“গুড।” খুশি হল ভ্যান ক্লক। “আমরা ভাইরাসও পেয়ে গেছি। তার মানে এখানকার অপারেশনও শেষ।”
ভ্রু-কুঁচকে তাকাল বিজয়। ভ্যান কুকের কথার অর্থ কিছুই বুঝছে না। তারা তো কেবল সাপ সংগ্রহ করেছে। তাহলে ভাইরাস কোথায় পেল?
“যাই হোক” ব্যাখ্যা করে জানাল ভ্যান, “চলো তাহলে যাই।” তারপর পাথরের মত চোখ করে একদৃষ্টে বিজয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “আর এবার আমার মনে হচ্ছে আমেরিকানরা যেটা বলে সেই “মূল্য পরিশোধের সময় হয়েছে। গত বছর তুমি আমাদেরকে অনেক ভুগিয়েছ। আর এখন আমার মনে হয় তার ইতি টানার সুযোগ এসেছে। তুমি আমাদের সম্পর্কে আর এই অপারেশনের ব্যাপারে অনেক কিছু জেনে গেছ। তাই বুঝতেই পারছ যে তোমাকে আমরা সাথে নিতে পারছি না। তুমি এখানেই থাকবে।”
হতাশায় ডুবে গেল বিজয়। যদিও এই সম্ভাবনার কথা সবসময় মাথায় ছিল; তারপরেও ক্ষীণ আশা করেছিল হয়ত ইউরোপীয় লোকটা তার প্রতিজ্ঞা রাখবে। আরো একটু ভেবে কাজ করা উচিত ছিল। বিশেষ করে বিজয় যখন
ওদের লক্ষ্যের কথা জেনেই ফেলেছে।
তবে এখনো আরেকটা আশা আঁকড়ে ধরে আছে মন। আর সেটা নিজের জন্য নয়।
“কিন্তু রাধাকে তো ছেড়ে দেবে, নাকি?” জিজ্ঞেস করল বিজয়।
অট্টহাসি দিল কুপার, “পারলে তাই করতাম।”
“ও মারা গেছে।” যেন কিছুই হয়নি এমন ভঙ্গিতে খবরটা দিল ভ্যান কুক। “পালানোর চেষ্টা করেছিল; তাই গার্ডেরা গুলি করেছে।” তারপর নিজের লোকদের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে আদেশ দিল, “চলো সবাই!”
নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে জমে গেল বিজয়। মনে হচ্ছে শরীরের সব শক্তি যেন কেউ শুষে নিয়েছে। এতটা কাহিল লাগছে। মাথার মাঝেও শূন্যতা ছাড়া আর কিছু নেই! ধুয়ে, মুছে গেছে সব বোধ বুদ্ধি। দেহের ভার রাখতে না পেরে হাল ছেড়ে দিল দুটো পা। ধপ করে মেঝেতে বসেই হাত দিয়ে মুখ ঢাকল বিজয়।
ভালোবাসার মানুষকে হারাবার বেদনা তার অজানা নয়। পিতা-মাতাকে হারিয়েছে। আঙ্কেলও চলে গেছেন। কিন্তু কোনো ব্যথাই রাধাকে হারাবার মত তীব্র হয়নি। পাটারসন তাকে আগেই বলেছিল সেকথা। কিন্তু নিজের জীবনের চেয়েও যাকে বেশি ভালোবাসে তাকে হারাবার প্রস্তুতি কেউ কিভাবে নেবে?
অস্পষ্টভাবে যে কুয়াশার চাদর ভেদ করে শোনার চেয়েও বলা যায় অনুভব করল যে সবাই চলে যাচ্ছে। কেউ একজন যেন কিছু বলল। ওর হাতে কে যেন একটা সার্চলাইট ধরিয়ে দিল। কিন্তু গম্ভীর হতাশায় ডুবে গেছে পুরো হৃদয়। নিশ্চল হয়ে পড়েছে মন আর মাথা। দুঃসহ এই ক্ষতির বোঝার কাছে সবকিছুই তুচ্ছ।
সিঁড়ি বেয়ে উঠে চলে গেল কুপারের বাহিনি। বিজয়ের হাতে সার্চলাইট দিয়ে গেল কুপার। “আমরা ততটা নিষ্ঠুর নই” দাঁত দেখিয়ে বলল, “তোমার কাছে খানিকটা আলো রেখে যাচ্ছি; অন্তত যতক্ষণ ব্যাটারিটা আছে।”
শূন্য চোখে সামনের দিকে তাকিয়ে কুঁজো হয়ে বসে আছে বিজয়। সিঁড়ি বেয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল ভ্যান কুক আর কুপার।
এতটা শোকাভিভূত হয়ে পড়েছে যে মাথায় কিছুই ঢুকছে না। তাই এ প্রশ্নটাও বুঝতে পারছে না যে, সাপগুলো কখন ভাঙ্গা দরজা আবিষ্কার করে চেম্বারে ঢুকে পড়বে?
