উলেমারা সমর্থন দেন তাদের। মিশরের উলেমাদের চেয়ে ঢের শক্ত অবস্থানে ছিলেন তাঁরা। অষ্টাদশ শতকের শেষের দিকে উসুলি বিজয় মুজতাহিদদের হাতে এক শক্তিশালী অস্ত্র তুলে দিয়েছিল; কারণ নীতিগতভাবে এমনকি শাহও তাঁদের ফতোয়া মানতে বাধ্য ছিলেন। কাজারদের হাতে তাঁরা প্রান্তিকায়িত বা কোণঠাসা হয়ে পড়েননি। তাঁদের সমর্থন প্রয়োজন ছিল কাজারদের। উলেমাদের নিশ্চিত আর্থিক ভিত্তি ছিল, কাজারদের নাগালের বাইরে অটোমান ইরাকের নাজাফ ও কারবালার পবিত্র শহরে ছিল তাদের মূল কেন্দ্র। ইরানে রাজকীয় রাজধানী তেহরান শিয়া শহর কুমের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। এখানে এভাবে ধর্ম ও রাজনীতির এক ধরনের কার্যকর বিচ্ছিন্নতা ছিল। মুহাম্মদ আলির বিপরীতে কাজার শাহগণের কোনও আধুনিক সেনাদল ছিল না, ছিল না শিক্ষা, আইন, ও ধর্মীয়ভাবে দান করা সম্পত্তির (ওয়াকফ্) প্রশাসনে উলেমাদের উপর তাদের ইচ্ছা চাপিয়ে দেওয়ার মতো কোনও কেন্দ্রিয় আমলাতন্ত্র। এগুলো ছিল উলেমাদের হাতে। উনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকের বছরগুলোয় অবশ্য, শিয়া ঐতিহ্যের প্রতি বিশ্বস্ত যাজকগোষ্ঠী রাজনীতি থেকে দূরে সরে ছিল। শেখ মুর্তাদা আনসারি কার্যত একমাত্র ও প্রধান ‘অনুকরণের আদর্শ’ (মার্জা-ই-তাকলিদ), গোপন ইমামের সহঅধিনায়ক, হিসাবে প্রথম মুজতাহিদে স্বীকৃতি লাভের যোগ্যতা অর্জন করার সময় আরও প্রাজ্ঞ প্রার্থীর চেয়ে তাঁকে বেশি যোগ্য মনে করা হয়েছিল, যিনি স্বয়ং স্বীকার করে নিয়েছিলেন যে, তিনি ‘সাধারণ মানুষের কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছেন, ‘ উপাসনালয়ের তীর্থযাত্রী ও বণিকদের ব্যবসায়িক ও ব্যক্তিগত বিষয়াদি নিয়ে আইনি পরামর্শকের দায়িত্ব পালন করছেন। এর নিগূঢ় অর্থ, বিশ্বাসীদের প্রধান বিচারককে পণ্ডিত হতে হবে, কার্মকাণ্ডে জড়িত কেউ নন।৫৭
কিন্তু ইউরোপিয়রা ইরানে আরও ক্ষমতা আয়ত্ত করার সাথে সাথে বণিক ও কুটিরশিল্পের কারিগররা ক্রমবর্ধমানহারে পরামর্শের জন্যে উলেমাদের দ্বারস্থ হতে শুরু করেছিল। যাজকগোষ্ঠী ও বাজারের বণিক ও কারিগরগণ-জনপ্রিয়ভাবে বাজারি নামে পরিচিত-ছিল স্বাভাবিক মিত্র; প্রায়ই তাদের একই পরিবারের অর্ন্তভুক্ত, একই ধর্মীয় আদর্শের অনুসারী হতে দেখা গেছে। উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় ভাগে বিদেশী অনুপ্রবেশের আপত্তিতে উলেমাগণ বণিকদের বুদ্ধিবৃত্তিক সমর্থন যোগান: তাঁরা যুক্তি দেখান, শাহগণ বিধর্মীদের হাতে এভাবে অতিরিক্ত ক্ষমতা তুলে দেওয়া অব্যাহত রাখলে ইরান আর ইসলামি রাষ্ট্র থাকবে না।
শাহগণ গণমানুষের ধর্মের দোহাই পেড়ে, বিশেষ করে হুসেইনের শোকমিছিলে সম্পর্কিত হয়ে এইসব আপত্তির জবাব দেওয়ার প্রয়াস পান। তাঁদের নিজস্ব রাওদা- খান ছিল, রোজ কারবালা ট্র্যাজিডির মহাকাব্য থেকে আবৃত্তি করত তারা; হুসেইনের মৃত্যু দিবস উদযাপন উপলক্ষ্যে বার্ষিক আবেগ নাটক আয়োজনের জন্যে তেহরানে রাজকীয় মঞ্চ তেরি করেছিলেন তাঁরা, রাজ প্রাসাদের রাজকীয় দরবারে পবিত্র মহররম মাসে টানা পাঁচ রাত ধরে চলত এই অনুষ্ঠান। হুসেইন ও ইয়াযিদের যুদ্ধের কাহিনী মঞ্চায়িত হত, ইমাম ও তাঁর ছেলের মৃত্যুকে ফুটিয়ে তোলা হত, এবং কারবালা বিপর্যয়ের বার্ষিকী, আশুরার প্রথম দিন রাতে অনুষ্ঠিত হত এক বিশাল মিছিল, যেখানে শহীদদের প্রতিমা (প্রমাণ আকৃতির উপাসনাগৃহের প্রতিমা ও সন্তানদের সবাইকে নিয়ে সম্পূর্ণ) রাস্তা ধরে বয়ে নিয়ে যাওয়া হত, সাধারণ মানুষ বুক চাপড়ে অনুসরণ করে যেত। গোটা মহররম মাস জুড়ে সমস্ত মসজিদ কালো পর্দায় ঢেকে রাখা হত, পাবলিক স্কয়ারে রাওদা খানের জন্যে খুপরি বানানো হত, যারা জোরে বিলাপের সুরে শোকগীতি গেয়ে চলত। এই সময় পর্যন্ত দেশে বেশ উল্লেখযোগ্য সংখ্যাক রাওদা-খানের জন্ম হয়েছিল প্রাধান্য বিস্তারের জন্যে যারা পরস্পরের সাথে প্রতিযোগিতায় নামত।
কাজারদের অধীনে এই শোকের আচার এক প্রধান প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল। রাজতন্ত্রকে হুসেইন ও কারবালার সাথে সম্পর্কিত করা এবং এভাবে কাজার শাসনকে বৈধতার রূপ দেওয়া ছাড়াও সাধারণ মানুষকে তাদের হতাশা ও অসেন্তাষ প্রকাশ করার একটা সুযোগ তৈরি করে দিয়ে এক ধরনের সেফটি ভালভের যোগান দিত। সাধারণ মানুষ নিষ্ক্রিয় দর্শক হয়ে থাকত না; আবৃত্তি ও অভিনয়ের পুরো সময় জুড়ে নিজেদের উপস্থিতি বুঝিয়ে দিত। এক ফরাসি পর্যটক যেমন উল্লেখ করেছেন, ‘গোটা দর্শকগোষ্ঠী অশ্রু ও গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে সাড়া দেয়।৫৮ যুদ্ধের দৃশ্যগুলোর সময় দর্শকরা কান্নাকাটি করে, বুক চাপড়ায়, গাল বেয়ে অশ্রু ঝরতে থাকে তাদের। অভিনেতারা টেক্সটের মাধ্যমে তাদের ভীতি ও বিষাদ ফুটিয়ে তোলার সময় দর্শকদের দায়িত্ব ছিল-এখনও আছে-শোকের প্রকাশ্য ও সহিংস প্রকাশ যুগিয়ে নাটকের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ সমাপ্ত করা। তারা যুগপৎ প্রতীকীভাবে কারবালার প্রান্তর এবং নিজেদের জগতেও অবস্থান করত, আপন বিষাদ ও যন্ত্রণা নিয়ে কাঁদত। আজও, আমেরিকান পণ্ডিত উইলিয়াম ব্যাখ্যা করেছেন, দর্শকদের তাদের পাপ ও নিজস্ব বিপদের কথা ভেবে কান্নার শিক্ষা দেওয়া হয়, হুসেইনের আরও বড় দুঃখের কথা নিজেদের মনে করিয়ে দেওয়ার শিক্ষা দেওয়া হয়।৫৯ এভাবে কারাবালার কাহিনীর সাথে নিজেদের একাত্ম করে তুলতে পারে তারা, এইসব নাটকীয় আচারের ভেতর দিয়ে বর্তমানে পৌঁছে দিয়ে এভাবে ঐতিহাসিক ট্র্যাজিডিকে এক সময়হীন মিথের চরিত্র দান করতে সক্ষম করে তোলে তাদের। অনুতাপকারীরা হুসেইনকে ত্যাগ করে যাওয়া ও সেকারণে প্রায়শ্চিত্ত করা কুফার জনগণকে তুলে ধরেছে এবং তবে সেইসব মুসলিমের পক্ষেও দাঁড়িয়েছে তারা যারা একটি ন্যায়বিচার ভিত্তিক সমাজ গঠনে ইমামদের সাহায্য করতে ব্যর্থ হয়েছে। শিয়ারা হুসেইনের জন্যে কাঁদে এবং তাঁর উদ্দেশে প্রতীকী অন্তেষ্টিক্রিয়ার আয়োজন করে, কারণ বাস্তব জীবনে তিনি সেই সম্মান পাননি, তাঁর আদর্শ কোনওদিনই বাস্তবায়িত হয়নি। আজও ইরানিরা বলে যে, মুহররমের সময় তারা বন্ধু ও পরিবারের কষ্টের কথাও মনে করে। কিন্তু এইসব ব্যক্তিগত স্মৃতি তাদের অশুভের সমস্যার আবেগময় উপলব্ধির দিকে নিয়ে যায়: কেন ভালো মানুষগুলো কষ্ট পায়, আর দুষ্টরা টিকে থাকে? গুঙিয়ে কপাল চাপড়ে প্রবলভাবে কান্নার সময় অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের মাঝে ন্যায়বিচারের জন্যে আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তোলে, যা কিনা শিয়া ধার্মিকতার মূল।৬° শোকগীতি ও আবেগ ওদের পৃথিবীর বুকে অব্যাহত প্রতিটি অশুভের কথা মনে করিয়ে দিতে সাহায্য করে এবং ভালোর চূড়ান্ত বিজয় সম্পর্কে নিশ্চিত করে।
