বিজয়ও মনোযোগ দিয়ে দেখছে, “মনে তো হচ্ছে ডব্লিউ। কিন্তু একটু বেশিই ঢেউ খেলানো। দেখো কোনো সোজা লাইন নেই।” কিছু একটা মনে পড়তেই হঠাৎ করে শক্ত হয়ে গেল।
“কী হয়েছে?” রাধারও চোখে পড়েছে ছেলেটার পরিবর্তন। “মনে হচ্ছে মিসিং ডকুমেন্টসগুলোর একটা আগেও কোথায় যেন দেখেছি।” স্মরণ করতে গিয়ে সরু হয়ে গেল বিজয়ের চোখ, “কোথায় যে কে এস দেখলাম!” উঠে দাঁড়িয়ে রুমের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা কার্টনগুলোর দিকে তাকাল। গত দুই সপ্তাহ ধরে ঘেটে দেখলেও এখন মনে হল, “আবার সবকিছু গোড়া থেকে খুঁজে দেখতে হবে।”
“চলো আমিও হাত লাগাচ্ছি।” একটা কার্টন টেনে নিয়ে খুলে ফেলল রাধা।
মেয়েটার দিকে তাকিয়ে হাসল বিজয়। তারপর নিজেও আরেকটা বাক্স টেনে আনল। এ কারণেই রাধাকে এত ভালোবাসে। বুঝতে পারছে নির্লিপ্ত থাকলেও এলিসের উপস্থিতি মেয়েটা এখনো মেনে নিতে পারেনি। কিন্তু কিছুই বুঝতে না দিয়ে ঠিকই বিজয়ের কাজে সাহায্য করছে। রাধার এই মানসিক শক্তি আর আত্মবিশ্বাসকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করে বিজয়। নিজস্ব প্রয়োজন আর অগ্রাধিকারকে এক পাশে ঠেলে সবসময় প্রাধান্য দেয় তার বন্ধু আর পরিবারকে। ইস, বিজয়ও যদি এমন হতে পারত! এর বদলে ব্যস্ত থাকে নিজের অন্তর্মুখী জগৎ নিয়ে। হঠাৎ করেই মনে পড়ল এলিসের কথা। জানে এমআইটিতে থাকার সময় কেন দুজনের ব্রেক আপ হয়েছে। তারপরও বিজয় বহুবার ভাবতে চেয়েছে কোথায় ওর ভুল হয়েছিল। অবশেষে বুঝতেও পেরেছে। কখনোই এলিসের কাছে মনের দুয়ার খুলে দিতে পারেনি। সিরিয়াস আর চাপা স্বভাবের বিজয় পিতা-মাতার মৃত্যুর পর আরো বেশি করে নিজের মাঝে গুটিয়ে যায়। ঘটে যাওয়া ট্র্যাজেডিকে প্রাণপণে ভুলে থাকতে চেষ্টা করেছে। আর তাই নিজের চারপাশে গড়ে তুলেছে এক দুর্ভেদ্য দেয়াল। আর স্বপ্নের প্রজেক্টটাকে গুরুত্ব দিয়েছে সবচেয়ে বেশি। এলিসের সাথে দেখা হবার পর মনে হয়েছিল এবার বুঝি সবকিছু বদলে যাবে। কিন্তু দুজনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা দেয়ালটা কেন যেন একটুও ভাঙ্গতে পারেনি।
অতঃপর বহুদিন পার হয়ে গেলেও ওকে এভাবে ছেড়ে যাবার জন্য এলিসকে ক্ষমা করতে পারেনি। কথা নেই, বার্তা নেই, এমনকি বিজয়কে বদলাবার কোনো সুযোগও দেয়নি। ফলে নিজের ভুল সত্ত্বেও তিক্ত হয়ে গেছে বিজয়ের মন। অনেক পরে অবশ্য বুঝতে পেরেছে যে এলিস যদি ওর ভুলগুলো দেখিয়েও দিত তার পরেও কোনো লাভ হত না। বিজয় আসলে কোনো ধরনের সম্পর্কের জন্য তৈরিই ছিল না। ব্রেকআপের সেই কষ্ট ভুলতে পুরো দুই বছর লেগেছে। এরপর তো কোনো সম্পর্কের কথা ভাবলেই গায়ে জ্বর আসত। একদিকে তাই নিজের কাজ নিয়ে অসম্ভব ব্যস্ত হয়ে পড়ে আর অন্যদিকে মনে হত যে নিজেকে উজাড় করে দেয়া বুঝি কোনোকালেই সম্ভব হবে না।
