মুহাম্মদ আলি ছিলেন নিষ্ঠুর ও নিদারুণ হৃদয়হীন; তাঁর উত্তরাধিকারীরা ছিলেন আনাড়ী, লোভী ও ক্ষীণদৃষ্টির। কিন্তু ন্যায়সঙ্গতভাবে বলতে গেলে অপরিমেয় বাধার মুখে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁরা। প্রথমত, তাঁরা যে ধরনের সভ্যতাকে অনুকরণ করার প্রয়াস পাচ্ছিলেন সেটা ছিল সম্পূর্ণ নতুন কিছু। এখানে বিস্ময়ের কিছু নেই যে, ইউরোপ সম্পর্কে সীমিত অভিজ্ঞতার জোরে এই মানুষগুলো এটা বুঝতে দেরি করে ফেলেছিলেন যে সামান্য সামরিক ও প্রযুক্তিগত সংস্কার তাঁদের একটা ‘আধুনিক’ জাতিতে পরিণত করার জন্যে যথেষ্ট হবে না। গোটা সমাজকেই নতুন করে সংগঠিত করে তোলা, শক্ত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত একটি স্বাধীন শিল্পায়িত অর্থনীতি, ও প্রচলিত রক্ষণশীল চেতনাকে নতুন মানসিকতা দিয়ে প্রতিস্থাপিত করার দরকার ছিল। ব্যর্থতা ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়াবে, কারণ ইউরোপ ততদিনে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। এই শক্তি মিশরকে স্যুয়েয খাল খনন করার জন্যে চাপ দিতে পেরেছে, কিন্তু এর মালিকানার একটা ভাগ পর্যন্ত দিতে অস্বীকার করেছে। তথাকথিত সেই ‘পূর্বাঞ্চলীয় সংকট’ (১৮৭৫-৭৮) ইতিমধ্যেই দেখিয়ে দিয়েছিল যে, ইউরোপের অন্যতম পরাশক্তি (রাশিয়া) অটোমান এলাকার একেবারে প্রাণকেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারে, কেবল ইউরোপিয় দেশগুলোর তরফ থেকে হুমকি থেকেই তাদের প্রতিহত করা সম্ভব, খোদ তুর্কিদের মাধ্যমে নয়। এমনকি মুসলিম শক্তির শেষ শক্তঘাঁটি অটোমান সাম্রাজ্যও নিজ প্রদেশগুলোর উপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারছিল না। ১৮৮১ সালে এই ব্যাপারটা বেদনাদায়কভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, ফ্রান্স তিউনিস দখল করে নেয় ও ১৮৮২ সালে ব্রিটেন দখল করে বসে মিশর। ইউরোপ ইসলামি বিশ্বে আগ্রাসন চালিয়ে সাম্রাজ্যকে টুকরো টুকরো করে ফেলছিল।
এছাড়া, মিশরিয় নেতাদের বিপর্যয়কর সিদ্ধান্ত বাদ দিলেও, এই দুর্বল ইসলামি দেশগুলো ইউরোপিয় বা আমেরিকানদের মতো আধুনিক হয়ে উঠতে পারত না, কারণ এইসব অ-পশ্চিমা দেশের আধুনিকায়ন প্রক্রিয়া মৌলিকভাবে ভিন্ন প্রকৃতির ছিল। ১৮৪৩ সালে ফরাসি লেখক জেরার্দ দে নেরবাল কায়রো সফর করেন, তিনি পরিহাসের সাথে উল্লেখ করেন যে, ফরাসি বুর্জোয়া মূল্যবোধ ইসলামি শহরগুলোতে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। মুহাম্মদ আলি নতুন প্রাসাদগুলো নির্মিত হয়েছিল ব্যারাকের কায়দায়, মেহগনি আর্মচেয়ার ও পাশার ছেলেদের সামরিক পোশষাক পরা তেলচিত্র দিয়ে সাজানা হয়েছিল। নেরবালের কল্পনার বিচিত্র, প্রাচ্যীয় কায়রো
ধুলো আর ছাইয়ের নিচে পড়ে আছে; আধুনিক চেতনা ও এর চাহিদা আজরাইলের মতো একে মাড়িয়ে গেছে। দশ বছরের ভেতর ইউরোপিয় পথঘাট ধূলিমলিন জীর্ণ পুরাতন শহরকে সমকোণে কেটে ফেলবে…চকচকে আর বিস্তৃত হয়েছে কেবল ফ্রাংকদের আবাসস্থল, ইংরেজ, মেল্টিজ আর ফরাসিদের মার্সেই শহর। ৫১
