টর্চ হাতে নিয়ে আইবি এজেন্ট আর দমকলকর্মীরা খুব সাবধানে নিচে নেমে গেল। কর্তাব্যক্তিরা যে পালিয়ে গেছে তা তো বোঝাই যাচ্ছে। কিন্তু হয়ত সাহায্যের আশায় নিচে কেউ আটকা পড়ে আছে।
কিন্তু যা পেল তাতে যারপরনাই বিস্মিত হল রেসকিউবাহিনি। বেজমেন্টেও তিনটা লেভেল আছে। নিচের দুই লেভেলে মনে হচ্ছে বসবাসের ব্যবস্থাও আছে। সংকীর্ণ করিডোরে এক সারি ঘোট ঘোট কিউবিকল। কিন্তু কোনো হোটেল কিংবা ডরমিটরি নয়। কেননা ইলেকট্রনিক তালা লাগানো প্রতিটা সেল বাইরে থেকে আটকানো।
তবে সব কজন বাসিন্দাই মৃত। যদিও কারণটা যে শ্বাসকষ্ট নয় এটা বুঝতে ফরেনসিক রিপোর্টের দরকার নেই। আগুন এখানে স্পর্শ না করলেও একজনও জীবিত নেই। বুলেট কেড়ে নিয়েছে প্রাণ।
অর্জুনের দিকে ফিরলেন ইমরান, “একটা আমেরিকান মাল্টিন্যাশনাল, হাহ? ওয়েল, দেখা যাক তাদের ফ্যাসিলিটিতে শ’খানেকেরও বেশি মৃতদেহ নিয়ে কী বলে। ব্যাপারটা আমি ব্যক্তিগতভাবে হ্যাঁন্ডেল করব। এই ফাঁকে তাদের সিইও আর চিফ মেডিকেল অফিসারের সাথে মিটিং করতে চাই। ভারতে তাদের অপারেশন ইতিহাস আর ট্রায়ালের সব তথ্য এনে দাও। ওই দুজনের সাথে দেখা করার আগেই আমি তাদের আগাগোড়া সবকিছু জানতে চাই।”
মাথা নাড়ল অর্জুন, “কাল বিকেলের মাঝেই রিপোর্ট করবো।”
এরপর ইমরানের ইশারা পেয়ে অন্যদের কাছ থেকে আলাদা হয়ে সরে এলো। “আরো দুটো কাজ করতে হবে।” ফিসফিসিয়ে জানালেন আইবি ডিরেক্টর। ধৈর্য ধরে শুনল অর্জুন।
ইমরান শেষ করতেই একেবারে অবাক হয়ে গেল। কিন্তু তারপরও কিছু বলল না; শুধু জানাল, “ঠিক আছে, আমি ব্যবস্থা করছি।” দায়িত্ব পালন করতে চলে গেল অর্জুন।
চারপাশের মৃতদেহ আর সেলগুলোর দিকে তাকালেন ইমরান। গোপন বেজমেন্ট। বুলেট বিদ্ধ শরীর। এখানে আসলে কী হচ্ছিল? যার কারণে ধ্বংস করে দিল পুরো দালান। কোনো প্রমাণ কি মুছে দিতে চেয়েছে? কিসের প্রমাণ? আনোয়ারের সাথে কী ঘটেছে? ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালায় এরকম একটা ফ্যাসিলিটিতেই বা ও কী করছিল?
এত্ত এত্ত প্রশ্ন। কিছু যেন একটা মনে আসি আসি করেও আসছে না। নিজের এই অনুভূতি ইমরান ভালোভাবেই চেনেন। তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় কিছু একটা বলতে চাইছে। গভীর আর গূঢ় এক উদ্দেশ্যের কাভার-আপ ছিল এই বিশাল স্থাপনা।
পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করতেই শক্ত হয়ে গেল চোয়াল। যতদূর যেতে হোক না কেন এই রহস্যের কিনারা তিনি করেই ছাড়বেন।
.
