ইচ্ছা করেই প্রশ্নের দ্বার উন্মুক্ত রেখে পরম সত্যের সম্ভাবনাকে অস্বীকারকারী আধুনিকতার প্রতি এক ধরনের সাড়া প্রিমিলেনিয়ালিজম নিশ্চয়তার জন্যে লালসার প্রকাশ ঘটায়। আমেরিকান প্রটেস্ট্যান্টরা দীর্ঘদিন ধরে আধুনিক সমাজ কীভাবে কাজ করে তা উপলব্ধি করার যোগ্য বলে বিবেচিত অভিজ্ঞদের প্রতি বৈরী ভাবাপন্ন ছিল। উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে দৃশ্যতঃ কোনও কিছুই আর যেমন মনে হত তেমন ছিল না। এই সময়ে আমেরিকান অর্থনীতি ভয়ঙ্কর উত্থান-পতনের শিকার হয়েছিল, কৃষি জীবনে অভ্যস্ত সাধারণ মানুষের চোখে তা ছিল বিস্ময়কর। চাঙা বাজারের পরপরই দেখা দেওয়া মন্দায় রাতারাতি বিপুল অঙ্কের অর্থ লোকসান হত; সমাজ যেন অদৃশ্য রহস্যময় ‘বাজার শক্তি’তে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে বলে মনে হচ্ছিল। সমাজবিদরা আরও যুক্তি দেখিয়েছেন যে, অদক্ষ পর্যবেক্ষকের চোখে ধরা পড়া সম্ভব ছিল না এমন এক এক অর্থনৈতিক গতিশীলতায় নিয়ন্ত্রিত হচ্ছিল মানুষের জীবন। ডারউইনবাদীরা মানুষকে বুঝিয়েছিল, অস্তিত্ব খালি চোখে অদৃশ্য জীববিজ্ঞানীয় সংগ্রামের অধীন। মনস্তাত্ত্বিকরা গোপন, অবচেতন মনের কথা বলেছেন। হাইয়ার ক্রিটিকরা জোর দিয়েছেন যে, এমনকি খোদ বাইবেল যেমনটা দাবি করা হয়ে এসেছে তেমন কিছু নয়, দৃশ্যতঃ সাধারণ টেক্সট আসলে বিস্ময়কর বিভিন্ন সংখ্যক উৎস থেকে গড়ে তোলা হয়েছে ও কেউ কোনওদিন যাঁদের নাম শোনেনি এমন সব লেখকগণ তা লিখেছেন। যেসব প্রটেস্ট্যান্ট তাদের বিশ্বাস নিরাপত্তা যোগাবে বলে আশা করেছিল, এমনি জটিল এক জগতে মানসিক ঘূর্ণীপাকের শিকারে পরিণত হয় তারা। তারা সবার বোধগম্য সাধারণ ভাষার এক ধর্মবিশ্বাসের আকাঙ্ক্ষা করেছিল।
কিন্তু উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদই সময়ের মূল কথা হওয়ায় গুরুত্বের সাথে নিতে হলে ধর্মেরও যৌক্তিক হওয়ার প্রয়োজন ছিল। কোনও কোনও প্রটেস্ট্যান্ট তাদের ধর্মবিশ্বাসকে যৌক্তিক ও বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক করে তুলতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিল। অন্যান্য লোগোসের মতোই একে স্পষ্ট, প্রকাশযোগ্য ও বস্তুনিষ্ঠ হতে হবে। কিন্তু সামগ্রিক নিশ্চয়তার সন্ধানকারীদের অনেকের কাছেই আধুনিক বিজ্ঞান ছিল বড় বেশি পিচ্ছিল। ডারউইন ও ফ্রয়েডের আবিষ্কার এসেছিল অপ্রমাণিত হাইপথেসিস থেকে, এগুলোকে অধিকতর প্রথাগত প্রটেস্ট্যান্টের কাছে ‘অবৈজ্ঞানিক’ মনে হয়েছে। পরিবর্তে তারা ফ্রান্সিস বেকনের আদি বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির