বাইবেলে অতীন্দ্রিয় অর্থের সন্ধান করেননি ডারবি একে আক্ষরিক অর্থ উল্লেখকারী দলিল হিসাবে বিবেচনা করেছেন। পয়গম্বর ও বুক অভ রেভেলেশনের লেখকগণ প্রতীকী ভাষায় কথা বলছিলেন না, বরং নিখুঁত পূর্বাভাস দিচ্ছিলেন যা ঠিক তাঁদের ভাষ্যমতোই অচিরে ঘটবে। প্রাচীন মিথসমূহকে এখন অনেক আধুনিক পশ্চিমা ব্যক্তির শনাক্তযোগ্য সত্যের একমাত্র রূপ বাস্তব লোগোই মনে করা হচ্ছিল। ডারবি নিস্তারের গোটা ইতিহাসকে ঐশীগ্রন্থের সযত্ন পাঠ থেকে প্রাপ্ত প্রকল্প সাতটি কাল বা ‘ডিসপেনশনে’ ভাগ করেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন, মানবজাতি যখন এতটাই খারাপ হয়ে ওঠে যে ঈশ্বর তাদের শস্তি দিতে গেলে প্রতিটি ডিসপেনশন সমাপ্তির মুখ দেখে। এর আগের ডিসপেনশনগুলো পতন, প্লাবন ও ক্রাইস্টের ক্রুসিফিক্সনের ভেতর দিয়ে শেষ হয়েছে। মানবজাতি এখন ষষ্ঠ বা পেনাল্টিমেট ডিসপেনশনে বাস করছে, অচিরেই এক নজীরবিহীন বিপর্যয়ের ভেতর দিয়ে ঈশ্বর এর অবসান ঘটাবেন। শেষের আগে সেইন্ট পল যে মিথ্যা উদ্ধারকারীর আবির্ভাবের পূর্বাভাস দিয়ে গেছেন সেই অ্যান্টিক্রাইস্ট” মিথ্যা প্রলোভনে বিশ্বকে প্রতারিত করবে, সবাইকে আয়ত্তে নেবে এবং তারপর মানবজাতির উপর ভোগান্তির একটা কাল অবতীর্ণ করবে। সাত বছর ধরে অ্যান্টিক্রাইস্ট যুদ্ধ চালিয়ে যাবে, অপরিমেয় মানুষকে হত্যা করবে, সকল বিরোধীকে নির্যাতন করবে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ক্রাইস্ট পৃথিবীতে নেমে আসবেন, অ্যান্টিক্রাইস্টকে পরাস্ত করবেন, জেরুজালেমের বাইরে আরমাগেদনের প্রান্তরে শয়তানের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত যুদ্ধে লিপ্ত হবেন তিনি, উদ্বোধন ঘটাবেন সপ্তম ডিসপেনশনের। শেষ বিচারের দিন ইতিহাসের অবসান ঘটানোর আগে হাজার বছর শাসন করবেন তিনি। এটা ছিল ইউরোপের ফিউচার ওয়ার ফ্যান্টাসিরই ধর্মীয় রূপ। সত্যিকারের প্রগতিকে এখানে বিরোধ ও প্রায় সামগ্রিক বিনাশ হিসাবে দেখা হয়েছে। স্বর্গীয় নিস্তারের স্বপ্ন সত্ত্বেও এটা ছিল আধুনিক মৃত্যু আকাঙ্ক্ষা তুলে ধরা বিনাশী দৃষ্টিভঙ্গি। ক্রিশ্চানরা আধুনিক সমাজের চূড়ান্ত অবলুপ্তি কল্পনা করেছে বিকৃত বিস্তারে ও অসুস্থভাবে এর আকাঙ্ক্ষা করেছে।
তবে একটা গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য ছিল। ইউরোপিয়রা যেখানে সবাই আসন্ন সংঘাতের ভোগান্তি ভোগ করার কথা কল্পনা করেছে, ডারবি সেখানে মনোনীতদের উদ্ধারের পথ দেখিয়েছেন। ক্রাইস্টের দ্বিতীয় আগমনের সময় জীবিত ক্রিশ্চানদের ‘মেঘের উপর তুলে নিয়ে যাওয়া হবে..শূন্যে প্রভুর সাথে সাক্ষাতের জন্যে, বিশ্বাসের অধিকারী সেইন্ট পলের চকিত মন্তব্যের ভিত্তিতে তিনি উল্লেখ করেন যে, ভোগান্তি শুরু হওয়ার ঠিক অব্যবহিত আগে এক ‘তুরীয় আনন্দের’ ঘটনা ঘটবে, নবজন্মলাভকারী ক্রিশ্চানদের উর্ধ্বে টেনে নিয়ে যাওয়া হবে, যাদের স্বর্গে তুলে নিয়ে যাওয়া হবে, এভাবে শেষ বিচারের ভয়ঙ্কর কষ্টের হাত থেকে তারা রক্ষা পাবে। প্রিমিলেনিয়ানিস্টরা তুরীয় আনন্দকে নিরেট আক্ষরিক বিস্তারে কল্পনা করেছে। তাদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, নবজন্মলাভকারী পাইলট ও ড্রাইভাররা