আবার ভ্রু-কুঁচকে ফেললেন অলিম্পিয়াস। এই লোকটার বয়স কত তা জেনে কী হবে? শুধু তো সেই তথ্যটাই দরকার। তাই হালকাভাবে কাঁধ আঁকিয়ে বললেন, “আমি কিভাবে জানব?”
“গত ছয়শ বছর কিংবা তার চেয়েও বেশি সময় ধরে আমি এই পৃথিবীতে হেঁটে বেড়াচ্ছি। বছর গোনা বাদ দিয়ে তাই এখন শুধু দশক হিসাব করি।”
পুরোপুরি সজাগ হয়ে গেলেন অলিম্পিয়াস। এবারে তো তাহলে লোকটার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। ব্যাপারটা সত্যিই আলাদা। দেখে তো চল্লিশের বেশি মনে হচ্ছে না অথচ কিনা বলছে ছয়শ। যদি তার দাবি সত্য হয় তো…
মনে মনে ভেবে দেখলেন রানি। “দেবতাদের সিক্রেট কোথায় লুকানো আছে আমাকে বলো?” সাগ্রহে সামনে ঝুঁকতেই দেখা গেল জ্বলজ্বল করছে চোখ।
“এখান থেকে অনেক দূর, হে রানি” উত্তরে জানাল লোকটা। “ইন্দুস ভূমির এক গোপন স্থানে। এমনভাবে লুকানো আছে যেন অজানা কেউই হাত দিতে না পারে।”
“দুনিয়ার একেবারে শেষে ফিসফিস করে উঠলেন অলিম্পিয়াস। উত্তেজনায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে চেহারা।
“গ্রিকদের মত এত উন্নত একটা জাতি হয়েও পৃথিবী সম্পর্কে আপনি এত কম জানেন দেখে অবাক লাগছে।” বিদ্রূপ করে মন্তব্য করল দার্শনিক লোকটা।
তীব্র দৃষ্টিতে তাকালেন অলিম্পিয়াস। লোকটা তো মহাপাজি। এক আই ব্রো তুলে জানতে চাইলেন কী বলতে চায়।
“আপনার দার্শনিকেরা কি এটাই শেখায়? যে দুনিয়ার শেষ মাথা ইন্দুসের ওপারে? তাহলে আপনার পুত্রও পৃথিবীর শেষ অব্দি পৌঁছানোর জন্য তার বাকি জীবন কাটিয়ে দেবে আর যখন ফিরে আসবে তখন সেই হবে মেসিডোনিয়ার সবচেয়ে জ্ঞানী।” এরপর গলার স্বর নিচু করে জানাল, “আপনাকে জানিয়ে রাখি হে রানি ইন্দুসের ওপারেও ভয়ংকর আর চওড়া সব নদীর ধারে ছড়িয়ে আছে পৃথিবী। আছে শক্তিশালী সব রাজা আর আপনার ধারণারও বাইরে সব অস্ত্র। এসকল ভূমি একদা দেবতাগণ নিয়ন্ত্রণ করতেন। তাই প্রয়োজন মিটে গেলেই যেন ফিরে আসে আপনার পুত্র। নতুবা আপনার আর তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা মিলে মেসিডোনিয়াকে ধ্বংস করে দেবে।”
লোকটার স্পর্ধা দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন রানি অলিম্পিয়াস। কিন্তু তারপরও নিজেকে শান্ত করলেন। কেননা এখনো মোক্ষলাভ হয়নি। বদলে তাই জানতে চাইলেন, “তাহলে আমাকে কী দিতে চাও?”
