এই জনপ্রিয় বিশ্বাস স্পষ্টতই মুজতাহিদদের আইনি, যৌক্তিক শিয়া মতবাদ থেকে খুবই ভিন্ন ছিল। এর অবশ্যই এক বিপ্লবী সম্ভাবনা ছিল। এটা সমাজে অশুভের উপস্থিতি ও বর্তমান এবং ইয়াযিদের ভেতর একটা মিলের দিকে সহজেই ইঙ্গিত করতে পারত-করবেও। কাজারদের আমলে, সাফাভিয়দের অধীনে থাকার মতো অবশ্য এই বিদ্রোহী মোটিফকে প্রতিহত করা হয় এবং হুসেইনের ভোগান্তির প্রতিই এখনও গুরুত্ব দেওয়া হয়ে থাকে, সাধারণ মানুষের পাপের বিকল্প উৎসর্গ হিসাবে দেখা হত একে। উনবিংশ শতাব্দীতে সাধারণ মানুষ তাজিয়াহর মাধ্যমে বিদ্রোহ করেনি; বরং অনেকেই দুটি জনপ্রিয় মেসিয়ানিক আন্দোলনের ভেতর দিয়ে তাদের অসন্তোষ প্রকাশ করেছিল।
এগুলোর প্রথমটির নেতৃত্বে ছিলেন এক কাজার যুবরাজ ও ফাতহ আলি শাহর চাচাত ভাই ও পালক পুত্র হাজ্জ মুহাম্মদ করিম খান কিরমানি (১৮১০–৭১); উত্তাল প্রদেশ কিরমানের গভর্নর ছিলেন তাঁর বাবা। এখানে করিম খান কারবালার শায়খ আহমাদ আল-আশাই (১৭৫৩-১৮২৬) প্রতিষ্ঠিত এক রেডিক্যাল অতীন্দ্রিয় আন্দোলন শায়খি গোত্রের সাথে জড়িয়ে পড়েন। মোল্লা সদ্রার অতীন্দ্রিয়বাদ ও ইস্ফাহানের মতবাদে গভীরভাবে প্রভাবিত ছিলেন তিনি, উসুলি মোল্লাহরা যাকে দমন করতে চেয়েছিলেন। আশাই ও তাঁর শিষ্য সাঈদ কাযিম রাশতি (১৭৫৯-১৮৪৩) শিক্ষা দিয়েছেন যে, পয়গম্বর ও ইমামগণ নিখুঁতভাবে ঐশী ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটিয়ে গেছেন; তাঁদের জীবন ও উদাহরণ ক্রমশঃ গোটা মানবজাতিকে এক. সম্পূর্ণতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। গোপন ইমাম এই জগতে আত্মগোপন করে নেই; তিনি খাঁটি আদর্শ জগতে (আলম আল-মিথাল) মিশে গেছেন; সেখান থেকে তিনি অতীন্দ্রিয় জগতে প্রবেশ করার কৌশল জানেন এমন একজন পার্থিব প্রতিনিধির মাধ্যমে মানবজাতিকে পথ নির্দেশ দিয়ে এমন এক জায়গার দিকে পরিচালিত করছেন যেখানে তাদের আর শরীয়ার বিধান প্রয়োজন হবে না; তারা ঈশ্বরের ইচ্ছাকে আত্মস্থ করবে ও সরাসরি তাঁকে উপলব্ধি করতে পারবে; কতগুলো বাহ্যিক আইনের বিন্যাস আর অনুসরণ করতে হবে না। এটা অবশ্যই মুজতাহিদদের পক্ষে ঘৃণিত ব্যাপার ছিল। আশাই শিক্ষা দিয়েছেন যে, পৃথিবীতে একটি ‘সম্পূর্ণ শিয়া’ মতবাদের অনুসারী দল সব সময়ই ছিলেন, ভ্রান্তিহীন বিরল একটি গোষ্ঠী যারা ধ্যানের স্বজ্ঞামূলক অনুশীলনের মাধ্যমে গোপন ইমামের সাথে যোগাযোগ করার ক্ষমতা রাখেন। এর নিগূঢ়ার্থ ছিল এই যে, মুজতাহিদদের বিশ্বাস অসম্পূর্ণ, আইনি ও আক্ষরিক ছিল। নিশ্চিতভাবেই আশাই ও তাঁর শিষ্যদের অতীন্দ্রিয় অন্তর্দৃষ্টির তুলনায় হীন ছিল এটা।৬১
