ঠিক শাব্বেতাই যেভাবে সমাজের সকল শ্রেণীর কাছে আবেদন সৃষ্টি করেছিলেন, বাবও নিজের মেসিয়ানিজমের মাধ্যমে দার্শনিক বা মরমীবাদীভাবে তাঁর অতীন্দ্রিয় ধর্মতত্ত্বের প্রতি ঝুঁকে থাকা আম-জনতা ও সামাজিক মতবাদের সাহায্যে অধিকতর সেক্যুলার মানসিকতার অধিকারীদের আকৃষ্ট করতে পেরেছিলেন। পূর্ববর্তী ইহুদি আন্দোলনের মতো এক ধরনের স্বজ্ঞামূলক বোধ কাজ করছিল যে, প্রাচীন বিশ্ব বিদায় নিতে চলেছে, প্রথাগত পবিত্রতা আর প্রয়োগযোগ্য হবে না। ১৮৪৮ সালের জুলাই মাসে বাবি নেতারা খুরাশানের বুদাশতে এক জনসভার আয়োজন করেন। আনুষ্ঠানিকভাবে কোরান রদ ঘোষিত হয়, বাব বিশ্ব কর্তৃক স্বীকৃত লাভ না করা পর্যন্ত সাময়িকভাবে শরীয়া কার্যকর থাকার ঘোষণা দেওয়া হয়। আপাতত বিশ্বাসীদেরকে অবশ্যই নিজেদের বিবেকের নির্দেশনা মোতাবেক চলতে হবে, নিজেদেরই শুভ ও অশুভের পার্থক্য চিনতে হবে, উলেমাদের উপর নির্ভর করা চলবে না। ইচ্ছা করলে তারা শরীয়ার যে কোনও বিধি-বিধান প্রত্যাখ্যান করতে পারবে। ক্যারিশম্যাটিক নারী যাজক কুররাত আল- আইন নারীদের অধীন করে রাখার অবসান ও প্রাচীন মুসলিম যুগের অবসান ঘটার প্রতীক হিসাবে পর্দা সরিয়ে ফেলেন। এখন থেকে সমস্ত ‘অপবিত্র’ বস্তুকে ‘পবিত্র’ জ্ঞান করতে হবে। সত্য কেবল একবারের জন্যে প্রত্যাদিষ্ট কোনও বিষয় নয়, সময়ের কোনও বিশেষ মুহূর্তে ঈশ্বরের বিধানগুলো নির্বাচিত ব্যক্তির মারফত ধীরে ধীরে মানুষের কাছে প্রকাশিত হয়। স্বয়ং শাব্বেতাইয়ের মতো বাবিরা এক নতুন ধর্মীয় বহুত্ববাদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল: নতুন ব্যবস্থায় অতীতে প্রত্যাদিষ্ট সকল ধর্ম একক ধর্মে মিলে যাবে।৬৬
বুদাশতে অংশগ্রহণকারী বহু বাবি এমনি রেডিক্যাল ঘোষণায় রীতিমতো ভীত হয়ে উঠেছিল, সত্রাসে তারা পালিয়েছে। অন্য ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা ধর্মদ্রোহীদের উপর আক্রমণ চালায়, তুমুল হট্টগোলের ভেতর শেষ হয়ে যায় সভা। কিন্তু নেতাদের কাজ শুরু হয়েছিল কেবল। তাঁরা বিচ্ছিন্নভাবে মাযানদেরানে ফিরে আসেন, এখানে বাবি নেতা মোল্লাহ হুসেইন বাশরুই (মৃ. ১৮৪৯) দুইশো লোকের সমাবেশ ঘটিয়ে জ্বালাময়ী ভাষণ দেন: বাবিদের অবশ্যই তাদের পার্থিব সম্পদ বিসর্জন দিয়ে ইমাম হুসেইনকে আদর্শ হিসাবে গ্রহণ করতে হবে। কেবল শাহাদাৎ বরণের ভেতর দিয়েই তারা নতুন দিনের উদ্বোধন ঘটাতে পারবে, তখন বাব হতদরিদ্রদের উর্ধ্বে তুলে ধরতে পারবেন, গরীবদের ধনীতে পরিণত করবেন। এক বছরের মধ্যেই বিশ্ব জয় করবেন বাব, সকল ধর্মকে ঐকবদ্ধ করবেন। নিজেকে অসাধারণ অধিনায়ক প্রমাণ করেছিলেন বাশরুই। তাঁর ক্ষুদে বাহিনী রাজকীয় সেনাদলের বিরুদ্ধে এমনভাবে যুদ্ধ করেছিল যে, দরবারের বিবরণে যেমনটা পড়ি আমরা, ‘নেকড়ের কবল থেকে পালিয়ে যাওয়া ভেঁড়ার মতো’ দৌড়ে বেঁচেছে তারা। বাবিরা