শরণ নিয়েছে, এমনি আঁচ অনুমানের কোনও ফুরসত যাঁর ছিল না। বেকন বিশ্বাস করতেন, আমরা আমাদের ইন্দ্রিয়গুলোকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করতে পারি, কারণ এগুলোই আমাদের সঠিক তথ্য যোগাতে সক্ষম। তিনি নিশ্চিত ছিলেন যে, সর্বজ্ঞ ঈশ্বরের যৌক্তিক নীতিমালায় বিশ্বকে সংগঠিত করা হয়েছে। কোনও আজগুবী ধারণা তৈরি নয়, বিজ্ঞানের কাজ হচ্ছে বিভিন্ন ঘটনাকে শ্রেণীবদ্ধ করা ও সবার কাছে স্পষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে আবিষ্কারকে তত্ত্বে রূপান্তরিত করা। কান্টের বস্তুনিষ্ঠ জ্ঞান তত্ত্বের বিরোধী অষ্টম শতাব্দীর স্কটিশ আলোকনের দর্শনের প্রতিও আকৃষ্ট হয়েছিল প্রটেস্ট্যান্টরা, এবং দাবি করেছে যে সত্য বাস্তব এবং ‘সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান[১২] আছে এমন যেকোনও আন্তরিক মানবসন্তানের কাছে তা পাওয়া যাবে। নিশ্চয়তার এই কামনা ছিল আধুনিক অভিজ্ঞতার একেবারে মূলে ওৎ পেতে থাকা শূন্যতাকে-সম্পূর্ণ যৌক্তিক মানুষের চেতনায় ঈশ্বর-সম গহ্বর-পূরণ করার প্রয়াস। আমেরিকান প্রটেস্ট্যান্ট আর্থার পিয়ারসন বাইবেলকে ‘সত্যিকারের বৈজ্ঞানিক ও নিরপেক্ষ চেতনায়’ পরখ করতে চেয়েছিলেন। তাঁর বইয়ের শিরোনামই-ম্যানি ইনফ্যালিবল প্রুফস (১৮৯৫)-ধর্ম থেকে তিনি কী ধরনের নিশ্চয়তার সন্ধান করছিলেন তা দেখিয়ে দেয়:
আমি…কোনও প্রকল্প দিয়ে শুরু হয়ে তারপর তথ্য ও দর্শনকে আমাদের ডগমার সাথে খাপ খাওয়ার জন্যে সাজায় না, বরং প্রথমে ঈশ্বরের বাণীর শিক্ষাকে একত্রিত করে তারপর তথ্যমালাকে সাজানোর মতো কিছু সাধারণ বিধানের সন্ধানকারী বেকনিয় ব্যবস্থার বাইবেলিয় সেইসব ধর্মতত্ত্ব পছন্দ করি।১৩
বোধগম্য ইচ্ছা ছিল এটা, কিন্তু বাইবেলের মিথোই পিয়ারসনর প্রত্যাশা অনুযায়ী কোনও দিনই তথ্যভিত্তিক হওয়ার ভান করেনি। অতীন্দ্রিয় ভাষাকে কখনওই এর রেইজন দ’এতরে—মূল সত্তা-না খুইয়ে যুক্তিভিত্তিক ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। কবিতার মতো তা এমন সব অর্থ ধারণ করে যাকে অন্য যেকোনওভাবে প্রকাশ করার পক্ষে অধরাই রয়ে যায়। ধর্মতত্ত্ব যখনই বিজ্ঞানে পরিণত হওয়ার চেষ্টা করে, তখন তা কেবল যৌক্তিক ডিসকোর্সের একটা ক্যারিকেচারের জন্ম দিতে পারে, কারণ এইসব সত্যি বৈজ্ঞানিক প্রদর্শনীর পক্ষে মানানসই নয়।১৪ এই মিথ্যা ধৰ্মীয় লোগোস অনিবার্যভাবে ধর্মকে আরও কুখ্যাতি এনে দেবে।
