ধাঁধার সমাধানের উত্তেজনায় এরই মাঝে জ্বলছে রাধার চোখ। “এই ধাঁধাগুলোরও মর্মোদ্ধার ঠিকই হয়ে যাবে। ভারতীয় স্বভাবই হল এরকম প্রহেলিকা সৃষ্টি করা। যেমন ধরো, শরীরের ইঙ্গিত হল তার ত্রিশূল।”
কাঁধ ঝাঁকাল এলিস, “আমার কোনো ধারণাই নেই এ ব্যাপারে। তোমরাই ভালো জানবে। কিন্তু যেটা খটকা লাগছে তা হল, ভারতীয় শিলালিপি খোদাই করা একটা আইভরি কিউব একটা গ্রিক সমাধিতে কিভাবে পৌঁছাল।”
“এটা অবশ্যই ভারতেরই তৈরি।” বলে উঠলেন ডা. শুক্লা। “শুক্রের উল্লেখও ভারতীয় পুরাণের অংশ। ঋষি ব্ৰিণ্ডর পুত্র হল শুক্র; অসুরের প্রধান ধর্মগুরু। নবজীবন সঞ্চারের বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেছে। আর এই জ্ঞান ব্যবহার করেই দেবতারদের হাতে নিহত দানবদেরকে জীবন ফিরিয়ে দিয়েছে শুক্র।”
“অন্য পাশগুলোতে কী লেখা আছে?” জানতে চাইল বিজয়।
কিউবটাকে উল্টে ফেললেন ডা. শুক্লা। “এটার ভারতীয় হবার আরেকটা প্রমাণ পাওয়া গেল। একপাশে লেখা আছে :
দ্রুত বহতা চোখের ওপাশে
লবণহীন গভীর সমুদ্রের ধারে
নিজেদের ছায়া ফেলল তিন ভ্রাতা
পথ দেখিয়ে দিল তীরের মাথা
যা চলে গেছে পাতালে
সর্পের চিহ্নের গভীর গোপনে
খুঁজে পাবে তোমার কাঙ্ক্ষিত ভূমি।”
মুখ তুলে তাকিয়ে বললেন, “ভারতীয় পুরাণে পাতালের মানে হল পৃথিবীর নিম্নাংশ, নরক। টেকনিক্যালি সাতটা প্রেতলোকের একটা।”
“মানে সত্যিই নরক?” জিজ্ঞেস করল কলিন।
“ঠিক তা না।” শুধরে দিলেন ডা. শুক্লা, নরক তো আসলে পশ্চিমা ধারণা। ভয় দেখিয়ে মানুষকে সত্যের পথে ধরে রাখা। হিন্দু দর্শন কিংবা পুরাণে নরকের এরকম কোনো ধারণা নেই। সত্যিই একটা নিম্নস্থ দুনিয়া। যা আমাদের পৃথিবীর ভূমিতলের নিচে অবস্থিত।”
চারপাশে তাকাল এলিস, “আর কোনো আইডিয়া? আমার মাথায় কিছু আসছে না। কেবল মনে হচ্ছে যে কোথাও যাবার জন্য এক ধরনের নির্দেশনা।”
“আমার মনে হচ্ছে” বলে উঠল কলিন, “পাতালে যাবার জন্য তাড়া দিচ্ছে এই পদ্য। বাস্তবের সাথে তো কোনো সম্পর্ক খুঁজে পাচ্ছি না। পুরোটাই লোককাহিনি না?”
“সম্ভবত সবকটির অনুবাদ করা হলে ভালো একটা আইডিয়া পাওয়া যাবে।” মাঝখানে মন্তব্য করল রাধা। “গো অন পাপা” পিতাকে তাগাদা দিল, “অন্যগুলো কী বলে দেখা যাক।”
.
