তবে জ্ঞান সম্পর্কে অভিজাত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে শায়খি আন্দোলন প্রাচীন বিশ্বে প্রোথিত ছিল। শিল্পোন্নত পশ্চিমের প্রভাব অনুভব করে আত্মরক্ষামূলকও ছিল। করিম খান সংস্কারবাদী মন্ত্রী আমির কবির প্রতিষ্ঠিত তেহরানের প্রথম ফ্রি হাই স্কুল নতুন দার আল-ফানুনু-এর প্রবল বিরোধী ছিলেন। মূলত ইউরোপিয় কর্মকর্তাদের দিয়ে পরিচালিত স্কুলটিতে দোভাষীদের সহায়তায় প্রাকৃতিক বিজ্ঞান, উচ্চতর গণিত, বিদেশী ভাষা,ও আধুনিকযুদ্ধ কৌশল শিক্ষা দেওয়া হত। এই স্কুলকে ইউরোপিয় প্রভাব বৃদ্ধি ও ইসলাম ধ্বংসের ষড়যন্ত্রের অংশ ভেবেছেন করিম খান। অচিরেই উলেমাদের স্তব্ধ করে দেওয়া হবে, যুক্তি দেখিয়েছেন তিনি, মুসলিম সন্তানদের ক্রিশ্চান স্কুলে পড়াশোনা করানো হবে, ফলে ইরানিরা পরিণত হবে মেকি ইউরোপিয়তে। সামনে অপেক্ষমান বিচ্ছিন্নতা ও উন্মুলতার বিপদ টের পেয়েছিলেন তিনি। ক্রমবর্ধমান ইউরোপিয় দখলদারির মুখে তাঁর অবস্থান ছিল প্রত্যাখ্যানবাদী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী। তাঁর অতীন্দ্রিয় আদর্শকে সম্পূর্ণ নতুন সমাধানের প্রতি ইরানিদের চোখ খুলে দেওয়ার প্রয়াস হিসাবে দেখা যেতে পারে, কিন্তু ভালো বা খারাপ যাই হোক, ইরানে পাশ্চাত্য উপস্থিতি ছিল জীবনেরই অংশ, একে জায়গা করে দিতে ব্যর্থ কোনও সংস্কার আন্দোলনের পক্ষেই সফল হওয়া সম্ভব ছিল না। গুঞ্জন ছিল যে করিম খান নিজস্ব ধর্মীয় সরকার প্রতিষ্ঠা করতে যাচ্ছেন; তাঁকে দরবারে তলব করা হয় ও আঠার মাস নজরদারীতে রাখা হয়। ১৯৫০ ও ১৮৬০-র দশকে তিনি আস্তে আস্তে প্রকাশ্য জীবন থেকে অবসর গ্রহণ করেন, নিজের মতামত একান্তেই রাখতেন, এবং পরাস্ত, তিক্ত মনে নিজের জমিদারিতেই মারা যান ৬২
এই সময়ের দ্বিতীয় মেসিয়ানিক আন্দোলনটিও রক্ষণশীল চেতানায় প্রোথিত ছিল, তবে কিছু পাশ্চাত্য মূল্যবোধের বেলায় তা ছিল উন্মুক্ত। এর প্রতিষ্ঠাতা সায়ীদ আলি মুহাম্মদ (১৮১৯-৫০) নাজাফ ও কারাবালায় শায়খি আন্দোলনে জড়িত ছিলেন, কিন্তু ১৮৪৪ সালে নিজেকে গোপন ইমামের অকাল্টেশনে থাকার সময় উলেমাদের বন্ধ ঘোষণা করা ঐশী ‘দ্বার’ (বাব) ঘোষণা করে বসেন।৬৩ ইস্ফাহানের উলেমা, গণ্যমান্য ব্যক্তি ও ধনাঢ্য ব্যবসায়ীদের নিজের আন্দোলনে আকৃষ্ট করেন তিনি। কারবালায় তাঁর মেধাবী নারী শিষ্যা কুররাত আল-আইন (১৮১৪-৫২) বিশাল জনতাকে আকৃষ্ট করেছিলেন; তাঁর প্রধান পুরুষ শিষ্য মোল্লা সাদিক (মুকাদ্দাস নামে পরিচিত) ও কুদ্দুস উপাধী প্রাপ্ত মির্যা মুহাম্মদ আলি বারফুরুশি (মৃ. ১৮৪৯) বলা চলে এক নতুন ধর্মের প্রচার করেছিলেন: বাব-এর নাম সব প্রার্থনায় উল্লেখ করা হচ্ছিল, উপাসকদের শিরাযে তাঁর আবাসের দিকে মুখ করে প্রার্থনা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। সে বছর বাব মক্কায় হাজ্জ পালন করতে গেলে কাবাহর পাশে দাঁড়িয়ে নিজেকে গোপন ইমামের অবতার ঘোষণা করেন তিনি। পনের মাস পরে জোসেফ স্মিথের মতো এক নতুন অনুপ্রাণিত ঐশীগ্রন্থ বায়ান হাজির করেন। প্রাচীন সমস্ত পবিত্র কিতাব রদ হয়ে গেছে। তিনিই যুগের সম্পূর্ণ পুরুষ, অতীতের সমস্ত মহান পয়গম্বরকে নিজের মাঝে ধারণ করছেন। মানবজাতি এখন সম্পূর্ণতার দিকে এগিয়ে চলেছে, প্রাচীন