বসার একটু পরেই এগিয়ে এলো মরচে রঙা চুল আর লম্বা, কৃশকায় এক লোক। পরনে ল্যাবরেটরি কোর্ট আর হাবভাবে কর্তৃত্ব দেখে বোঝা গেল যে ডা. বরুণ সাক্সেনা। মুগ্ধ হয়ে গেল রাধা। ভদ্রলোক নিজে এসে লবিতে ওর সাথে দেখা করে উপরে নিয়ে যাবেন এতটা আশাও করেনি। কিন্তু তারপরই তাকে জানানো হল যে রাধা একজন জার্নালিস্ট আর মেডিকেল ফ্যাসিলিটির অগ্নিকাণ্ড সম্পর্কে কাভার করতে এসেছে। বুঝতে পারল কোম্পানি প্রেসকে এড়িয়ে চলতে চাইছে। শোনার সাথে সাথেই কেমন ক্ষিপ্র ভঙ্গিতে কনফার্ম করে দিলেন।
“হ্যালো সিমা” রাধার ভুয়া নাম ধরে অভিবাদন জানাল রোগা লোকটা। তবে চেহারা দেখে বোঝা গেল যে জোর করে হাসছে। তার মানে এই মিটিং নিয়ে তেমন খুশি না; অথচ হাতে কোনো অপশনও নেই। “আমি ডা. বরুণ সাক্সেনা।”
পাল্টা সম্ভাষণ জানিয়ে রাধা বলল, “এত শর্ট নোটিসে আমার সাথে মিটিং করতে রাজি হয়েছেন তাই ধন্যবাদ। আগামীকালকেই এ সংবাদটা ছাপতে চাইছি। তাই যদি আরো কিছু জানা যায়।”
সুযোগটা লুফে নিল সাক্সেনা। “ওহ, আপনি নিশ্চয় বুঝতে পারছেন যে এখানে আর বেশি কিছু বলার নেই। আপনি যা যা জানতে চান বলতে আমার আপত্তি নেই; তবে মনে হয় না তেমন কোনো চটকদার কিছু পাবেন।” পরিবেশকে হালকা করার জন্য হাসার চেষ্টা করে বলল, “চলুন উপরে গিয়ে কথা বলি?”
রাধা মাথা নেড়ে সম্মতি দিতেই দুজন চুপচাপ পাঁচতলায় উঠে এলো। মিটিং রুমে বসার পর সাক্সেনা কফির অর্ডার দিতেই সোজা পয়েন্টে চলে আসার সিদ্ধান্ত নিল রাধা।
“পূর্ব-দিল্লিতে আপনার ফ্যাসিলিটিতে অগ্নিকাণ্ড সম্পর্কে বেশ কিছু গুজব শোনা যাচ্ছে তাই ভাবলাম সত্য খবরটা আপনার কাছেই পাওয়া যাবে।”
“ওহ অবশ্যই, কেন নয়।” দাঁত দেখিয়ে হাসার চেষ্টা করল সাক্সেনা, সেটাই বরঞ্চ ভালো হবে। এবার বলুন আপনি কী শুনেছেন?”
