চোখ তুলে তাকাল বিজয়। নিস্তব্ধ হয়ে আছে সকলে।
“তার মানে আলেকজান্ডারের পার্চমেন্ট আর তার মায়ের সমাধিতে পাওয়া এলিসের আইভরি কিউবটার মধ্যে কানেকশন আছে।” সবার আগে নিজের মতামত দিল কলিন। “একেবারে প্রথমটা ছাড়া আর সবকটিই তো কিউবের সাথে মিলে যাচ্ছে। কয়েকটা শব্দ মিসিং থাকলেও বুঝতে কোনো কষ্টই হচ্ছে না।”
ডা. শুক্লাও মাথা নাড়লেন। “আমার কেন যেন মনে হচ্ছিল যে এরকমই হবে”, স্বীকার করে জানালেন, “তুমি যখন ব্যাকট্রিয়ার জঙ্গলে ক্যালিসথিনসের মিশনের কথা বললে তখনই আমার পাতা, গাছের ছালসহ বিস্তারিত বর্ণনা দেয়া পদ্যটার কথাই মনে হয়েছে। আর যখন পাঁচ মাথাঅলা সাপের কাছে আলেকজান্ডারের অনুসন্ধান শেষ হবার কথা শুনলাম তখন তো পুরোপুরি নিশ্চিত হয়েছি। একটা পদ্যে কিন্তু সেই প্রবেশদ্বারের রক্ষক হিসেবে পাঁচ মাথাঅলা সাপের কথা লেখা আছে। কিন্তু বুঝতে পারছিলাম না আমার ভাবনার আদৌ কোনো সত্যতা আছে কিনা।
“দিস ইজ ইন্টারেস্টিং” ধীরে ধীরে বলে উঠল এলিস। মনে হচ্ছে বেশ চিন্তা করে তারপর কথা বলছে, “কিউবটাতে প্রাচীন ভারতীয় ভাষায় ভারতীয় দেবতাদের কথাই লেখা হয়েছে। অন্যদিকে আলেকজান্ডারের কাছে যে পার্চমেন্ট ছিল সেখানে ভারতীয় দেবতা গ্রিক দেবতাতে পরিণত হয়েছে। অ্যাপোলো হল সূর্য। পোসিডন শিব। আর কেবল দেবতারাই নয়, পাতাল হল নরক। পার্চমেন্টটা সম্ভবত গ্রিকে লেখা। তার মানে কিউবটা আসলে ভারতে তৈরি হয়েছিল। তারপর কেউ এটাকে গ্রিকে অনুবাদ করেছে। ফলে অরিজিন্যাল সংস্কৃত পদ্যের চেয়ে আরো সহজতর হওয়ায় আলেকজান্ডারের বুঝতে কোনো অসুবিধাই হয়নি।”
“এতে করে আরো একগাদা প্রশ্নের উদয় হল” স্বীকার করল বিজয়। “যেমন ধরো কিউবটা এলো কোথা থেকে? আর সংস্কৃতকে ঘিকেই বা কে অনুবাদ করল? আরো আছে, পার্চমেন্ট অনুসরণ করে কিসের সন্ধানে গিয়েছিলেন তিনি? নিশ্চয় এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে আলেকজান্ডার গ্রিস থেকে ভারতে চলে এসেছেন। ইউমিনেসের মতে দেবতাদের সিক্রেট অনুসন্ধানই ছিল এর উদ্দেশ্য। কিন্তু তাতে কিছুই তো খোলাসা হল না।”
“আচ্ছা চিঠিটা কোথায়?” বিজয়ের কাছে জানতে চাইল এলিস। “তুমি না বলেছিলে জার্নালের সাথে একটা চিঠিও আছে?”
মাথা নেড়ে বিজয় জানাল, “ফুলারের মতে চিঠিটা অনেকটা জার্নালের কাভার লেটারের মত। অলিম্পিয়াসকে উদ্দেশ্য করে ইউমিনেস লিখে গেছেন। ফুলারের বিশ্বাস ইউমিনেস জার্নালসহ এই চিঠিটা অলিম্পিয়াসের কাছে পাঠিয়েছিলেন। হয়ত নিজের মৃত্যুর কয়েকদিন আগে?”