বিশ্বাসসমূহ আর কাজে আসবে না। বুক অভ মরমনের মতো বায়ান এক নতুন ও অধিকতর ন্যায়বিচার ভিত্তিক সামাজিক ব্যবস্থার আহ্বান জানিয়েছে, আধুনিকতার বুর্জোয়া মূল্যবোধের পক্ষে অনুমোদন দান করেছে: উৎপাদনশীল কাজের প্রতি জোরাল মূল্য আরোপ করেছে, মুক্ত বাণিজ্যের আহ্বান জানিয়েছে, কর হার হ্রাসের আহ্বান করেছে, ব্যক্তিগত সম্পত্তির নিশ্চয়তা চেয়েছে ও নারীর অবস্থার উন্নয়নের কথা বলেছে। সবার উপরে বাব উনবিংশ শতাব্দীর বিশ্বাস-এটাই আমাদের একমাত্র জগৎ—এই ধারণাকে মূর্ত করেছেন। শিয়ারা সাধারণত অতীতের ট্র্যাজিডি ও মেসিয়ানিক ভবিষ্যতের প্রতি জোর দিয়ে থাকে। বাব বর্তমানের উপর জোর দিয়েছেন। শেষবিচার বলে কিছু নেই, পরকাল নেই। এই জগতেই স্বর্গ খুঁজে পাওয়া যাবে। নিষ্ক্রিয়ভাবে নিস্তারের জন্যে অপেক্ষা করার বদলে বাব ইরানের শিয়াদের বলেছেন পৃথিবীর বুকে উন্নত সমাজ সৃষ্টির জন্যে তাদের অবশ্যই কঠোর পরিশ্রম করতে হবে এবং নিজেদের জীবনকালেই মুক্তি অর্জন করতে হবে। ৬৪
বাবি আন্দোলনের অনেকগুলো বিষয় আমাদের শাব্বেতেই যেভির কথা মনে করিয়ে দেয়। শাব্বেতাইয়ের মতোই এক ধরনের মুগ্ধতা সৃষ্টি করেছিলেন বাব। কর্তৃপক্ষ তাঁকে আটক করার পর এক জায়গা থেকে আরেক গন্তব্যে তাঁর বদলি বিজয় মিছিলে পরিণত হয়েছিল, বিপুল সংখ্যক মানুষ তাঁর সাথে মিলিত হতে রাস্তায় নেমে আসত। তাঁর কারাগার পরিণত হয়েছিল তীর্থস্থানে। জেলে বসে কাজার ‘ক্ষমতা দখলকারী’ মুহাম্মদ শাহর কাছে বীরত্বব্যঞ্জক চিঠি লেখার সময় শিষ্যদের বিশাল সমাবেশকে অভ্যর্থনা জানাতে দেওয়া হয়েছিল তাঁকে। এমনকি কর্তৃপক্ষ তাঁকে উরুমিয়ার বাইরে চিহরিগের প্রত্যন্ত দুর্গে স্থানান্তরের পরেও তাঁর সকল অতিথির স্থান সঙ্কুলান সম্ভব হয়নি। জনতার ভীড় রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য হত। তিনি গণস্নানাগারে গেলে ভক্তরা তাঁর গোসলের পানি নিয়ে আসত। ১৮৪৮ সালের গ্রীষ্মে অবশেষে তাঁকে তাব্রিযে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানো হলে দারুণ উত্তেজনা দেখা দিয়েছিল। তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে বিপুল সংখ্যক জনতা ভীড় জমিয়েছিল। বিজয়ীর বেশে আদালতে পা রাখেন তিনি। বিচারের সময় আদালতের বাইরে দাঁড়িয়েছিল বিশাল জনতা, তাদের আশা ছিল শত্রুপক্ষকে ধ্বংস করে বিচার, উৎপাদনশীলতা ও শান্তির নতুন যুগের আবির্ভাব ঘটাবেন বাব। কিন্তু ঠিক শাব্বেতাইয়ের মতোই আবির্ভূত হয়েছিল এক অ্যান্টিক্লাইমেক্সের। জেরাকারীদের জয় করতে পারেননি বাব। আসলে যেন নাজেহাল হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। জেরাকারীরা আরবী, ধর্মতত্ত্ব ও ফালসাফায় তাঁর দুর্বলতা প্রকাশ করে দেন, নতুন বিজ্ঞান সম্পর্কে তাঁর কোনও ধারণাই ছিল না। কেমন করে এই লোকটি ইমাম হতে পারেন, স্বর্গীয় জ্ঞানের (ইলম) আধার হতে পারেন? আদালত বাবকে ফের কারাগারে পাঠান, শাসকদের প্রতি তাঁর হুমকি ঠিকমতো উপলব্ধি করতে পারেননি তাঁরা। কারণ এই সময়ের ভেতর বাবি আন্দোলন কেবল নৈতিক ও ধর্মীয় সংস্কারের সামান্য আহ্বানে সীমাবদ্ধ ছিল না; এক নতুন সামাজিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার দাবিতে পরিণত হয়েছিল।