“ওয়েল” রাধা এমনভাবে থেমে গেল যেন নিজের কথাগুলো সাজিয়ে “ নিচ্ছে, “শুনেছি কয়েকটা ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল নাকি ডিসিজি আই অ্যাপ্রুভ করেনি। ভয়ংকর মাইক্রোবস নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করা হচ্ছিল।”
নার্ভাস ভঙ্গিতে হেসে ফেলল সাক্সেনা। মনে হচ্ছে এ প্রশ্নটারই আশঙ্কা করছিল। “আপনি যাই শুনে থাকুন না কেন তা পুরোপুরি মিথ্যা। ফ্যাসিলিটি টাইটান যে সমস্ত ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল করছিল তার সবটুকুই বোর্ড জানে। জিসিজি আইও অ্যাপ্রুভ করেছে। আপনি চাইলে আমার বক্তব্যের স্বপক্ষে পেপারসও দেখাতে পারি। আর প্রাণঘাতী মাইক্রোবসের তো প্রশ্নই উঠে না। আপনি নিশ্চয়ই জানেন যে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল এভাবে কাজ করে না। আর টাইটানের নীতিবোধ নিয়ে আমরা গর্বিত। একজন ভাইরোলজিস্ট হিসেবে এসব হাবিজাবি আমার অজানা থাকার কথা নয়। কিছু হলে আমি ঠিকই টের পেতাম।
“আর ফ্যাসিলিটিতে যে মৃতদেহগুলো পাওয়া গেছে, সেগুলো? এ ব্যাপারে আপনার মত কী?” রাধা জানে যে ইমরান মৃতদেহের কথা এখনো সর্বসাধারণকে জানাননি। কেননা তাহলে গণমাধ্যমের নজরে পড়বে আর তদন্ত বানচাল হবে। তাই সাক্সেনাও নিশ্চয় অপ্রস্তুত হয়ে পড়বে।
সত্যিই তাই, লোকটা যেন আকাশ থেকে পড়ল। বোঝা গেল যে এ প্রশ্ন আসতে পারে ভাবতেই পারেনি। চোখ সরু করে জানাল, “এটা আপনি কোথা থেকে শুনলেন? এটা একেবারেই সত্য নয়। আগুনে কেউ নিহত হয়নি। প্রপার্টি আর ইকুপমেন্টের ক্ষতি হলেও হতাহতের কোনো ঘটনা ঘটেনি।”
দীর্ঘশ্বাস ফেলল রাধা, “ডা, সাক্সেনা আপনি নিশ্চয় জানেন আমাদের মানে জার্নালিস্টদের সোর্সের কোনো অভাব নেই। এমনকি পুলিশেও লোক আছে। আমি যা শুনেছি তার সাথে আপনার কথা মিলছে না। সোর্স অনুযায়ী, দমকল কর্মীরা পৌঁছানোর পর বিল্ডিংয়ে কাউকেই দেখতে পায়নি। স্টাফ, ল্যাব টেকনিশিয়ান, রিসার্চার কেউ ছিল না। সবাই যেন হাওয়া হয়ে গিয়েছিল। কেবল গোপন বেজমেন্টের বাইরে থেকে তালা দেয়া হাইটেক সেলে মৃতদেহগুলো পড়ে ছিল। আমি এও শুনেছি যে বেচারা লোকগুলোকে গুলি করে মারা হয়েছে। তাদের মৃত্যুর কারণ অগ্নিকাণ্ড নয়। আমার মনে হয় আপনার এই কথাটা অন্ত ত সত্যি যে, আগুনে কেউ মারা যায়নি।
সাক্সেনার কাঁধ ঝুলে পড়ল। চেহারাতেও অসন্তুষ্টি। তবে ক্ষণিকের মাঝেই আবার নিজেকে সামলে নিল। তার মানে, হয় সে মিথ্যে বলায় ট্রেনিংপ্রাপ্ত নয়ত এ ধরনের পরিস্থিতি সামাল দিতে পটু।
“ওকে ফাইন” রাধার দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল ডা. সাক্সেনা, “আমি তো ভেবেছিলাম যে এই ব্যাপারে কেউ কিছু জানেনা। দুঃখিত যে আপনাকে মিথ্যে বলেছি। তবে আপনি নিশ্চয় বুঝতে পারছেন যে এ ধরনের পরিস্থিতি আমাদের প্রতিষ্ঠানের জন্য কতটা নাজুক।” মাথা নেড়ে আরো জানাল, “ওইসব মৃতদেহ সেখানে কিভাবে কিংবা কেন এলো সে সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারণাই নেই। বিশ্বাস করুন টাইটানের মূল্যবোধ আর ন্যায়নীতি বেশ কড়া। আমাদের ফাউন্ডার চেয়ারম্যান কার্ট ওয়ালেস শুধু ইউএসে নয় বরঞ্চ সারা বিশ্বব্যাপী সমাদৃত ব্যক্তি। এটা বলছি না যে আমরা সুবোধ। আমাদেরও ভুল হয়। তবে এ ঘটনাটা তো কোনো ভুল নয়। আমাদের ধারণা, ফ্যাসিলিটির মালিক সুমন পাওয়া কোনো এক ধরনের গোপন অপারেশন পরিচালনা করছিল। যদি জানতে চান কেন, তাহলে বলব উনার সাথে কথা বললেই ভালো হবে। তবে পুলিশ যদি খুঁজে পায়, তবে আপনার সোর্স নিশ্চয় এ ব্যাপারে সাহায্য করতে পারবে।” শেষ লাইনটা বেশ জোর দিয়ে বলল ডাক্তার।