জোনগড় কেল্লা
মাত্র গত সপ্তাহে আবিষ্কৃত রুমটার একেবারে মাঝখানে দাঁড়িয়ে চিবুক চুলকালো বিজয়। অত্যন্ত বিশাল এই দুর্গের পাঁচটা তলাতে পঞ্চাশটিরও বেশি কামরা আছে। আর এক বছর আগে এর উত্তরাধিকার পেলেও সবকটি কক্ষ সাথে সাথেই ঘুরে দেখার চিন্তা মাথাতেও আসেনি। এছাড়া দ্বিতীয় তলার স্টাডি আর তৃতীয় তলায় নিজের বেডরুমেই কেটে যায় বেশিরভাগ সময়। তাই কেল্লার কয়েকটা কামরা দেখলেও বাকিগুলো এখনো অদেখাই রয়ে গেছে।
গত ছয় মাস আগে ভেবে দেখল যে দুৰ্গটা ভালোভাবে চেনা দরকার। আর তা করতে গিয়ে ইন্টারেস্টিং কয়টা রুমও পেয়েছে। তবে মহাভারতের সিক্রেট লুকিয়ে রাখা কামরার মত অতটা চমৎকার নয়। এতে আরেকটা লাভ হয়েছে। জানতে পেরেছে আংকেলের পছন্দ আর অভিপ্রায়সমূহ।
যাই হোক, দুই সপ্তাহ আগে যা পেয়েছে তা পুরোপুরি অপ্রত্যাশিতই বলা চলে। ছাদের ঠিক নিচেই পাঁচতলার একটা কামরা। বৈশিষ্ট্যহীন রুমটাকে দেখে প্রথমে স্টোররুমই মনে হয়েছে। বাদামি কাগজ মোড়ানো বড়সড় কিছু প্যাকেজের পাশাপাশি একগাদা কার্টন স্তূপ করে রাখা।
কৌতূহলের বশে কয়েকটা কার্টন চেক করতেই ‘থ’ বনে গেল। বিজয়ের পনের বছর বয়সে গাড়ি অ্যাক্সিডেন্টে মারা যাওয়া ওর পিতা-মাতার ব্যবহার্য কিছু জিনিস পাওয়া গেল। আঙ্কেলের কাছে শুনেছে একেবারে সরাসরি সামনে থেকে এসে গাড়িটাকে আঘাত করেছে দ্রুত গতির এক ট্রাক। বাবা-মা দুজনেই ঘটনাস্থলে মারা গেছেন। কী কারণে এতদিন পর ভুলে গেলেও একেবারে শেষ মুহূর্তে বাসায় রয়ে গিয়েছিল বিজয়। ফলে বেঁচে গেছে তার জীবন।
কয়েকটা কার্টন পরীক্ষা করতেই বুঝতে পারল বাবা-মায়ের ব্যক্তিগত সবকিছু প্যাক করে এই কেল্লায় এনে রেখে দিয়েছেন আঙ্কেল। তারপর থেকে এগুলো এই রুমেই আছে।
হঠাৎ করে এতদিন পর বাবার কাগজপত্র আর মায়ের জানাল দেখে বুঝতে পারল যে ওদের জন্য ভেতরে কতটা শূন্যতা রয়ে গেছে। আঙ্কেল ভ্রাতুস্পুত্রের যথেষ্ট খেয়াল রেখেছেন। হায়ার স্টাডিজের জন্য এমআইটিতে পাঠানো ছাড়াও ছেলেটাকে কখনো নিজেকে অনাথ ভাবার সুযোগ দেননি। আর বিজয়ও প্রথমে পড়াশোনায় মন দিয়েছে তারপর কাজের ভেতর ডুবে গিয়ে ভুলে গেছে সব ট্র্যাজেডি।
এবারই প্রথম পিতা-মাতার সাক্ষাৎ স্মৃতি চাক্ষুস করে মনটা ভারাক্রান্ত হয়েছে; বিশেষ করে এখন যখন আঙ্কেলও আর পাশে নেই।
সে মুহূর্তেই ঠিক করে ফেলল যে কার্টনগুলোকে শিফট করে বাবা-মায়ের সমস্ত স্মৃতি সযত্নে লালন করবে। কিশোর বয়সেই দুজনকে হারিয়ে ফেলায় ভালভাবে জানার সুযোগও পায়নি। শুধু এটুকু জানে যে তাঁরা দুজনেই এ্যাকাডেমিক হিস্টোরিয়ান আর রিসার্চার ছিলেন। ভারতের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরে কাজ করতেন। এর বেশি কিছু আর মনে নেই। বয়ঃসন্ধিকালের ভালোবাসা আর দ্বন্দের মাঝে দিয়ে তৈরি হওয়া সে সম্পর্ককে এখন অনেক মিস করে। তাই এ রুমে থাকা জিনিসগুলো হয়ত তাকে তার পিতা-মাতার কাছাকাছি নিয়ে যেতে সাহায্য করবে। হোক না তা তাদের মৃত্যুর পর!