.
কোথাও যাবার নেই
বিজয় জানে না যে সংজ্ঞাহীনের মত এক জায়গায় কতক্ষণ ধরে বসে ছিল। কিন্তু প্রচন্ড শব্দে, চেম্বার নড়ে উঠতেই কেঁপে উঠল বিজয়। ভাঙ্গা দরজার পাথরের টুকরোগুলো এসে ভরে গেল মেঝে।
এক মুহূর্তের জন্য কেমন দিশেহারা লাগল। তারপরই বুঝতে পারল যে কী ঘটেছে, কোথায় আছে। ফিরে এলো বোধ বুদ্ধি।
সার্চলাইটের আলোয় চোখে পড়ল সিঁড়ি বেয়ে জলপ্রপাতের মত করে নেমে আসছে ধুলা। বুঝতে পারল কী হচ্ছে। উপরে উঠে টানেলের প্রবেশ মুখ উড়িয়ে দিয়েছে ভ্যান ক্লকের দল। বড় বড় পাথরের চাই দিয়ে মুখটা বন্ধ করে দেবার সময় সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে পড়েছে ধুলা।
ফাঁদে আটকে গেছে বিজয়।
কিন্তু তারচেয়েও বেশি দুঃসংবাদ হল চারপাশে কিছু ঘষা খাওয়ার আওয়াজ হচ্ছে। সার্চলাইটের কিনারে শোনা যাচ্ছে হিসহিস শব্দ। যেটার উৎস অন্ধকারের জগৎ।
চেম্বারের মেঝেতে সার্চলাইটের আলো ফেলতেই আতঙ্কে জমে গেল বিজয়।
এতক্ষণ চেম্বারটাকে খুঁজে পেয়েছে সাপের দল। একের পর এক এদিকেই আসছে।
.
৭২. আক্রমণের ক্ষমতা
কপিকল বেয়ে দলের সবশেষ লোকটাও নেমে এলো নিচে। এরই মাঝে নিচে থেকে তুলে আনা মটকা আর সাপগুলোকে হেলিকপ্টারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পুরো দল এবারে ব্যস্ত হয়ে পড়ল উঠা-নামার যন্ত্রপাতি নিয়ে। সবকিছুকে ট্রাঙ্কে ভরে আবার হেলিকপ্টারে লোড করা হল। চারপাশে নজর রেখেছে ভ্যান ক্লুক।
“দিগন্তে পাখি দেখা যাচ্ছে।” হঠাৎ করেই বলে উঠল দলের একজন।
সবকটা চোখ ঘুরে গেল সেদিকে। থেমে গেল হাতের কাজ। পড়ে রইল ট্রাঙ্ক আর যন্ত্রপাতি।
বহুদূরে পশ্চিম দিক থেকে উড়ে আসছে ছোট্ট দুটো বিন্দু। ক্রমেই অবশ্য বড় হচ্ছে আকার।
হেলিকপ্টার। এদিকেই আসছে।
নিজের বাহিনিকে তাড়া দিল কুপার। ওইসব হেলিকপ্টারে কে আছে না জানলেও এটা ঠিক যে বন্ধুরা নয়। মিশনের এই অংশ সম্পর্কে তাদের মিত্ররা কেউ কিছুই জানে না। তার মানে হেলিকপ্টারের আগমন কোনো সুসংবাদ নয়।
“যাও, যাও, তাড়াতাড়ি!” আরো দ্রুত কাজ সারার জন্য চোটপাট শুরু করল কুপার। লিডারের কণ্ঠের ব্যগ্রতা অনুভব করে হাত চালাল পুরো বাহিনি। সাবধানে প্যাকিংয়ের পরিবর্তে ধুপধাপ করে যন্ত্রগুলো তুলে তুলে ট্রাঙ্কে ভরতে লাগল যেন তাড়াতাড়ি করা যায়।