নিজের ঢোলা পোশাকের পকেট থেকে লুকানো কী যেন বের করে রানির হাতে দিল লোকটা। “পূর্বপুরুষেরা আমাদের জন্য বানিয়ে গেছেন। তবে খোদাইকৃত লেখাগুলো আপনি বুঝতে পারবেন না। কেননা আপনি তো আর আমাদের দেবতাদেরকে চেনেন না!” এরপর একটা পার্চমেন্ট বের করে রানির হাতে দিয়ে জানাল, “এখানে আসার সময় এটা আমি আপনার জন্য বানিয়েছি। শিলালিপি গ্রিকে লেখা। আমি বুঝিয়ে বলব নচেৎ বুঝবেন না। আর এটা” একটু আগেই রানির হাতে দেয়া দুটো জিনিসের একটাকে ইশারা করে বলল, “আমাদের দেশে অবশ্যই ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে। ইন্দুস পার হবার পরে আপনার পুত্র যেন একেবারে গহীনে লুকিয়ে রেখে দেয়। যেন আর কেউ খুঁজে না পায়।” আবার কিছু বলার আগে খানিকক্ষণ বিরতি নিল। চেহারা এবার বেশ সিরিয়াস দেখাচ্ছে, “কিন্তু খুব সাবধান। পুরো ব্যাপারটাই, অত্যন্ত বিপজ্জনক। নির্দেশগুলোকে ঠিকঠাকভাবে না মানলে সামনে কেবল মৃত্যুই আছে।”
জিনিস দুটো হাতে নিতেই উত্তেজনায় কেঁপে উঠল রানি অলিম্পিয়াসের হাত। প্রথমটা দেখে মনে হচ্ছে হাড়ের তৈরি কিউব। নিশ্চয় বেশ প্রাচীন। বয়সের ভারে হলুদ হয়ে গেছে। গায়ে খোদাই করা ভাষাটা সত্যিই অজানা। দ্বিতীয় জিনিসটা হল শিলালিপি খোদাই করা কালো একটা ধাতব পাত। পার্চমেন্টের শিলালিপি বুঝিয়ে দিয়ে কী কী করতে হবে রানিকে সেই নির্দেশনাও দিয়ে দিল লোকটা।
চামড়া সদৃশ্য কাগজের একটা জায়গা দেখিয়ে জানাল, “এখানে গিয়ে আপনার পুত্রকে থামতেই হবে। এর বেশি যেন কিছুতেই না এগোয়। সেখান থেকেই বাসায় ফিরতে হবে অথবা আর ফেরারই অবস্থা থাকবে না।” এদিকে অলিম্পিয়াসের তেমন আর মনোযোগ নেই। চামড়ার উপর চোখ বোলাতেই উত্তেজনা আরো বেড়ে গেল। পুত্র আলেকজান্ডারের জন্য তাঁর পরিকল্পনা এবার সফল হতে চলেছে। এরই মাঝে পুত্রের সাম্রাজ্য বৃদ্ধির ক্ষুধাও টের পেয়েছেন। ফিলিপের রেখে যাওয়া সীমানা বৃদ্ধিই তাঁর কাম্য। আর এবার দেবতাদের সিক্রেট হাতের মুঠোয় চলে আসায় দুনিয়ার বুকে পুত্রের শাসনভার তিনি নিশ্চিত করেই ছাড়বেন। কিন্তু মানুষ হিসেবে নয়। ঈশ্বর হিসেবেই এ পৃথিবী শাসন করবে আলেকজান্ডার।
৩. বর্তমান সময়
তৃতীয় দিন
এক অদ্ভুত ইন্টারভিউ
সিএমওর সাথে মিটিংয়ের জন্য অপেক্ষা করতে করতে ভারতে টাইটান ফার্মাসিউটিক্যালসের হেডকোয়ার্টারের চওড়া লবিটাকে খুঁটে খুঁটে দেখছে রাধা। ইচ্ছে করেই কয়েক ফুট দূরে আরেকটা চামড়ার সোফায় বসে থাকা ইমরানের চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে। দুজনে একই সময়ে পৌঁছালেও এসেছে ভিন্ন ভিন্ন গাড়িতে। আইবির এক ফিল্ড এজেন্ট রাধাকে এখানে দিয়ে গেছে; আবার ফিরিয়েও নিয়ে যাবে।
দালানটা গুড়গাঁওয়ের বেশির ভাগ কর্পোরেট অফিসের মতই সাদামাটা ছয়তলা একটা স্টিল আর গ্লাসের তৈরি কাঠামো। তবে অন্দর মহলে মার্বেলের মেঝে, রিসেপশনে গ্রানাইট কাউন্টার আর লবির একেবারে মাঝখানে একটা ঝরনা থাকায় ব্যবসার সমৃদ্ধি পরিষ্কার ফুটে উঠেছে।
