রাখা হয়নি। অনেক জাদুঘরই তাদের বেজমেন্টে কার্টন আর ক্রেট ভর্তি জিনিসপত্র রেখে দেয়। কায়রো মিউজিয়ামও এরকম করে; আমি জানি। সাধারণত এ ধরনের নিদর্শন সাধারণ জনগণকে দেখতে দেয়া হয় না। তবে এলিস নিজে একজন অ্যার্কিওলজিস্ট। হয়ত ও বলতে পারে যে গবেষণার জন্য একবার দেখতে চায়।”
মাথা নেড়ে এলিস জানাল, “শিওর। এ পাতের সাথে কিউবের সম্পর্ক আছে কি নেই সেটা জানার জন্য আমার অসম্ভব কৌতূহল হচ্ছে। তাছাড়া জার্নালের কথাগুলো সত্যি, নাকি আলেকজান্ডারকে নিয়ে রচিত আরেকটা কল্পকাহিনি তাও জানা হয়ে যাবে।”
“তাহলে তো চেষ্টা করে দেখতেই হচ্ছে। উঠে দাঁড়িয়ে ডেস্কের উপর নিজের মোবাইল ফোন আনতে গেল বিজয়। “হয়ত এ ব্যাপারে আমি একটু সাহায্য করতে পারি” বললেন ডা. শুক্লা, “ন্যাশনাল মিউজিয়ামে আমার এক কিউরেটর বন্ধু ছিল। ও হয়ত আমাদের জন্য কিছু করতে পারবে।” বিজয়কে নাম্বার দিয়ে দিলেন।
তারপর মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই ডা. শুক্লার বন্ধুর সাথে কথা বলে আর্কিওলজির কিউরেটরের নাম্বার নিয়ে মিউজিয়ামে গিয়ে পাতটাকে পরীক্ষা করার ব্যবস্থা করে ফেলল বিজয়।
কান থেকে ফোন নামাতেই চোখ ভরে উঠল খুশিতে, “দেখা যাক, আমাদের ধারণা কতটা মেলে। তাছাড়া কিউবের ধাঁধার সমাধান করারও কোনো উপায় নেই। আলেকজান্ডারের মাই বা কিভাবে পেলেন সেটাও জানি না। কিন্তু এলিস যেটা বলল যে প্রাচীন এক রহস্যের প্রতিটা অংশকে জোড়া লাগানোটা সত্যিই আনন্দের হবে। একই সাথে জার্নালের গল্পের নির্ভুলতাও প্রমাণিত হবে।”
“মনে রেখো, তুমি কিন্তু বলেছ যে আমরা কিউবের ধাঁধার মীমাংসা করব “ জোর দিল কলিন, “শেষবার কয়েকটা পদ্যের মর্মোদ্ধার করতে গিয়ে সন্ত্রাসীদের সাথে লড়েছি। আরেকটু হলেই স্বর্গবাসী হতে হতো। এবারের আলোচনাটাও মজার হলেও এখানেই এটাকে শেষ করো। মেটাল প্লেটটাকে দেখব। তখনই জানা যাবে ইউমিনেস জোচ্চুরি করেছে কিনা, তারপর ব্যস সব খতম।”
হেসে ফেলল বিজয়, “শিওর, তোমার সাথে আমিও একমত। এবার আমি আর কোনো জেদ করব না। এই কিউবটার সাথে আমাদের কোনো সম্পর্কই নেই। তাই এটার সিক্রেট যাই হোক না কেন, সারাজীবন লুকিয়ে থাকলেই ভালো।”
