ইরান তখনও আধুনিকায়নের পথে পা রাখেনি, যদিও মধ্যপ্রাচ্যে নেপোলিয়নের আবির্ভাব এই দেশেও আধিপত্যবাদের এক যুগের সূচনা ঘটাচ্ছিল। রাশিয়ার সম্রাটের সহায়তায় ব্রিটিশ-ভারতে আক্রমণ চালানোর পরিকল্পনা করেছিলেন নেপোলিয়ন; এতে ইউরোপিয় শক্তিগুলোর কাছে ইরানের অবস্থান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। ১৮০১ সালে ইরানি সমর্থনের বিনিময়ে সামরিক সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি যোগানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে কাজার শাহ ফাতহ আলির (১৭৯৮-১৯৩৪) সাথে চুক্তি সম্পাদন করে ব্রিটেন। ইউরোপের শক্তির খেলায় ইরানও ঘুঁটিতে পরিণত হয়েছিল, নেপোলিয়নের পতনের অনেক পরেও যা অব্যাহত ছিল। ভারতকে রক্ষা করতে পার্সিয়ান গাল্ফ ও ইরানের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছে ব্রিটেন, এদিকে উত্তরে ঘাঁটি গড়ার চেষ্টা করছিল রাশিয়া। এদের কেউই ইরানকে উপনিবেশে পরিণত করতে চায়নি, উভয়ই ইরানি স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখার লক্ষ্যে কাজ করে গেছে, কিন্তু বাস্তবে শাহগণ দুটো শক্তির কোনওটিকেই ঘাঁটানোর সাহস করে উঠতে পারেননি-কোনও একটির সমর্থন ছাড়া। ইউরোপিয়রা নিজেদের ইরানের কাছে প্রগতি ও সভ্যতার পতাকাবাহী হিসাবে তুলে ধরেছে, কিন্তু আসলে ব্রিটেন ও রাশিয়া কেবল সেইসব উন্নয়নকেই সমর্থন দিয়েছে যেগুলো দিয়ে তাদের স্বার্থ রক্ষা হয়েছে; উভয়ই ইরানি জনগণের উপকারে আসার মতো উদ্ভাবনে, যেমন, রেলওয়ে, বাধা দিয়েছে, যদি না আবার তাদের নিজেদের কৌশলগত পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।৫৪
উনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে আযেরবাইজানের গভর্নর জেনারেল যুবরাজ আব্বাস একটি আধুনিক সেনাবাহিনীর প্রয়োজন বুঝতে পেরেছিলেন। প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের জন্যে তরুণদের ইউরোপে পাঠান তিনি। কিন্তু সিংহাসনে আরোহণের আগেই ১৮৩৩ সালে তিনি মারা যান। এরপর কাজার শাহরা কেবল আধুনিকায়নের বিক্ষিপ্ত প্রয়াসই পেয়েছেন। শাহরা ছিলেন দুর্বল, ব্রিটেন ও রাশিয়ার কাছে এতটাই কাবু যে নিজস্ব সেনাবাহিনীর কোনও প্রয়োজনই বোধ করেননি: ইউরোপিয়রা জরুরি প্রয়োজনে সব সময়ই তাদের রক্ষা করবে। মুহাম্মদ আলিকে তাড়া করা জরুরি তাগিদের বোধটুকু ছিল না। তবে ন্যায়ের খাতিরে এও বলা দরকার যে, মিশরের চেয়ে ইরানে আধুনিকতা অর্জন ঢের বেশি কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। বিংশ শতাব্দীর অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ছাড়া বিশাল দূরত্ব ও ইরানের বন্ধুর প্রান্তর এবং সেই সাথে অঞ্চলের যাযাবর গোত্রগুলোর স্বাধীনচেতা শক্তি কেন্দ্রিয়করণকে যারপরনাই কঠিন করে তুলবে। ৫৫