মুহাম্মদ আলি ও ইসমাইল কর্তৃক নির্মিত নতুন কায়রোর দালানকোঠা স্থাপত্য আধিপত্য তুলে ধরেছে। ব্রিটিশ দখলদারির সময় এটা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে, কায়রোর বিভিন্ন অংশে নির্মিত দূতাবাস, ব্যাংক, ভিলা ও সৌধগুলো মধ্যপ্রাচ্যীয় এই দেশটিতে ইউরোপিয় বিনিয়োগের ছবি ফুটিয়ে তুলেছে, কৌশল, কাল ও কর্মকাণ্ডের এক বিচিত্র মিশ্রণ প্রকাশ করেছে সেগুলো, ইউরোপে যাকে সামঞ্জস্যহীন মনে করা হত। কারণ, ব্রিটিশ নৃতাত্ত্বিক মাইকেল জাইলসনান উল্লেখ করেছেন, কায়রো ‘ইউরোপ পুঁজিবাদে অগ্রসর হওয়ার সময় যে পথ পেরিয়ে এসেছে, উন্নয়নের পর্যায়ক্রমের এক রৈখিক পর্যায়ক্রমিক সেই পথ অতিক্রম করছে না।’ এটা শিল্পকেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে না, নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে প্রথা থেকে আধুনিকতাতেও উত্তরণ ঘটছে না বা নতুন শহুরে সামঞ্জস্যতাও অর্জন করছে না:
বরং একে নির্ভরশীল স্থানীয় মেট্রোপলিসে পরিণত করা হচ্ছে যার মাধ্যমে একটি সমাজকে শাসন ও তার উপর আধিপত্য বিস্তার করা যেতে পারে। স্থানিক ধরন শক্তি ও বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উপর ভিত্তি করে বেড়ে উঠেছে, এইক্ষেত্রে ব্রিটেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ৫২
আধুনিকায়নের সম্পূর্ণ অভিজ্ঞতা মধ্যপ্রাচ্যে গুরুত্বপূর্ণভাবে ভিন্ন ছিল: এটা ইউরোপের মতো ক্ষমতায়ন, স্বয়ত্তশাসন ও উদ্ভাবনের ব্যাপার ছিল না, বরং বঞ্চনা, নির্ভরতা ও জোড়াতালি দেওয়া অসম্পূর্ণ অনুকরণ। এই প্রক্রিয়ায় জড়িত বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের পক্ষে এক ধরনের বিচ্ছিন্নতারও অভিজ্ঞতা ছিল এটা। কায়রোর মতো মুহাম্মদ আলির কোনও ‘আধুনিক শহর’ মিশরের অন্যান্য স্থানীয় শহরের নির্মাণের পেছনে ক্রিয়াশীল নীতিমালার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে গড়ে তোলা হয়েছিল। জাইলসনান যেমন উল্লেখ করেছেন, পর্যটক, উপনিবেশবাসী ও পরিব্রাজকরা প্রায়শঃই প্রাচ্যীয় শহরগুলোকে বিভ্রান্তিকর এমনকি ভীতিকর বলেও আবিষ্কার করে থাকে: মনে হয় নামহীন, নম্বরহীন সব পথঘাট আর আঁকাবাঁকা গলিঘুঁচির যেন কোনও শৃঙ্খলা বা দিশা নেই। পশ্চিমারা এখানে হারিয়ে যায়, নিজেদের চারপাশের পরিবেশের কোনও অর্থ করে উঠতে পারে না। মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার বেশিরভাগ মানুষের কাছে নতুন পাশ্চাত্যকৃত শহরগুলো সমান মাত্রায় বোধের অতীত ছিল, এর সাথে একটা শহর কেমন হতে পারে সে সম্পর্কে তাদের সহজাত অনভূতির কোনওই মিল ছিল না। নিজের দেশেই ঘন ঘন দিশা হারিয়ে ফেলত ওরা। এইসব ‘সুপারইম্পোজড’ পাশ্চাত্যকৃত শহরের অনেকগুলোকেই ঘিরে ছিল ‘পুরোনো শহর’, তুলনামূলকভাবে যেগুলোকে অন্ধকার, ভীতিকর ও আধুনিক বিশ্বের যৌক্তিকভাবে বিন্যস্ত শহরের বাইরের কিছু মনে হত।৫৩ মিশরিয়রা এভাবে দ্বৈত বিশ্বে বাস করতে বাধ্য হয়েছিল: একটি আধুনিক ও পশ্চিমা, অপরটি প্রথাগত। এই দ্বৈততা এক বড় ধরনের পরিচয় সঙ্কটের দিকে নিয়ে যাবে তাদের এবং আধুনিকতার অন্যান্য অভিজ্ঞতার মতো কিছু বিস্ময়কর ধর্মীয় সমাধানের পথে চালিত করবে।
