ফ্রাংকো-প্রুশিয়ান যুদ্ধের পর ইউরোপের জাতিগুলো এক উন্মত্ত অস্ত্র প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠে, ফলে অনিবার্যভাবে এগিয়ে যায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দিকে। যুদ্ধকে তারা ডারউনিয় প্রয়োজনীয়তা হিসাবে দেখতে শুরু করেছিল, যেখানে কেবল যোগ্যতমই টিকে থাকবে। আধুনিক কোনও দেশের অবশ্যই সবচেয়ে বৃহৎ সেনাদল আর বিজ্ঞানের কাছ থেকে পাওয়া সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অস্ত্রশস্ত্র থাকতে হবে। ইউরোপিয়রা মর্মবিদীর্ণ করা দেবত্ব আরোপের ভেতর দিয়ে জাতির আত্মাকে শুদ্ধ করে তোলার যুদ্ধের স্বপ্ন দেখেছে। ব্রিটিশ লেখক আই.এফ. ক্লার্ক দেখিয়েছেন, ১৮৭১ থেকে ১৯১৪ সালের মধ্যে কোনও উপন্যাস বা ছোট গল্পে ইউরোপিয় কোনও কোনও দেশে ভয়ঙ্কর ভবিষ্যতের যুদ্ধের বর্ণনা দেওয়া হয়নি এমন একটিও বছর খুঁজে পাওয়া অস্বাভাবিক ছিল। ‘আগামী মহাযুদ্ধ’-কে ভয়ঙ্কর কিন্তু অনিবার্য বিপদ হিসাবে কল্পনা করা হয়েছে: ধ্বংসের ভেতর দিয়ে জাতি আবার এক নতুন ও বর্ধিত জীবনে উন্নীত হবে। ঊনবিংশ শতাব্দীর একেবারে শেষের দিকে বিটিশ উপন্যাসিক এইচ.জি. ওয়েলস দ্য ওয়ার অভ দ্য ওয়ার্ল্ডস (১৮৯৮) উপন্যাসে এই ইউটোপিয় স্বপ্নকে ফুটো করে দেন, সেটা কোন দিকে যাচ্ছে তাও দেখিয়ে দেন তিনি। বিজাণু অস্ত্রে লন্ডনের জনমানব শূন্য হয়ে যাওয়ার ভীতিকর সব ছবি ফুটে উঠেছিল, ইংল্যান্ডের পথঘাট শরণার্থীতে গিজগিজ করছে। খাঁটি বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে টেনে আনা সামরিক প্রযুক্তিবিদ্যার বিপদ বুঝতে পেরেছিলেন তিনি। ঠিকই করেছিলেন। এই অস্ত্র প্রতিযোগিতা সোম-এর দিকে টেনে নিয়ে গেছে। ১৯১৪ সালে যুদ্ধ শুরু হলে ইউরোপের জনগণ-যারা চল্লিশ বছর ধরে সব যুদ্ধের অবসান ঘটানো যুদ্ধের অপেক্ষা করে আসছিল-সোৎসাহে যোগ দিয়েছিল এই বিরোধে। একে ইউরোপের সমবেত আত্মহত্যা হিসাবে দেখা যেতে পারে। আধুনিকতার সাফল্য সত্ত্বেও সর্বস্ববিধ্বংসী মৃত্যু-ইচ্ছারও অস্তিত্ব ছিল, ইউরোপের জাতিগুলো আত্মধ্বংসের এক বিকৃত ফ্যান্টাসি লালন করছিল।
আমেরিকায় অধিকতর রক্ষণশীল প্রটেস্ট্যান্টরা একই রকম দৃষ্টিভঙ্গির অংশীদার ছিল, তবে তাদের দুঃস্বপ্নের দৃশ্যপট ধর্মীয় চেহারা নিয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও এক ভয়ঙ্কর বিরোধে আক্রান্ত হয়েছিল, ক্লাইমেক্সসুলভ এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল তাতে। উত্তর ও দক্ষিণের রাজ্যগুলোর ভেতরের গৃহযুদ্ধকে (১৮৬১–৬৫) প্রলয়বাদী আলোকে দেখছিল আমেরিকানরা। উত্তরবাসীদের বিশ্বাস ছিল বিরোধের ফলে জাতি শুদ্ধ হয়ে উঠবে; সৈন্যরা ‘গ্লোরি অভ দ্য কামিং অভ দ্য লর্ড,’৫ গেয়েছে। যাজকগণ আলো ও অন্ধকারের শক্তির, মুক্তি ও দাসত্বের যুদ্ধের আরমাগেদনের কথা বলেছেন। তাঁরা এই আগুনের মতো বিপদ থেকে অনেকটা ফিনিক্স পাখির মতো নতুন পুরুষ ও নতুন কালপর্বের আবির্ভাবের প্রত্যাশা করেছেন।