আর তারপর রাধার সাথে পরিচয়। বন্ধুত্ব ভালোবাসায় রূপ নিয়েছে বছরখানেক আগে। তাও আবার আঙ্কেল খুন হবার পরে এক অ্যাডভেঞ্চারের মাধ্যমে। তবে যাই ঘটুক না কেন এখন সে প্রকৃতই খুশি। অসম্ভব তৃপ্ত। ওর জন্য রাধার চেয়ে শ্রেষ্ঠ আর কেউই নেই।
“এই তো পাওয়া গেছে!” ভাবনার গভীর সমুদ্র থেকে যেন বিজয়কে টেনে তুলল রাধার কণ্ঠস্বর। মেয়েটা কী পেয়েছে দেখার জন্য চোখ তুলে তাকাল।
রাধার হাতে পাতলা কার্ড বোর্ডের ফাইলের ভেতর রিবন দিয়ে বাঁধা এক তোড়া কাগজ। বোঝা যাচ্ছে কাগজগুলো বহুবার ব্যবহৃত হয়েছে। একেবারে জীর্ণপ্রায়। “কে-এস-১” ঘোষণা করল রাধা।
উজ্জ্বল হয়ে উঠল বিজয়ের চেহারা, “গ্রেট, চলো, ভেতরে কী আছে দেখি।”
“দেখে তো মনে হচ্ছে হাতে লেখা জার্নালের ফটোকপি।” ফাইল খুলে কাগজগুলোতে চোখ বোলাচ্ছে রাধা, “দিস ইজ ইন্টারেস্টিং; তোমার বাবা তো হিস্টোরিয়াল ছিলেন তাই না?”
মাথা নেড়ে সম্মতি দিল বিজয়।
“এ ধরনের জিনিস সংগ্রহে রেখে গেছেন তার মানে নিজের কাজের ব্যাপারে যথেষ্ট উৎসাহী ছিলেন। এটা দ্য গ্রেট আলেকজান্ডারের সময়কার একটা জার্নালের অনুবাদ কপি।”
এমন সময় বেজে উঠল বিজয়ের মোবাইল ফোন। কলিন। ইমরান এসেছেন।
“দুপুর হয়ে গেছে নাকি?” ঘড়ি দেখেই দাঁত বের করে হেসে ফেলল রাধা, “মজা করার সময় আসলে সময়ের হুশ থাকে না।” জার্নালটাকে নেড়ে দেখাল, “প্রথম পাতায় লেখা আছে এটা অত্যন্ত পুরনো এক জার্নালের অনুবাদ, যেটা, কী যেন লোকটার নাম…” নামটাকে ভালোভাবে পড়ে দেখল, “হুম পেয়েছি, ইউমেনিস। অরিজিন্যাল জার্নালটা উনি লিখে গেছেন। তারপর লরেন্স ফুলার নামে আরেকজন সেটা ইংরেজিতে অনুবাদ করেছে।”
রাধার হাত থেকে জার্নালটাকে নিয়ে কয়েকটা পাতা ওল্টালো বিজয়। এটাকে নিরাপদে রাখতে গিয়ে বাবা এতটা কষ্ট করেছেন। জানতে হবে, কেন? একটা নাম দেখে তো আগ্রহ আরো বেড়ে গেল। রাধাকে দেখাতেই বিজয়ের হাত থেকে নিয়ে মনোযোগ সহকারে পড়ে দেখল মেয়েটা। সাথে সাথে উত্তেজনায় উজ্জ্বল হয়ে উঠল ওর চোখ।
.
১৭. টাস্ক ফোর্স সভা
পাথরের সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলো দুজনে। রাধার হাতে একটু আগে পাওয়া জার্নাল। প্ল্যান হল ইমরান চলে গেলেই বিজয়কে নিয়ে একসাথে বসে পড়বে।
দশ মিনিট পরেই গ্লাস লাগানো কফি-টেবিলের চারপাশে একসাথে হল বিজয়, রাধা আর কলিন। গবেষণা কক্ষের দরজায় ডাবল লকড় করে সিরিয়াস ভঙ্গি নিয়ে এসে বসলেন ইমরান। এমনকি অন্যদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময়ের সময়েও শান্ত হয়ে রইলেন।
