বাবি বিদ্রোহকে আধুনিকতার অন্যতম মহান বিপ্লব হিসাবে দেখা যেতে পারে। ইরানে তা একটা প্যাটার্ন তৈরি করে দিয়েছিল। বিংশ শতাব্দীতে আরও উপলক্ষ্যে যাজক ও সাধারণ মানুষ, সেক্যুলারিস্ট ও অতীন্দ্রিয়বাদী, বিশ্বাসী ও নাস্তিক, সকলেই একসাথে নিপীড়ক ইরানি সরকারের বিরোধিতা করবে। শিয়াদের কাছে পবিত্র মূল্যবোধে পরিণত ন্যায়বিচারের জন্যে যুদ্ধ ইরানের পরের প্রজন্মগুলোকে শাহ’র সেনাদলকে মোকাবিলা করে এক নতুন ব্যবস্থার সূচনা ঘটাতে উৎসাহিত করবে। অন্তত দুটি উপলক্ষ্যে, শিয়া আদর্শ ইরানিদের দেশে আধুনিক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে সক্ষম করে তুলবে। আবারও, বাবি বিপ্লব দেখিয়ে দিয়েছিল যে, ধর্ম মানুষকে আধুনিকতার আদর্শ ও উৎসাহ উদ্দীপনাকে অচেনা সেক্যুলার পরিভাষা থেকে তাদের বোধগম্য ভাষা, মিথলজি ও আধ্যাত্মিকতায় অনুবাদ করে উপলব্ধি করতে ও সেগুলোকে আপন করে নিতে সাহায্য করতে পারে। পশ্চিমের ক্রিশ্চানদের পক্ষে আধুনিকতা কঠিন প্রমাণিত হয়ে থাকলে ইহুদি ও মুসলিমদের জন্যে আরও বেশি সমস্যাসঙ্কুল ছিল। এর জন্যে প্রয়োজন হয়েছিল সংগ্রামের-ইসলামের পরিভাষায়, জিহাদ-অনেক সময় যা পবিত্র যুদ্ধে পরিণত হতে পারে।
০৫. যুদ্ধরেখা (১৯৭০-১৯০০)
উনবিংশ শতাব্দীর শেষ নাগাদ এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, পশ্চিমে অবশেষে পূর্ণভাবে বিকশিত নতুন সমাজ আসলে যেমনটা অনেকে কল্পনা করেছিল সেরকম সর্বরোগের মহৌষধ জাতীয় কিছু নয়। হেগেলের দর্শনকে অনুপ্রাণিত করা গতিশীল আশাবাদ বিভ্রান্তিকর সন্দেহ ও অস্থিরতার পথ খুলে দিয়েছিল। একদিকে ক্রমশঃ শক্তিশালী থেকে শক্তিশালী হয়ে উঠছিল ইংল্যান্ড; শিল্প বিপ্লব কোনও কোনও জাতি রাষ্ট্রকে তাদের অতীতের যেকোনও সময়ে অর্জিত সম্পদ ও শক্তি থেকে অনেক বেশি কিছু এনে দেওয়ায় এক ধরনের আস্থা ও প্রভুত্বমূলক ভাব এনে দিয়েছিল। কিন্তু চার্লস বদলেয়ারের লে ফ্লিইয়ার্স দু মাল (১৮৫৭)-এ অনুসন্ধান করা বিচ্ছিন্নতা, বিষাদ ও নির্লিপ্ততা, আলফ্রেড টেনিসনের ইন মেমোয়িামে-র (১৮৫০) তুলে ধরা সন্দেহ ও ফ্লবেয়ারের মাদাম বোভারি (১৮৫৬) উপন্যাসের কেন্দ্রিয় চরিত্রের বিধ্বংসী নিস্পৃহতা ও অসেন্তাষের মতোই ছিল এর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। সাধারণ মানুষকে অস্পষ্টভাবে ভীত করে তুলছিল। এখন থেকে একই সময়ে আধুনিক সমাজের সাফল্য উদযাপন করার পাশাপাশি নারী-পুরুষ এক ধরনের শূন্যতা, এক ধরনের অস্তিত্বহীনতার বোধে আক্রান্ত হয়, এর ফলে জীবন হয়ে পড়ে অর্থহীন; আধুনিকতার বিভ্রান্তির ভেতর অনেকেই নিশ্চয়তার জন্যে আকুতি বোধ করেছে; কেউ কেউ কাল্পনিক প্রতিপক্ষ ও সর্বজনীন ষড়ড়ন্ত্রের স্বপ্নের ভেতর দিয়ে তাদের এইসব ভীতিকে প্রকাশ করেছে।
আধুনিক সংস্কৃতির পাশাপাশি গড়ে ওঠা তিনটি একেশ্বরবাদী ধর্মের সব কটিতে আমরা মৌলবাদী আন্দোলনে এই সমস্ত উপাদানই আবিষ্কার করব। বিপরীত দিকে হতাশাজনক প্রমাণ লক্ষ করার পরেও মানবজাতি জীবনের একটা পরম মূল্য ও অর্থ আছে, এমন একটা ধারণা ছাড়া বেঁচে থাকা অসম্ভব বলে আবিষ্কার করে। প্রাচীন বিশ্বে মিথলজি ও আচার জনগণকে ঠিক মহান শিল্পকর্মগুলোর মতোই শূন্যতা থেকে রক্ষাকারী এক ধরনের পবিত্র তাৎপর্যের অনুভূতি সৃষ্টি করতে সাহায্য করেছে। কিন্তু পাশ্চাত্য ক্ষমতা ও সাফল্যের উৎস বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদ মিথকে বাতিল করে কেবল যুক্তিই সত্যের দিকে নিয়ে যেতে পারে বলে ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু তারপরেও যুক্তি পরম প্রশ্নগুলোর কোনও উত্তর দিতে পারেনি; কখনওই তা লোগেসের এখতিয়ারের ছিল না। ফলে ক্রমবর্ধমান সংখ্যক পাশ্চাত্য নারী-পুরুষের পক্ষে প্রচলিত ধর্মবিশ্বাস পালন করা আর সম্ভব ছিল না।