১৫. আরো কিছু ধাঁধা
“ও. কে, পরেরটা বলছি, আরো একবার কিউবটাকে ঘোরালেন ডা. শুক্লা,
“আর পাথরের চারপাশের ভূমি থেকে
তুলে নাও ফল, পাতা আর বাকল
প্রথমে পাবে অনেক শেকড় আর ফল
গাঢ় বেগুনি, সাদা আর ছাইরঙা খোসা।
কিংবা সবুজ আর বাদামি।
পরেরটার গাত্রবর্ণ বেশ মসৃণ
ভেতরে বেগুনি ফল
তবে সাবধানে থেকো
স্পর্শ করলেই জ্বলে উঠবে তুক।”
“একেবারে নিখুঁত এক নির্দেশনা” বিদ্রূপ করে উঠল কলিন, “যদি জানা থাকে যে কী খুঁজছে।” “কিন্তু এতে করে বোঝা গেল যে এলিস এইমাত্র যা বলল সেটাই ঠিক।” বাধা দিল রাধা, “কোনো একটা অভিযানের গোপন গাইড হচ্ছে এ কিউব। শুধু সমস্যা হচ্ছে এর উদ্দেশ্যটাই জানি না।”
পরের শিলালিপিটা পড়লেন ডা. শুক্লা,
“মনে রেখ, সাহসী অভিযাত্রিগণ
যদি তুচ্ছ করো এসব বাধা
একসাথে ঝাঁপিয়ে পড়বে সব বিপত্তি
সাপের ভয়ংকর দৃষ্টি–
অন্যথায় খোয়াবে
সবচেয়ে মূল্যবান সেই উপহার।”
“ও, কে” আবার বাদ সাধল কলিন, “এই ধাঁধাটার অন্তত একটা লাইনের মর্মোদ্ধার আমিই করতে পারব” অন্যদের দিকে তাকিয়ে সবজান্তার মত হাসল, “এখানে বলা হচ্ছে যদি তুমি নির্দেশগুলোকে নামানো আর সতর্কবাণীকেও তুচ্ছ জ্ঞান করো-সেগুলো যাই হোক না কেন নিজের জীবন হারাবে। এটাই হল সবচেয়ে মূল্যবান উপহার অন্য আর কিছুই হতে পারে না।”
“তোমাদের কথাই বোধহয় ঠিক” চিন্তিত হয়ে পড়ল রাধা, “কিন্তু এখনো বোঝা যাচ্ছে না যে নির্দেশগুলো কোথায় নিয়ে যাবে। এছাড়া একগাদা কল্পনা তো আছেই-শিব, সাপ, ফল, দ্রুত বহতা চক্ষু-এগুলোইবা কিভাবে খুঁজে পাবো?”
“একেবারে শেষেরটা পর্যন্ত অপেক্ষা করো” ছেলে-মেয়েরা যখন কথা বলছে ডা. শুক্লা তখন সর্বশেষ শিলালিপিটা পড়ছেন। এবারে জানালেন, “লেখা আছে :
পূর্ব আর পশ্চিমকে বিভক্ত করে
যে উপত্যকাদ্বয়
এবারে সে প্রবেশদ্বারে যাও
কাজে লাগাও নিজের বুদ্ধিমত্তা
মনে রাখবে তুমি সেথায় যাবে
যেথায় ঘুমায় সূর্য।”
“ওহ, গ্রেট” গুঙ্গিয়ে উঠল কলিন, “এবারে আরেকটা প্রবেশদ্বার আর সূর্যকেও পাওয়া গেল। এটা পাগলামো না তো কী? সূর্যটা আবার কে?”
“উঁহু তা না।”-ভ্রু-কুঁচকে গভীর চিন্তায় ডুবে গেছে রাধা। “সূর্য হচ্ছে ভারতীয় সূর্য দেবতা। সূর্য পূর্ব দিকে উঠে। তার মানে এই ধাঁধায় দুটো উপত্যকার কথা বলা হয়েছে আর নির্দেশানুযায়ী পূর্বদিকেরটাই বেছে নিতে হবে।”
“এটা একটা গুড পয়েন্ট। কিন্তু কোন্ উপত্যকা? আর সূর্য তো পূর্ব থেকে পশ্চিমে যায়। তার মানে পশ্চিম দিকও হতে পারে। দিনের সময়ের উপর নির্ভর করবে।” এতক্ষণে কথা বলল বিজয়।
নিভে গেল রাধার চোখের আলো। “এই ধাঁধাটাকে সমাধা করার জন্য কোনো রেফারেন্স পয়েন্ট তো নেই।” কাঁধ ঝাঁকাতেই কণ্ঠস্বরের অসন্তুষ্টিও বোঝা গেল। “একটা স্টার্টিং পয়েন্ট দরকার, তাহলে বোঝা যাবে যে কোন পাশটা আগে পড়তে হবে। কিংবা এই কিউবটা তৈরির উদ্দেশ্য জানতে হবে। এসব ছাড়া তো মর্মোদ্বার সম্ভব নয়।”
