কলিনের প্রশ্নের উত্তর দিল এলিস। “ফোসিয়ান যুদ্ধ আর গ্রিসের বিস্তৃত ইতিহাসের লেখক। তবে সম্ভবত দ্য ডিডস অব আলেকজান্ডার লিখে সবচেয়ে বেশি পরিচিতি পেয়েছেন। সেখানে আলেকজান্ডারের সবকয়টা অভিযান সম্পর্কে লিখে তাকে দেবত্ব দান করে গেছেন। অনেকেরই মতে, জিউসের পুত্র সম্পর্কিত আলেকজান্ডারের জন্য নিয়ে সেই লোককাহিনির প্রতিষ্ঠাতাও তিনিই। গ্রিকবাসীর দুনিয়ায় সিওয়াতে আলেকজান্ডারের ভ্রমণ আর প্যাম্পিলিয়াতে সমুদ্রের দুভাগ হয়ে যাবার গল্পও তিনিই ছড়িয়েছেন। সেই সিওয়াতেই নাকি ৩৩২ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ওরাকল আলেকজান্ডারকে জিউস আমানের পুত্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তবে নির্মম ব্যাপার হল, তিনিই আলেকজান্ডারকে দেবতা রূপে পরিচিত করেছেন আবার এ কারণে উপহাস করাতেই মৃত্যুবরণও করেছেন।”
“ওয়াও! তার মানে আলেকজান্ডার নিজেকে সত্যিই ঈশ্বর মনে করত নাকি?” কলিন এবারে সত্যিই বিস্মিত হন।
“ইয়েস” ওর অবস্থা দেখে হেসে ফেলল এলিস। “৩২৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মধ্য এশিয়ায় বিজয় লাভের পর আলেকজান্ডার বাল্ক শহরে ক্যাম্প করে ঘোষণা করে দেন যে তাঁকে দেবতা হিসেবেই উপাসনা করতে হবে। পারস্য আর মধ্য এশিয়ায় জয়লাভ, সিওয়ার ওরাকলের স্বীকৃতি, অভিযান সম্পর্কে ক্যালিসথিনসের উচ্চ প্রশংসা সবকিছু মিলিয়ে তাকে বিশ্বাস করিয়েছিল যে তিনি বুঝি সত্যিই ঈশ্বর।”
“অথচ ক্যালিসথিনসই তাকে ঈশ্বর হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকার করেন।” বিড়বিড় করে গত আধঘণ্টা ধরে নিজের রিসার্চ স্মরণ করে নিল বিজয়।
মাথা নেড়ে সম্মত হল এলিস। “কারেক্ট। আর তিনি যে শুধু প্রত্যাখ্যান করেছেন তা না; ইলিয়াডের একটা লাইন উদ্ধৃত করে আলেকজান্ডারকে বলেছেন :
“প্যাট্রোক্লাস তোমার চেয়েও উত্তম ছিল; কিন্তু মৃত্যু তাকেও ছেড়ে দেয়নি।”
“এটা তো এক ধরনের বিপ” মন্তব্য করল কলিন, “মানে লোকটা আরেকটু নরম স্বরে বোঝাতে পারত। কাউকে ঈশ্বর না বলার ক্ষেত্রে আরো তো কত উপায় আছে। বিশেষ করে যখন তার কাছে তলোয়ার থাকে।”
“এই কারণেই আলেকজান্ডার তাকে হত্যার আদেশ দেন। সে সময়ে অবশ্য নিজের বিরুদ্ধ মতের কাউকেই আর সহ্য করতে পারতেন না। একই সময়ে আবার আলেকজান্ডারকে গুপ্ত ঘাতকের হাতে মারার ষড়যন্ত্র হয়। আর সেই ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার মিথ্যে অভিযোগে ক্যালিসথিনসকে বিশ্বাসঘাতকতার দায়ে মেরে ফেলা হয়। আলেকজান্ডার নিজে তাঁকে ক্রুশে দিয়েছেন।
থরথর করে কেঁপে উঠল কলিন, “কী ভয়ংকর। আর ক্যালিসথিনস তার জন্যে এত কিছু করার পরেও আলেকজান্ডার এত বড় বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। তাহলে মেসিডোনিয়ার ইউমিনেস কোত্থেকে আসলো?”