ভ্রু-কুঁচকে ফেলল এলিস, “ইউমিনেস ৩১৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মৃত্যুবরণ করেছেন। অলিম্পিয়াসও তাই। হয়ত চিঠিটা কখনোই পান নি। তাই সম্ভবত ফুলারের ধারণাই সত্যি। আর তারপর কোনো একভাবে সমস্ত ডকুমেন্টস মিশরে পৌঁছে গেছে।” কাঁধ ঝাঁকিয়ে জানাল, “এসবই অনুমান। কোনো প্রমাণ নেই হাতে।”
হেসে ফেলল বিজয়। এলিসের অ্যার্কিওলজিস্ট সত্তাটা বেরিয়ে এসেছে। কোনো ধরনের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন কিংবা প্রমাণ ব্যতীত কেবল ঐতিহাসিক রেকর্ড দেখেই কোনো সিদ্ধান্ত নিতে নারাজ।
“যাই হোক” বিজয় বলল, “চিঠিটা অলিম্পিয়াসকে জানিয়েছে যে ইন্দুস ভূমিতে আলেকজান্ডারের মিশন সফল হয়েছে। আরও লেখা আছে যে রানির নির্দেশ মতন আলেকজান্ডারকে দেয়া ধাতব গোলাকার পাতটাকে মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়েছে। আলেকজান্ডারের স্বর্গীয় পিতা জিউসের বেদির নিচে। ব্যাবিলনে ফিরে যাবার আগে হাইফাঁসিস নদী তীরে আলেকজান্ডার যে বারোটা বেদি নির্মাণ করিয়েছিলেন এটা তাদেরই একটা। দেবতাদের সিক্রেট খুঁজে পাবার জন্য ধাতব পাতটা যে অন্যতম চাবিকাঠি ইউমিনেস সেটাও বারে বারে লিখে গেছেন।”
“তার মানে তোমার ধারণা ধাতব পাতটাকে দেখতে পেলে কিউবের পদ্যগুলোর মমার্থ বোঝা যেত?” বন্ধুর চিন্তার ধারা অনুমান করল কলিন।
“সেটার সম্ভাবনা কিন্তু আছে।” একমত হলেন ডা. শুক্লা। “রাধা যেমনটা বলেছিল কিউবের পদ্যগুলোর কোনো অর্থই বোঝা যাবে না; যদি না রেফারেন্স পয়েন্টটা জানা যায়। আর যদি সত্যিই কোনো মূল্যবান চাবি হয় তাহলে তো পুঁতে ফেলার জন্য অলিম্পিয়াসের কথায় যুক্তি আছে। নিজ পুত্রকে উপহার দেবার পর নিশ্চয় অন্যকারো হাতে পড়ক দেবতাদের এই সিক্রেস্ট, সেটা কাম্য নয়।”
“কিন্তু এখনো আমার মাথায় আসছে না যে অলিম্পিয়াস এই কিউব আর ধাতব পাতটা কোথায় পেয়েছেন?” এলিস কিছুতেই ধোঁয়াশা কাটাতে পারছে না। “উনাকে কে এসব দিয়েছিল? কেন? সমাধিতে একসাথে ধাতব পাওয়া গেলেই বেশি ভাল হত। তাহলে এখন চোখে দেখে পরীক্ষা করা যেত যে আদৌ কিউব আর এটার মাঝে কোনো সম্পর্ক আছে কিনা।”
এলিসের দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে হেসে ফেলল বিজয়। ও এখনো ওদের জন্য অনেক সারপ্রাইজ লুকিয়ে রেখেছে। জার্নালের রেফারেন্স পাওয়া ফাইলের বাক্সের গায়ে চাপড় মেরে বলে উঠল, “তোমাদেরকে একটা ফাইলের কথা জানিয়েছিলাম না যেখানে জার্নালের কথা পেয়েছি? এটাই সেটা। কোনো এক কারণে আমার বাবা সারা বিশ্বব্যাপী হওয়া প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কাজগুলোর একগাদা ডকুমেন্টস আর নিউজ পেপার আর্টিকেল সংগ্রহ করে গেছেন। কেন করেছেন সে ব্যাপারে আমার কোনো ধারণাই নেই। কিন্তু যখন জানালটা পড়েছি, তখনই ফাইলের একটা নিউজ পেপারের কথা মনে পড়েছে।”
