তবে যত সময় কাটতে লাগল, বিজয়ের বিস্ময় ততই বাড়ছিল। এই প্রচন্ড প্রচেষ্টার পেছনে নিশ্চয়ই কোনো গভীর কারণ আছে।
কিন্তু সেটা কী?
.
১২. তৃতীয় দিন
জোনগড় কেল্লা
নিবিষ্ট মনে কয়েক ঘণ্টা আগে খুঁজে পাওয়া ফাইলটা পড়ছে বিজয়। বিষয়গুলো বেশ চমকে উঠার মতন। ডকুমেন্টগুলোর মধ্যে কোনো কানেকশন আছে বলে মনে হচ্ছে না। তবে কেন এই ফাইলটা তৈরি হয়েছে জানা না থাকলে হয়ত কোন কানেকশন বোঝাও যাবে না।
হঠাৎ করেই মোবাইল ফোন বেজে উঠতে ঘোর ভাঙ্গল। ঘড়িতে দেখা যাচ্ছে রাত তিনটা। এই সময়ে কলিনের কোন্ দরকার পড়ল আবার? তাছাড়া সে তো দুর্গেই আছে!
“তুমি তো আমাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছ?” বন্ধুর কাছে অনুযোগ করল বিজয়।
“বাচালে দোস্ত। এই সময়ে আমার ফোনটা যদি তোমার কাঙ্ক্ষিত হত তাহলে তো চিন্তায় পড়ে যেতাম।” মজা করল কলিন।
হেসে ফেলল বিজয়, “এখন বলো এত রাতে কেন ফোন করেছ?”
খানিক থেমে কলিন জানাল, “আমার মনে হয় তুমি যদি নিচে এসে নিজের চোখে দেখো তাহলে বেশি ভাল হয়।”
“লিভিং রুম?”
“ইয়াপ। দেরি করো না।”
দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফাইলটাকে বন্ধ করে রুমের দরজায় তালা লাগিয়ে দিল বিজয়। রুমটাকে খুঁজে পাবার পর থেকে চাবিটা সবসময় নিজের কাছেই রাখে। আরেকটা ডুপ্লিকেট বানালেও এমন জায়গায় লুকিয়ে রেখেছে যা ও ছাড়া আর কেউ জানে না। একটা লাইফলাইন, বাবা-মায়ের সাথে যোগাযোগের একটা উপায় খুঁজে পেয়েছে। এ সুযোগ সে কখনোই হারাবে না।
মাঝে মাঝে হারিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত বুঝতেই পারবে না যে তোমার কাছে কী ছিল।
আজ রাতটা মনে হচ্ছে সারপ্রাইজের রাত। লিভিং রুমে ঢুকতেই যেন জমে গেল। মনে হচ্ছে ভূত দেখছে। নিজের চোখকেই বিশ্বাস হচ্ছে না।
ধীরে ধীরে নিজেকে শান্ত করে পা রাখল রুমে। কিন্তু কী বলবে কিংবা করবে কিছুই মাথায় আসছে না।
বন্ধুর অবস্থা বুঝতে পারছে কলিন। তাই কিছু বলল না।
“হাই, বিজয়” জড়োসডো ভঙ্গিতে সাদা সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল এলিস। এতক্ষণ কলিনের সাথে বসে থাকলেও এবারে সে নিজেও লজ্জা পাচ্ছে।
কোনো উত্তর দিল না বিজয়। শক্ত হয়ে গেছে চোয়াল। ভ্রু-কুঁচকে কী যেন ভাবছে। এমর কোনো সম্ভাবনা কখনো প্রত্যাশাই করে নি। বহুকষ্টে মনের গহীনে কবর দিয়েছে পুরনো স্মৃতি। ভেবেছে আর কখনো তাদের কথা স্মরণ করবে না। তারপরও আজ আবার সবকিছু মাথাচাড়া দিয়ে উঠল; ঠিক এগারো বছর আগেকার মতই তরতাজা হয়ে। আর সেই সাথে আসা বিভিন্ন অনুভূতিও যথেষ্ট জ্বালাচ্ছে। স্পর্শকাতর এ পথে সে কখনোই ফিরে আসতে চায়নি। কখনোই না। অথচ এখন ঠিক তাই করছে।
অবশেষে খুঁজে পেল কণ্ঠস্বর, “এখন রাত তিনটা বাজে।” যথাসাধ্য নির্লিপ্ত থাকতে চেষ্টা করল বিজয়, “তুমি এখানে কী করছ? বলেছিলে না, আমার সাথে আর কোনো সম্পর্ক রাখতে চাও না? বদলে গেলে কেন?”