৺ কিন্তু আমেরিকাতেও কোনও বেপরোয়া সাহসী জগতের অস্তিত্ব ছিল না। তার বদলে যুদ্ধের শেষ নাগাদ গোটা শহর ধ্বংস হয়ে গেছে, পরিবারগুলো ভেঙে টুকরো টুকরো হয়েছে, এবং শুরু হয়েছিল শ্বেতাঙ্গ দক্ষিণী পাল্টা হামলা। ইউটোপিয়ার বদলে উত্তরের রাজ্যগুলো কৃষিভিত্তিক সমাজ থেকে শিল্পায়িত সমাজে দ্রুত গতির পরিবর্তনের অভিজ্ঞতা লাভ করেছে। নতুন নতুন শহর গড়ে তোলা হয়েছে, পুরোনো শহরগুলো আকারের দিক থেকে বিস্ফোরিত হয়েছে। দক্ষিণ ও পূর্ব ইউরোপ থেকে দলে দলে অভিবাসীরা এসে ভীড় করেছে দেশে। লোহা, তেল ও ইস্পাত শিল্প থেকে পুঁজিবাদীরা দারুণ লাভ হাতিয়ে নিয়েছে; অন্যদিকে শ্রমিকরা ন্যূনতম চাহিদা স্তরের নিচে বাস করেছে। কলেকারখানায় নারী ও শিশুদের শোষণ করা হচ্ছিল: ১৮৯০ সাল নাগাদ প্রতি পাঁচজন শিশুর ভেতর একজন কাজে নিয়োজিত ছিল। কাজের পরিবেশ ছিল খুবই খারাপ, কর্মঘণ্টা দীর্ঘ, যন্ত্রপাতি নিরাপত্তাহীন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল অংশ, বিশেষ করে দক্ষিণ কৃষি নির্ভর রয়ে গিয়েছিল বলে শহর ও পল্লী এলাকার ভেতরও সাগরসম বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছিল। ইউরোপের সমৃদ্ধির আড়ালে এক শূন্যতার অবস্থান থেকে থাকলে ভেতরের সারবস্তু ছাড়াই একটি দেশে পরিণত হতে চলেছিল আমেরিকা।
ইউরোপের মানুষকে এমন মুগ্ধ করে রাখা সেক্যুলার ‘ভবিষ্যৎ যুদ্ধের’ ঘরানা অধিকতর ধার্মিক আমেরিকানদের আকৃষ্ট করতে পারেনি। তার বদলে কেউ কেউ ঈশ্বর ও শয়তানের মাঝে এক চূড়ান্ত লড়াইয়ের কল্পনা করে এই অশুভ সমাজকে উপযুক্ত পরিসমাপ্তির দিকে নিয়ে যাওয়া পরকালতত্ত্বে আরও গভীরতর আগ্রহ সৃষ্টি করে নিয়েছিল। উনবিংশ শতাব্দীতে আমেরিকায় শেকড় গেড়ে বসা নতুন প্রলয়বাদী দৃষ্টিভঙ্গির নাম ছিল প্রি-মিলেনিয়াম, কারণ এখানে হাজার বছরের শাসনকাল সূচিত হওয়ার আগেই ক্রাইস্টের প্রত্যাবর্তন ঘটার কল্পনা করা হয়েছে (তখনও উদার প্রটেস্ট্যান্টদের হাতে চর্চা অব্যাহত থাকা আলোকনের প্রাচীন ও আধিকতর আশাবাদী পোস্টমিলেনিয়ানিজম মানবজাতি আপন প্রয়াসেই ঈশ্বরের রাজ্য উদ্বোধন ঘটানোর কল্পনা করেছিল, কেবল মিলেনিয়াম প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরেই পৃথিবীতে ফিরে আসবেন ক্রাইস্ট)। ইংরেজ জন নেলসন ডারবি (১৮০০-৮২) নতুন প্রি-মিলেনিয়াম প্রচার করেছিলেন; ব্রিটেনে অল্প সংখ্যক অনুসারী পেলেও ১৮৫৯ থেকে ১৮৭৭ সালের ভেতর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় দারুণ প্রশংসিত হন তিনি। তাঁর চোখে আধুনিক বিশ্বে মঙ্গলময় কিছুই ছিল না। ধ্বংসের দিকে ছুটে যাচ্ছে এটা। আলোকনের চিন্তকরা যেমন আশা করেছিলেন তেমনি আরও বেশি করে গুণবান হওয়ার বদলে মাবনাজাতি এতটাই নৈতিকভাবে কলুষিত হয়ে পড়েছে যে ঈশ্বর অচিরেই হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হবেন এবং মানবজাতির উপর অবর্ণনীয় দুর্ভোগ চাপিয়ে দিয়ে তাদের সমাজকে ধ্বংস করে দেবেন। কিন্তু এই অগ্নিময় বিপদের ভেতর থেকে বিশ্বাসী ক্রিশ্চানরা বিজয়ীর বেশে বের হয়ে আসবে, ক্রাইস্টের চূড়ান্ত বিজয় ও মহান রাজ্যেকে উপভোগ করবে।