হাওয়ায় উড়ে যাওয়ায় বাহনগুলো নিয়ন্ত্রণ হারানোয় সহসা এয়ার প্লেন, গাড়ি ও ট্রেইন ধ্বংস হয়ে যাবে। স্টক মার্কেট ধসে পড়বে, সরকারের পতন ঘটবে। অবশিষ্টরা বুঝতে পারবে যে তারা অভিশপ্ত, সত্যিকারের বিশ্বাসীরা সব সময়ই ঠিক ছিল। এই অসুখী মানুষগুলো কেবল কষ্টই সহ্য করবে না, তাদের জন্যে চিরন্তন অভিশাপের নিয়তি অপেক্ষা করে থাকার ব্যাপারটা বুঝতে পারবে। প্রিমিলেনিয়ালিজম ছিল প্রতিশোধের ফ্যান্টাসি: মনোনীতরা স্বর্গ থেকে যারা তাদের বিশ্বাসের প্রতি পরিহাস করেছে, উপেক্ষা করেছে, ঠাট্টা করেছে, তাদের ধর্মবিশ্বাসকে প্রান্তিকায়িত করেছে, আর এখন আর ভুল বোঝার আর সময় নেই যাদের, তাদের দিকে তাকানোর কথা কল্পনা করেছে। আজকের দিনে বহু প্রটেস্ট্যান্ট মৌলবাদীর ঘরে যে জনপ্রিয় ছবিটি চোখে পড়ে সেখানে দেখা যায় বাড়ির সামনে ঘাস কাটার সময় এক লোক দোতলার জানালা দিয়ে তার নবজন্মলাভকারী তুরীয় আনন্দের অধিকারী স্ত্রীর দিকে মহাবিস্ময়ে তাকিয়ে আছে। পৌরাণিক ঘটনার বহু নিরেট বর্ণনার মতো দৃশ্যটিকে খানিকটা অসম্ভব ঠেকে, কিন্তু বর্তমানে এর তুলে ধরা বাস্তবতা নিষ্ঠুর, বিভাজনকারী ও করুণ।
বৈপরীত্যমূলকভাবে সত্যিকারের ধর্মীয় মিথলজির চেয়ে প্রিমিলেনিয়াজিমের বরং এর অপছন্দের সেক্যুলার দর্শনের সাথেই বেশি মিল ছিল। হেগেল, মার্ক্স, ও ডারউইন, এঁরা প্রত্যেকেই বিশ্বাস করতেন যে উন্নতি বিরোধেরই ফল। মার্ক্স আবার ইতিহাসকে এক ইউটোপিয়ায় পর্যবসিত হওয়া ভিন্ন ভিন্ন যুগে ভাগ করেছিলেন। ভূতাত্ত্বিকগণ পাহাড় ও ক্লিফে ফসিলায়িত গাছপালার বিভিন্ন স্তরে পৃথিবীর বিকাশের উপর্যুপরি কালপর্ব আবিষ্কার করেছেন। কারও কারও ধারণা প্রতিটি কালের অবসান ঘটেছে বিপর্যয়ের ভেতর দিয়ে। প্রিমিলেনিয়াল কর্মসূচি যেমন অদ্ভুতই শোনাক না কেন তা উনবিংশ শতাব্দীর বৈজ্ঞানিক ভাবনার একই ধারায় ছিল। অক্ষরবাদীতা ও গণতন্ত্রের দিক থেকেও তা আধুনিক ছিল। কেবল অতীন্দ্রিয় অভিজাত গোষ্ঠীর বোধগম্য কোনও গোপন বা প্রতীকী অর্থের বালাই ছিল না। শিক্ষা যত সামান্যই হোক, প্রতিটি ক্রিশ্চান সত্য আবিষ্কার করতে পারে, সকলের দেখার মতো করেই বাইবেলে তাকে প্রকাশ করা হয়েছে। ঐশীগ্রন্থ যা বলেছে ঠিক তাই বুঝিয়েছে: মিলেনিয়ামের মানে দশ শতাব্দী; ৪৮৫ বছর মানে অতগুলো বছরই; পয়গম্বরগণ ‘ইসরায়েল’ সম্পর্কে কথা বলে থাকলে তাঁরা চার্চের কথা বোঝাননি, বুঝিয়েছেন ইহুদিদের কথাই; রেভেলেশনের লেখকগণ যখন জেরুজালেমের বাইরে আরমাগেদনের প্রান্তরে জেসাস ও শয়তানের যুদ্ধের ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, ঠিক সেভাবেই ব্যাপারটা ঘটবে।১১ নিমেষে বেস্টসেলারে পরিণত হওয়া বাইবেলের প্রিমিলেনিয়াল পাঠ দ্য স্কোফিল্ড রেফারেন্স বাইবেল (১৯০৯) প্রকাশিত হওয়ার পর গড়পড়তা ক্রিশ্চানের পক্ষে অনেক সহজতর হয়ে উঠেছিল। সি. আই. স্কোফিল্ড বাইবেলিয় টেক্সটের সাথে বিস্তারিত টীকাটিপ্পনী দিয়ে নিস্তারের ইতিহাসের এই ডিসপেনশনাল দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাখ্যা করেছেন, এইসব টীকা বহু মৌলবাদীর কাছে খোদ টেক্সটের মতোই কর্তৃত্বমূলক হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
