এলিস নিজেও গভীর চিন্তায় পড়ে গেছে। “হতে পারে” ধীরে ধীরে বলে উঠল, “ড্যামনই বলেছেন; তারপর তারা হোটলে আনার আদেশ দিয়েছেন।”
“আমার সেটা মনে হচ্ছে না” নিজের যুক্তি দিল বিজয়, “তোমার ব্যাখ্যা মানতে হলে বেশ কিছু কাকতালীয় ঘটনা ঘটতে হবে। প্রথম, তোমার আগে ড্যামনকে এটা দেখতে হবে। তা কিন্তু ঘটেনি। ড্যামন স্ট্যাভারসকে জানাবার পর যদি কোনো বিশেষত্ব নাই থাকে তবে আর সবকটিকে বাদ দিয়ে কেন এটাকেই হোটেলে আনতে বলল? অন্যগুলো কেন নয়? আর সবশেষ হল, একমাত্র এটাই তাদের কাছে নেই। এমনকি ছবিও না। তার মানে কিউবটাই আসল কালপ্রিট।”
“কিছুই বুঝতে পারছি না।” উত্তরে জানাল এলিস, “হয়ত তোমার কথাই ঠিক। যুক্তিগুলোও ঠিক আছে। কিউবটাই বোধহয় খুঁজছে। কিন্তু কোনো বিশেষ কিছু তো নয়। তবে হ্যাঁ আইভরি দিয়ে তৈরি আর গায়ে দুর্বোধ্য কিছু লেখা।”
“সমাধিতে পাওয়া পুরনো একটা আইভরি কিউবের জন্য কেন এত মানুষকে মেরে ফেলতে হবে?” বিস্মিত হয়ে গেল কলিন। “কার সমাধি এটা?”
ওর দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল এলিস। “তোমাদেরকে আসলে এই খনন কাজের ব্যাকগ্রাউন্ডটা জানানো উচিত। তাহলে বুঝতে সুবিধা হবে যে আমরা কী খুঁজছি।”
“গাইজ” বাদ সাধল কলিন, “যদি আমরা কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক ধ্বংসস্থান কিংবা সমাধি অথবা এ জাতীয় কিছু নিয়ে আলোচনা করতে চাই, তাহলে আরেকটু আরামদায়ক কোথাও যাওয়া যায় না? এসব আলোচনা যে কেমন হয় তা আমার ভালই জানা আছে। প্লিজ ডাইনিং টেবিলে না।”
হেসে ফেলল বিজয়, “শিওর, স্টাডি?”
“গ্রেট আইডিয়া” খুশি হল কলিন। দুর্গে আঙ্কেলের স্টাড়িটা ওর সত্যিই বেশ পছন্দ। “আজ সূর্যের দেখা মিলেছে তাই আশা করছি দিনটাও ভালো কাটবে।”
সবাই মিলে স্টাডিতে গিয়ে কোণার দিকের কফি টেবিলের চারধারে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসল। পাশের দেয়ালে এলসিডি টিভি।
“আঠারো মাস আগে শুরু করল এলিস, “ওয়ালেস অ্যার্কিওলজিক্যাল ট্রাস্টের হয়ে এই খনন কাজের লিডিং মেম্বার হিসেবে যোগ দিয়েছি।” বন্ধু দুজনের দিকেই তাকাল, “তোমরা মেসিড়নের তৃতীয় আলেকজান্ডার সম্পর্কে কতটা জানোনা?”
“কে?” আরাম করে সাদা চামড়ার কুশনে হেলান দিয়ে জানতে চাইল কলিন, “দ্য গ্রেট আলেকজান্ডারের সাথে জড়িত কেউ?”
দীর্ঘশ্বাস ফেলল এলিস, “তৃতীয় আলেকজান্ডারই হচ্ছেন আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট’।”।
লাজুক হাসল কলিন, “ওহ, সরি, ইতিহাস আসলে আমার জিনিস না।”
“যাই হোক” বলে চলল এলিস, “কয়েকটা কারণে কার্ট ওয়ালেস ব্যক্তিগতভাবে চেয়েছেন যেন আমি এই মিশনে থাকি। তাছাড়া হেলেনিস্টিক ইতিহাসে আগ্রহ থাকায় আমিও রাজি হয়েছি।”
“এই মিশনের বিশেষ কোনো কিছু নিশ্চয় তোমাকে আকর্ষণ করেছে।” বলে উঠল বিজয়। “আমি তোমাকে চিনি। মনে না ধরলে তুমি কিছুতে জড়াও না।”
হাসল এলিস। এই কারণেই বিজয়কে ভালবেসেছিল। কিভাবে যেন ছেলেটা ওর মনের সব কথা টের পায়। তাহলে সম্পর্কটা টিকলো না কেন?