“ও বিপদে পড়েছে।” বাধা দিয়ে বলে উঠল কলিন। এলিস উত্তর দেবার আগেই জানাল, “আমাদের সাহায্য দরকার।”
শীতল নীরবতা নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল বিজয়।
“বিজয়, ও সত্যিই ভয়ংকর বিপদে পড়েছে। আমাদের সাহায্য করা উচিত।” আবারো চেষ্টা করল কলিন।
বহুকষ্টে নিজের আবেগ দমন করল বিজয়। “এ জায়গাটা তো ইউএস থেকে অনেক দূর।” আস্তে আস্তে জানাল, “তারপরেও সাহায্যের জন্য এখানে এসেছ তার মানে বেশ মরিয়া হয়ে উঠেছ।”
স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল এলিস। পুরনো ক্ষতটাতে আবার আঘাত পেয়েছে। বুঝতে পারল ভুলে যাবার চেষ্টা করলেও সার্থক হয়নি। “আমি জানি তোমার মনের অবস্থা আর সত্যিই বলছি অন্য কোনো উপায় থাকলে এখানে আর আসতাম না। কিন্তু আমার হাতে আর কোনো অপশন ছিল না।”
গলার স্বর সংযত করল বিজয়, “কী হয়েছে?”
গ্রিসে ঘটে যাওয়া নিষ্ঠুর ঘটনাগুলো খুলে বলল এলিস। ড্যামনের মার্ডার, মারকোর মৃত্যু আর হাইওয়ে ধরে পালিয়ে আসার কথা বলতে গিয়ে কেঁপে উঠল গলা। শেষ করল এই বলে যে, “আমার ইউএসে ফিরে যাবার সুযোগ নেই। যেখানেই যাই না কেন ওরা ঠিকই খুঁজে বের করবে। তাই অন্য কোথাও যাবার কথা ভাবছিলাম। কিন্তু ইউএসের বাইরে এমন কাউকে চিনি না যাকে বিশ্বাস করা যায়। দিল্লিতে কার্ট ওয়ালেসের কজন পরিচিত আছেন। তারাই এয়ারপোর্ট থেকে এ পর্যন্ত আসার জন্য গাড়ি দিয়েছেন। আরো বলেছেন এতে করে নাকি গ্রিসের বাইরে কেউ আর আমার ট্রেস পাবে না। প্রাইভেট জেট। প্রাইভেট কার। কোনো ধরনের পেপার কিংবা ইলেকট্রনিক ট্রেইল থাকবে না।”
একদৃষ্টে বিজয়ের দিকে তাকিয়ে ছেলেটার প্রতিক্রিয়া বুঝতে চাইছে। তবে মনে হচ্ছে এলিসের কাহিনি শুনে খানিকটা নরম হয়েছে।
“কাম অন বিজয়” নীরবতা ভাঙ্গল কলিন, “ওর তো থাকার জায়গা দরকার। সত্যিই বিপদ ওঁৎ পেতে আছে আর তোমার এই কেল্লায় অন্তত পঞ্চাশটা রুম আছে। কয়েকটা রাত কি থাকতে দেবে না?”
প্রথমে বন্ধু তারপর এলিসের দিকে ঘুরল বিজয়, “তোমাকে একটা ব্যাপার মাথায় রাখতে হবে” সিরিয়াস ভঙ্গিতে জানাল, “আসলে আমাদের দুজনকেই। আমার জীবন কিন্তু আগের জায়গায় থেমে নেই। এখন আমি অন্য একজনকে ভালোবাসি। তুমি আর আমি-এসবই অতীত। তাই চাই না তুমি আমার আর রাধার মাঝে আসো।”
“রাধা ওর ফিয়ান্সে” এলিসকে সাহায্য করল কলিন।