বলা চলে ইরান পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ জিনিসের মালিক ছিল। হীনকর নির্ভরতা ছিল, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ ও উপনিবেশবাদের কোনও সুবিধাই ছিল না। উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমাংশে রাশিয়া ও ব্রিটেন ইরানে ‘ক্যাপিটুলেশন’ প্রতিষ্ঠা করে, এতে অটোমান সুলতানদের সার্বভৌমত্ব খাট হয়েছিল। ক্যাপিটুলেশন ইরানের মাটিতে রাশিয়া ও ইউরোপিয় বণিকদের বিশেষ সুবিধা এনে দিয়েছিল, তাদের দেশের আইন থেকে অব্যহতি দিয়েছে এবং পণ্যের জন্যে ট্যারিফ ছাড় দেওয়া হয়েছে। দারুণ বিরোধিতার মুখে পড়েছিল এটা। এর ফলে ইউরোপিয়দের পক্ষে ইরানি ভূখণ্ডে পা রাখা সম্ভব হয়ে ওঠে, এদের মামলা পরিচালনাকারী কনসুলার আদালতগুলো প্রায়শঃই মারাত্মক অপরাধের ক্ষেত্রেও শিথিল মনোভাব দেখাত এবং অপরাধীরা কার্যত বিনা শাস্তিতে পার পেত। ক্যাপিটুলেশন স্থানীয় শিল্পের পক্ষেও ক্ষতিকর ছিল, কারণ পাশ্চাত্য উৎপাদিত কমদামী পণ্য ইরানি কুটিরশিল্পকে প্রতিস্থাপিত করছিল। পাশ্চাত্যের সাথে বাণিজ্যে কোনও কোনও পণ্য অবশ্য লাভবান হয়েছে: তুলা, আফিম ও কার্পেট রপ্তানি করা হয়েছে ইউরোপে। কিন্তু ইউরোপিয় প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশ থেকে রোগাক্রান্ত রোমশ পোকা আমদানি করার ফলে সিল্ক শিল্প ধ্বংস হয়ে গেছে। ইরানের মুদ্রা গঠনকারী রূপার আন্তর্জাতিক মূল্যে নাটকীয় দর পতন ঘটে; বিভিন্ন শক্তি বিশেষ কর্মকাণ্ডের জন্যে ছাড় দাবি করতে শুরু করায় ১৮৫০-র দশকে ইউরোপিয় অর্থনৈতিক প্রভাব ইরানে প্রবল হয়ে ওঠে। ১৮৫০-র দশকের শেষ দিকে ইংল্যান্ড ও ভারতের যোগাযোগ উন্নত করার লক্ষ্যে ব্রিটিশ সরকার ইরানে টেলিগ্রাফ লাইনের জন্যে কনসেশন লাভ করে। ১৮৪৭ সালে ব্রিটিশ প্রজা ব্যারন জুলিয়াস দে রয়টার (১৮১৬-৯৯) ইরানে রেলওয়ে ও স্ট্রিটকার নির্মাণ, সব ধরনের খনিজ অনুসন্ধান, সব নতুন সেঁচ কর্ম, একটি জাতীয় ব্যাংক ও বিভিন্ন শিল্পপ্রকল্পের একক অধিকার লাভ করেন। প্রধানমন্ত্রী মির্জা হোসেন খান ছিলেন এই কনসেশনের হোতা, তিনি সংস্কারের পক্ষে থাকলেও সম্ভবত ভেবেছিলেন যে, শাহগণ এতটাই অযোগ্য যে, ব্রিটিশদের হাতে আধুনিকায়নের দায়িত্ব তুলে দেওয়াই ভালো। হিসাবে ভুল হয়েছিল তাঁর। উদ্বিগ্ন অফিসার ও উলেমাদের একটি দল শাহ’র স্ত্রীর নেতৃত্বে রয়টারের কনসেশনের বিরুদ্ধে প্রবল বিক্ষোভ সূচিত করেন, পদত্যাগে বাধ্য হন মির্জা খান। তাসত্ত্বেও উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে ব্রিটেন ও রাশিয়াই ইরান থেকে ওজনদার অর্থনৈতিক কনসেশন আদায় করে নেয়, কোনও কোনও ক্ষেত্রে তা রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণেও পরিণত হয়েছিল। এই বিদেশী প্রভাবের ক্রম বৃদ্ধি দেখে ভীত হয়ে ওঠা আধুনিকায়নের সুবিধা লাভকারী বণিকগণ শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযানে নেমে পড়ে। ৫৬