কিন্তু কিছু একটা বলার জন্য মুখ খুলতে যেতেই ঘরে ঢুকল বাটলার শিভজিৎ। “হুকুম, ডা. শুক্লাকে নিয়ে রাধা ম্যাডাম এসেছেন।”
বাবাকে নিয়ে রুমে ঢুকল হাস্যমুখী রাধা, “শিভজিৎ, আমাদের আসার কথা তোমাকে ঘোষণা করতে হবে না।” কিন্তু এলিসকে দেখেই মুছে গেল হাসি।
পরিস্থিতি সামাল দিতে এগিয়ে এলো কলিন। তাড়াতাড়ি করে পরিচিতি দিতে লাগল। জানে বিজয়কে নিয়ে রাধা কতটা পজেসিভ। তাই ঘুণাক্ষরেও এলিসকে বিজয়ের এক্স-গার্লফ্রেন্ড হিসেবে বুঝতে দিল না। বিজয় নিজের সুবিধা মতন কোনো সময়ে পরে সব বুঝিয়ে বলবে।
অন্যদিকে বিজয় উঠে গিয়ে ডা. শুক্লাকে আন্তরিকভাবে জড়িয়ে ধরল। “আপনি এসেছেন দেখে আমি সত্যিই খুশি হয়েছি।”
“ভাবলাম যাই তোমাদের সাথে কিছু সময় কাটিয়ে আসি, গত বছরের পর তো আর কলিনের সাথে দেখা হয়নি।” হেসে ফেললেন ভাষাবিদ।
এবার রাধার দিকে ফিরে চুমু দিল বিজয়, “আমার তো তর সইছিল না।”
পাল্টা হাসি দিল রাধা, “আমারও।”
দুজনে মিলে সোফায় বসল। কলিনের পাশে বসলেন ডা. শুক্লা, “গ্রিসে এলিসের কিছু ভয়ংকর অভিজ্ঞতা হয়েছে।” শুরু করল বিজয়, “ও আমাদেরকে সেসবই জানাচ্ছিল।”
রাধার দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল এলিস। তারপর জানাল, “কার্ট ওয়ালেস আমাকে বললেন যে ওনার টিম এমন একটা সূত্র পেয়েছে যার মাধ্যমে প্রাচীন গ্রিসের সবচেয়ে মূল্যবান এক রহস্যের সমাধান করা যাবে।”
“বিলিওনিয়ার কার্ট ওয়ালেসই ওর খনন কাজের ফান্ড দিয়েছেন।” রাধাকে জানাল কলিন। বুঝতে পেরে মাথা নাড়ল মেয়েটা। “রহস্যটা কী?” আগ্রহী হয়ে উঠলেন ডা. শুক্লা।
“দ্বিতীয় ফিলিপের পত্নী এবং দ্য গ্রেট আলেকজান্ডারের মা অলিম্পিয়াসের সমাধি। কিছুদিন আগ পর্যন্ত এই সমাধির অস্তিত্ব আর লোকেশন সম্পর্কে কোনো প্রমাণ না থাকায় বিস্তর জল্পনা-কল্পনা ছিল। তবে এখন আমি জানি এর অবস্থান।”
নাড়া খেল বিজয়ের স্মৃতি। কি যেন একটা মনে আসি আসি করেও আসছে না। এই নাম। অলিম্পিয়াস। আগেও কোথায় যেন শুনেছে? আর একেবারে সাম্প্রতিক সময়ে। হয়ত গত মাসেই কিংবা তার কিছুদিন আগে। কিন্তু কোথায়? যাই হোক উত্তরটা শুনে কেবল বলল, “ওয়াও, অসাধারণ।”
ওর দিকে তাকিয়ে হাসল এলিস, “তোমরা গ্রিক ইতিহাস নিয়ে কতটা জানো আমি জানি না। কিন্তু রানি হিসেবে উনার রাজত্বকাল ছিল অত্যন্ত বিশৃংখল। আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র চতুর্থ আলেকজান্ডারের জন্য সিংহাসনকে সুরক্ষা করতেই ক্ষমতায় বসেছিলেন। প্রথমে পারডিকাস আর পরে পলিপারচনের সাথে হাত মিলিয়েছেন। মেসিডোনিয়ান জেনারেল হিসেবে তাদের দুজনেরই নিজস্ব উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল। অতঃপর ইফিরাস আর মেসিডোনিয়ার মধ্যে অবরুদ্ধ করার পর সবশেষে ৩১৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে পিড়নাতে ক্যাসান্ডারের হাতে বন্দী হন। আলেকজান্ডারের ভাইসরয় হিসেবে অ্যান্টিপ্যাটারপুত্র ক্যাসান্ডার এশিয়া অভিযানেও এসেছিলেন। যেসব মেসিডোনিয়ানকে রানি মৃত্যুদন্ড দিয়েছিলেন তাদের আত্মীয়রাই পরবর্তীতে তার প্রাণ হরণ করে। তবে এই ষড়ন্ত্রের মূলে ছিল ক্যাসান্ডার। কারণ সে নিজ হাতে কাজটা করতে চায়নি। অলিম্পিয়াসকে ক্যাসাভার এতটা ঘৃণা করত যে তার মৃতদেহও সমাধিস্থ করতে দেয়নি। আদেশ জারি করে যেন তা ছুঁড়ে ফেলে দেয়া হয়। তবে, চুপিসারে ঠিকই তাকে কবর দেয়া ও সম্ভবত ইফিরাসের ফাইরাসের শাসনামলে সমাধিও নির্মিত হয়। যিনি কিনা অলিম্পিয়াদের মতই একজন ইয়াসিড ছিলেন।”