আক্রমণ করেছে, লুটতরাজে মেতেছে, হত্যা ও অগ্নিসংযোগ করেছে। ধর্মীয় ঝোঁকবিশিষ্টরা তাদের এই বিপ্লবকে কারবালার চেয়েও ঢের বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভেবেছে, অন্যদিকে সম্ভবত অপেক্ষাকৃত বেশি জাগতিক কারণে আন্দোলনে যোগাদানকারী দরিদ্ররা ছিল সবার সেরা নিবেদিত গোষ্ঠী। প্রথমবারের মতো তাদের হিসাবে ধরা হয়েছে ভেবেছে তারা, তাদের সাথে এমন আচরণ করা হয়েছে যেন তারা সমান, সহকর্মীর মূল্য দেওয়া হয়েছে।
শেষ পর্যন্ত সরকার এই বিদ্রোহকে দমন করে, কিন্তু ১৮৫০ সাল ইয়াযদ, নাইরিয, তেহরান ও যানজানে নতুন উত্থান প্রত্যক্ষ করে। বাবিরা চরম সন্ত্রাসের পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল। রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীরা এই বিদ্রোহে যোগ দিয়েছিল, ছিল স্থানীয় ছাত্ররাও। এমনকি পুরুষের পোশাক পরা মেয়েরা বীরের মতো লড়েছে। শাসকদের প্রতি অসন্তুষ্ট সবাইকে এক করেছিল এই আন্দোলন। মুজতাহিদদের কাছে নিপীড়িত বোধকারী মোল্লাহ, বিদেশীদের কাছে ইরানি সম্পদ বিক্রি করার কারণে অসন্তুষ্ট বণিক, বাজারি, ভূস্বামী ও দরিদ্র কৃষক—সবাই বাবি ধর্মীয় উৎসাহীদের সাথে যোগ দিয়েছিল। শিয়া ধর্মমত দীর্ঘদিন ধরে ইরানিদের সামাজিক ন্যায়বিচারের জন্যে আকাঙ্ক্ষা লালন করতে শিখিয়েছে, যখনই সঠিক নেতা ও সঠিক দর্শনের আবির্ভাব হয়েছে, সকল ধরনের অসন্তুষ্টরা ধর্মীয় ব্যানারের অধীনে লড়াই করাকেই স্বাভাবিক ধরে নিয়েছে।৬৭
এই যাত্রা সরকার বিদ্রোহীদের দমন করতে সক্ষম হয়। ৯ই জুলাই, ১৮৫০ তারিখে বাবকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, নেতাদেরও হত্যা করা হয়, এবং অন্যান্য সন্দেহভাজনদের আটক করে শেষ করে দেওয়া হয়। কিছু সংখ্যক বাবি অটোমান ইরাকে পালিয়ে যায়। সেখানে ১৮৬৩ সালে আন্দোলনে ভাঙন ধরে। কেউ কেউ বাবের মনোনীত উত্তরাধিকারী মির্যা ইয়াহিয়া নুরি সুবহ-ই-আযালকে (১৮৩০- ১৯১২) অনুসরণ করে বিদ্রোহের রাজনৈতিক লক্ষ্যের প্রতি বিশ্বস্ত থেকে যায়। পরে ‘আযালিদের’ অনেকেই পুরোনো বাবি অতীন্দ্রিয়বাদ ত্যাগ করে সেক্যুলারিস্ট ও জাতীয়তাবাদীতে পরিণত হয়। শাব্বেতিয় আন্দোলনের মতো টাবু প্রত্যাখ্যান, প্রাচীন আইন-কানুন বাতিল করা ও বিদ্রোহের স্বাদ তাদের খোদ ধর্ম থেকেই বের হয়ে আসতে সক্ষম করে তুলেছিল। আরও একবার মেসিয়ানিক আন্দোলন সেক্যুলারিস্ট আদর্শের সাথে সেতুবন্ধের ব্যবস্থা করেছে। বেশির ভাগ বেঁচে যাওয়া বাবি অবশ্য সুবহ-ই-আযালের ভাই মির্যা হুসেইন আলি নুরি বাহাউল্লাহকে (১৮১৭–৯২) অনুসরণ করেছে। রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করে নতুন বাহাই ধর্মের সৃষ্টি করেছিলেন তিনি, যা ধর্ম ও রাজনীতির বিচ্ছিন্নতা, সমঅধিকার, বহুত্ববাদ ও সহিষ্ণুতার আধুনিক আদর্শকে আলিঙ্গন করেছিল।৬৮