অস্ট্রিয় মনস্তাত্ত্বিক সিগমান্ড ফ্রয়েড (১৮৫৬-১৯৩৯) আবিষ্কার করবেন যে মানব সন্তানরা জোরালভাবে মৃত্যু-আকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি কামনা ও প্রজননের ইচ্ছাতেও তাড়িত হয়। এমবর্ধমান হারে আধুনিক সংস্কৃতিতে নিশ্চিহ্নতার এক ধরনের আকাঙ্ক্ষা (আর এর ভীতি) জেগে উঠবে। সাধারণ মানুষ নিজেদের তৈরি আধুনিকতা থেকেই মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করার পাশাপাশি একই সময়ে এর সন্দেহাতীত সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে চলবে। আধুনিক বিজ্ঞানের কল্যাণেই পশ্চিমের বেশির ভাগ মানুষ স্বাস্থ্যবান হয়ে উঠেছিল, পেয়েছিল দীর্ঘ আয়ু; অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের অর্থ ছিল জীবন অধিকতর ন্যায়সঙ্গত। আমেরিকান ও ইউরোপিয়রা তাদের সাফল্য নিয়ে সঠিকভাবেই গর্বিত ছিল। কিন্তু আলোকনের চিন্তকদের টিকিয়ে রাখা সর্বজনীন ভ্রাতৃত্ববোধের স্বপ্ন অলীক কল্পনা বলে প্রমাণিত হতে চলেছিল। ফ্রাংকো-প্রুশিয়ান যুদ্ধ (১৯৭০-৭১) আধুনিক মারণাস্ত্রের ভয়ঙ্কর প্রভাব তুলে ধরেছিল এবং এক ধরনের উপলব্ধির বিস্তার ঘটছিল যে বিজ্ঞানের হয়তো ক্ষতিকর মাত্রাও থাকতে পারে। এক ধরনের অ্যান্টিক্লাইমেক্সের বোধ জেগে উঠেছিল। উনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে বিপ্লবী বছরগুলোয় এক নতুন ও উন্নত বিশ্ব যেন মানবজাতির হাতে ধরা দিয়েছে বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু এই আশা কোনওদিনই পূরণ হয়নি। তার বদলে শিল্প বিপ্লব নতুন নতুন সব সমস্যা হাজির করেছে, এনেছে নতুন অবিচার ও শোষণ। হার্ড টাইমস (১৮৫৪)-এ চার্লস ডিকেন্স শিল্প নগরীকে নরক হিসাবে তুলে ধরে আধুনিক বাস্তববাদী যুক্তিবাদ নৈতিকতা ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের পক্ষে বিধ্বংসী প্রমাণিত হতে পারে বলে দেখিয়েছেন। নতুন মেগাসিটিগুলো বিপুল দ্ব্যর্থবোধকতার অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। ‘অন্ধকার অশুভ কলকারখানাকে’ প্রত্যাখ্যানকারী রোমান্টিক কবিরা শহুরে জীবন থেকে পালিয়ে গেছেন, আবার সমানভাবে তাঁরা অক্ষত পল্লী এলাকার জন্যে ইতিবাচক আকঙ্ক্ষায় অনুপ্রাণিত হয়েছেন। ব্রিটিশ সমালোচক জর্জ স্টেইনার ১৮৩০-র দশকে বিকাশ লাভ করা চিত্রকলা এক অদ্ভুত ধরনের কৌশলের উল্লেখ করেছেন, যাকে ‘আধুনিকতার প্রতি-স্বপ্ন’ হিসেবে দেখা যেতে পারে। মহান পাশ্চাত্য সাফল্যকে প্রতীকায়িত করে তোলা আধুনিক শহরগুলোকে-লন্ডন, প্যারিস ও বার্লিন-অকল্পনীয় কোনও বিপর্যয়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।৺ লোকজন সভ্যতার বিনাশ নিয়ে জল্পনা কল্পনা শুরু করেছিল; সেই সাথে তার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বাস্তব পদক্ষেপও নিতে চেয়েছে।