বিজয়ের দিকে তাকিয়ে হাসল এলিস, “বিজয় নিজে যেহেতু একা একা গোপন কিছু রিসার্চ করেছে, তাহলে এটাও সেই জানাক।”
.
২০. ৩৩৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দ
মেসিডোনিয়া, গ্রিস
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটাকে একদৃষ্টে দেখছেন মেসিডোনিয়ার রাজা দ্বিতীয় ফিলিপের স্ত্রী অলিম্পিয়াস। বাদামি দেহত্বক, কালো চোখ আর কৃষ্ণবর্ণের চুলঅলা লোকটার পরনে এমন এক ধরনের সাদা ঢোলা পোশাক যা তিনি আগে আর কখনো দেখেননি। একই সাথে এটাও বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে যে তার কাছেই সেই বিশেষ সংবাদটা আছে। অর্ডারের একেবারে উপর মহল থেকে যদি নিশ্চয়তা না পেতেন তাহলে তো দেখার সাথে সাথে একে বিদায় করে দিতেন। দ্বিতীয়বার চিন্তা করার কোনো প্রয়োজনই হত না।
“আমি শুনেছি তুমি নাকি দেবতাদের সিক্রেট সম্পর্কে অনেক কিছু জানো?” স্থির দৃষ্টি দিয়ে লোকটাকে একেবারে বিদ্ধ করে দিয়ে অবশেষে বলে উঠলেন অলিম্পিয়াস।
মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল সাদা পোশাকধারী, “যা, কিন্তু তারা আপনার দেবতা নন। প্রাচ্যের দেবতা। আমার জনগণের দেবতা। লোকটার উচ্চারণ বেশ অদ্ভুত আর কথাও বলছে ধীরে ধীরে। এই ভাষা বোধহয় তেমন জানে না।
ভ্রুকুটি করলেন অলিম্পিয়াস। লোকটার নির্লিপ্ততা আর তার রাজকীয় পদমর্যাদার প্রতি ঔদাসীন্য দেখে বিরক্ত লাগছে। কিন্তু সেই তথ্যটাও জানা দরকার। অধীর হয়ে এরই জন্য এত অপেক্ষা। তাই নিজের রাগ কমিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নিলেন। একবার যখন পেয়ে যাবেন সেই কাঙ্ক্ষিত বস্তু তখন আর এই উজবুকের ভাগ্য নির্ধারণে ভাবার কিছু থাকবে না।
“আমি তা জানি। সেটা কোনো সমস্যাই না। কার দেবতা তা নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। আমি শুধু সত্যিটা জানতে চাই। ঠিক আছে?”
নির্বিকার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইল বাদামি গাত্রবর্ণ, “এই লোকগাঁথা সম্পূর্ণ সত্য। আমি তার জামিন দিচ্ছি।”
“তুমি যে সত্যি কথা বলছ, সেটাই বা কিভাবে জানব?” জানতে চাইলেন অলিম্পিয়াস।
এবার স্থির দৃষ্টিতে তাকাল লোকটা, “হে রানি, আপনি কী আমাকে সন্দেহ করেন?” এতটা সোজা-সাপ্টা প্রশ্ন শুনে অস্বস্তিতে পড়ে গেলেন অলিম্পিয়াস। হেসে ফেলল লোকটা। “এতটা ঔদ্ধত্য। এত উচ্চাকাভক্ষা আর আমার কথায় যদি ভরসা না থাকত তাহলে এতগুলো নদী আর সমুদ্র পেরিয়ে এখানে আনার ব্যবস্থা করতেন না, নিশ্চয়। তারপরেও আপনার সন্দেহের জন্য ক্ষমা করে দিচ্ছি। যারা জানে না তাদের কাছে এই পুরান বিশ্বাস করা সত্যিই কষ্টকর।”
অলিম্পয়াসের প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য খানিক বিরতি দিয়ে আবার বলল, “ও রানি, আপনার কী মনে হয়? আমার বয়স কত?”