শায়খি মতবাদ, এনামেই ডাকা হত একে, ইরাক ও আযেরবাইযানে খুবই জনপ্রিয় ছিল, কিন্তু পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক কর্মসূচির বদলে বরং তা দর্শন বা ধারণাই রয়ে যায়। রাশতির পরলোকগমনের পর শায়খি নেতায় পরিণত করিম খানই একে মুজতাহিদদের বিরুদ্ধে বিপ্লবে পরিণত করেন। প্রকাশ্যে তাদের সংকীর্ণ আইনি মতবাদ, কল্পনাশক্তি রহিত অক্ষরবাদ ও নতুন ধারণার প্রতি আগ্রহের ঘাটতি প্রত্যাখ্যান করেন তিনি। মুসলিমদের অবশ্যই এটা ভাবলে চলবে না যে, তাকলিদই-জুরিস্টদের অনুকরণ-তাদের একমাত্র দায়িত্ব। যেকেউই ঐশীগ্রন্থ ব্যাখ্যা করার যোগ্যতা রাখে। মুজতাহিদরা স্রেফ প্রাচীন সত্য নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করছেন। কিন্তু দুনিয়ার দরকার সম্পূর্ণ নতুন কিছু। মানবজাতি অব্যাহতভাবে বদলে যাচ্ছে, বিবর্তিত হচ্ছে। তাই প্রত্যেক পয়গম্বর তাঁর পূর্ববর্তীকে অতিক্রম করে গেছেন। প্রত্যেক প্রজন্মে ‘সম্পূর্ণ শিয়া মতবাদ’ কোরানের আরও বেশি নিগূঢ় তথ্য উন্মোচন করে আসছে, এক চলমান প্রত্যাদেশের মাধ্যমে গোপন গভীরতা তুলে আনছে। বিশ্বাসীকে অবশ্যই ইমাম কর্তৃক নিয়োজিত, যাঁদের কর্তৃত্ব মুজতাহিদরা দখল করে নিয়েছেন, এইসব অতীন্দ্রিয় গুরুর কথা শুনতে হবে।
করিম খান বিশ্বাস করেছিলেন যে, চলমান এই প্রত্যাদেশ সম্পূর্ণতা লাভ করতে যাচ্ছে। অচিরেই মানব প্রকৃতি সম্পূর্ণতা অর্জন করবে। তিনি ইউরোপিয়দের ইরানে নিয়ে আসা পরিবর্তনের প্রতি সাড়া দিচ্ছিলেন। করিম খান গণতন্ত্রী ছিলেন না; প্রাক আধুনিক অন্যান্য দার্শনিকের মতোই তিনি ছিলেন অভিজাত গোষ্ঠীর ও চরমবাদী; মুজতাহিদদের সাথে মতানৈক্যের কারণে অধৈর্য হয়ে জনগণের উপর নিজস্ব মতবাদ চাপিয়ে দিতে চেয়েছিলেন তিনি। তাসত্ত্বেও তিনি ছিলেন প্রথম সারির ইরানি যাজক যাঁরা ইউরোপের নতুন ধারণার সাথে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। অর্থডক্স উলেমারা যেখানে কেবল বিট্রিশ ও রাশিয়ার বাণিজ্যিক দখলদারির বিরোধিতা করে গেছেন, করিম খান পাশ্চাত্যের নতুন বিজ্ঞান ও সেক্যুলারিজমের ব্যাপারে আরও বেশি করে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠার মতো যথেষ্ট দূরদৃষ্টি সম্পন্ন ছিলেন। অবসর সময়ে জ্যোতির্বিজ্ঞান, অপটিক্স, রসায়ন ও ভাষাতত্ত্ব নিয়ে পড়াশোনা করতেন তিনি, বিজ্ঞান সম্পর্কে নিজের বিদ্যা নিয়ে গর্ব ছিল তাঁর। ১৮৫০ ও ১৮৬০-র দশকে ইরানের খুবই অল্প সংখ্যক লোকের যেখানে ইউরোপ সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ছিল, করিম খান সেখানে আগেই বুঝতে পেরেছিলেন যে, পাশ্চাত্য সংস্কৃতি ইরানি সভ্যতার পক্ষে বিরাট হুমকি হয়ে দেখা দিতে চলেছে। এটা ছিল পরিবর্তনের সময়, তিনি বুঝতে পারছিলেন, এই নজীরবিহীন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্যে নতুন সমাধান খুঁজে বের করতেই হবে। এই কারণেই নতুন কিছুর সম্ভাবনা সৃষ্টি করা তাঁর বিপ্লবী তত্ত্ব, এবং আসন্ন রেডিক্যাল পরিবর্তনের ব্যাপারে তাঁর স্বজ্ঞামূলক প্ৰত্যাশা।