নিউ জার্সির প্রিন্সটনের নিউ লাইটস প্রেসবিটারিয়ান সেমিনারি এই বৈজ্ঞানিক প্রটেস্ট্যান্ট মতবাদের শক্তঘাঁটিতে পরিণত হয়েছিল। ‘শক্তঘাঁটি’ কথাটা মানানসই, কারণ যৌক্তিক ক্রিশ্চান ধর্মের প্রচারণা অনেক সময় উগ্র ইমেজারি ব্যবহার করেছে, একে বরাবরই আত্মরক্ষামূলক মনে হয়েছে। ১৮৭৩ সালে প্রিন্সটনের ধর্মতত্ত্বের চেয়ারের অধিকারী চার্লস হজ তাঁর দুই খণ্ডের রচনা সিস্টেমেটিক থিওলজি’র প্রথম খণ্ড প্রকাশ করেন। আবারও, শিরোনাম এর বৈজ্ঞানিক পক্ষপাত তুলে ধরছে। শব্দের অতীত কোনও অর্থের সন্ধান করা ধর্মবেত্তার কাজ নয়, জোরের সাথে বলেছেন হজ, বরং তাঁকে স্রেফ ঐশীগ্রন্থের স্পষ্ট শিক্ষাকে সাধারণ সত্যের একটা ব্যবস্থায় বিন্যস্ত করতে হবে। বাইবেলের প্রতিটি শব্দ ঐশী অনুপ্রাণিত, একে অবশ্যই গুরুত্বের সাথে নিতে হবে; একে কোনওভাবেই উপমাগত বা প্রতীকী ব্যাখ্যা দিয়ে বিকৃত করা চলবে না। ১৮৭৮ সালে পিতার আসনের উত্তরাধিকারী হওয়া চার্লসের ছেলে আর্চিবল্ড এ. হজ বাইবেলের আক্ষরিক সত্যের পক্ষে অবস্থান নিয়ে তরুণ সহকর্মী বেনজামিন ওয়ারফিল্ডের সাথে দ্য প্রিন্সটন রিভিউ প্ৰকাশ করেন। নিবন্ধটি ধ্রুপদী হয়ে ওঠে। বাইবেলের সমস্ত কাহিনী ও বিবৃতি ‘চরমভাবে ভ্রান্তিহীন এবং বিশ্বাস ও পরিপালনের জন্যে বাধ্যতামূলক।’ বাইবেল কিছু যা বলেছে তার সবই ‘তথ্যের পরম সত্যি।’ বাইবেল অনুপ্রাণিত হয়ে থাকলে অবশ্যই অনুপ্রাণিত,১৬ একটি প্যাচানো যুক্তি যা আর যাই হোক বৈজ্ঞানিক নয়। এমন দৃষ্টিভঙ্গির কোনও যৌক্তিক বাস্তবতা নেই, যেকোনও বিকল্পের পক্ষে রুদ্ধ ও কেবল নিজের ক্ষেত্রেই সামঞ্জস্যপূর্ণ। কেবল যুক্তির উপর প্রিন্সটনের আস্থা একে আধুনিকতার সারিতে দাঁড় করিয়েছে বটে, কিন্তু এর দাবি ছিল তথ্য থেকে দুরস্ত। “ক্রিশ্চান ধর্ম সঠিক যুক্তির সাহায্যে এর আবেদন সৃষ্টি করেছে,’ পরের এক নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন ওয়ারফিল্ড। ‘কেবল যুক্তির উপর ভর করেই প্রাধান্যের পথে এতদূর এগিয়ে এসেছে এবং কেবল যুক্তির মাধ্যমেই তা সব শত্রুকে পদদলিত করবে।’১৭ ক্রিশ্চান ইতিহাসে চোখ বোলালে আমরা দেখতে পাই যে, প্রাক আধুনিক সকল ধর্মের মতো যুক্তি কেবল পৌরাণিক প্রেক্ষাপটেই অনুশীলন করা হয়েছে। ক্রিশ্চান ধর্ম ‘সঠিক যুক্তি’র-যা কখনওই ক্রিশ্চান ধর্ম বিশ্বাসের ‘একক’ আবেদন ছিল না-চেয়ে বরং অতীন্দ্রিয়বাদ, স্বজ্ঞা ও লিটার্জির উপর নির্ভর করেছে। ওয়ারফিল্ডের উগ্র ইমেজারি, বিশ্বাসের ‘প্রতিপক্ষ’কে যা যুক্তি দিয়ে বিভ্রান্ত করার আশা করে, সম্ভবত এক গোপন নিরাপত্তাহীনতা তুলে ধরে। ক্রিশ্চান বিশ্বাস আদতেই এমন স্পষ্ট ও স্ব-প্রকাশিত হয়ে থাকলে এত মানুষ কেন তবে একে গ্রহণে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে?
