এইসব ইউরোপিয় প্রকল্পের ভেতর সবচেয়ে লক্ষণীয় ছিল স্যুয়েয খাল নির্মাণ। মুহাম্মদ আলি ভূমধ্যসাগরের সাথে লোহিত সাগরকে সংযুক্ত করার যেকোনও পরিকল্পনার বিরোধী ছিলেন, তাঁর ভয় ছিল যে, এর ফলে মিশর আরও একবার ইউরোপিয় শক্তিগুলোর নজর কাড়বে, তাতে পাশ্চাত্য আগ্রাসন ও আধিপত্য বিস্তারের এক নতুন পর্যায় শুরু হবে। কিন্তু সাঈদ পাশা এই ধারণায় ছিলেন মুগ্ধ, তিনি পুরোনো বন্ধু ফরাসি কনসাল ফার্নিনান্দ দে লেসেপসকে (১৮০৫-৯৪) কনসেশেন মঞ্জুর করতে একপায়ে খাড়া ছিলেন। তিনি তাঁকে বিশ্বাস করিয়েছিলেন যে এই খাল মিশরকে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে সক্ষম করে তুলবে, ফ্রান্সের টাকায় তৈরি করা হবে বলে এতে মিশরের কোনও খরচই হবে না। সাঈদ ছিলেন অনভিজ্ঞ; ৩০শে নভেম্বর, ১৮৫৪ তারিখে সম্পাদিত কনসেশন মিশরের পক্ষে বিপর্যয়কর ছিল। সুলতান ও ইংল্যান্ডের লর্ড পামারস্টোন এর বিরোধিতা করেন, কিন্তু দে লেসেপস এগিয়ে যান, নিজের কোম্পানি গড়ে তোলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, রাশিয়া, অস্ট্রিয়া ও অটোমান সাম্রাজ্যের কাছে শেয়ার বিক্রির প্রস্তাব দেন। কিন্তু শেয়ার গৃহীত না হলে পাশা প্রকল্পে নিজের বিনিয়োগের বাইরে এই অর্থ মঞ্জুর করেন। ১৮৫৯ সালের এপ্রিলে শুরু হয় কাজ।
শেষ পর্যন্ত মিশরকেই দুশোমাইল ভূখণ্ড জমিন বিনা মূল্যে তুলে দেওয়া ছাড়াও প্রায় সমস্ত টাকা, শ্রম আর কাঁচামালও যোগাতে হয়েছে। ১৮৬৩ সালে সাঈদ মারা গেলে ভাস্তে ইসমায়েল (১৮৩০-৯৫) তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন। তিনি খালের পক্ষে ছিলেন, কিন্তু মিশরের পক্ষে আরও ভালো কিছু পাওয়ার আশায় কনসেশনকে ফ্রান্সের সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়নের শালিসের অধীনে নিয়ে যান। ১৮৬৪ সালে কোম্পানির বিনামূল্যে মিশরিয় শ্রমিক পাওয়ার অধিকার প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়, কিছু পরিমাণ এলাকা ফিরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু মিশরিয় সরকারের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ হিসাবে ৮৪ মিলিয়ন ফ্রাঙ্ক (তিন মিলিয়নেরও বেশি পাউন্ড) ইনডেমনিটি পাওয়ার অধিকারী হয় কোম্পানি। মহা উদ্বোধন ছিল চোখ ধাঁধানো অনুষ্ঠান। মিশরে বিনামূল্যে আগমন ও থাকবার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছিল অতিথিদের; ভার্দি’র আইদা অপেরা নতুন কায়রো অপেরা হাউজের জন্যে উদ্বোধন করা হয়। অতিথিদের পিরামিডের কাছে নিতে বিশেষ পথ নির্মাণ করা হয়।৪৮ এই ব্যয়বহুল প্রদর্শনীর উদ্দেশ্য ছিল মিশরের সমৃদ্ধি সম্পর্কে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিশ্বাস উৎপাদন করে আরও বিনিয়োগ উৎসাহিত করা। অবশ্য, প্রকৃতপক্ষে মিশর তখন দেউলিয়া অবস্থায় পৌঁছে গিয়েছিল প্রায়।
খাল নিশ্চিতভাবেই মিশরের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দিতে সাহায্য করেছিল, কিন্তু কেবল এটাই দায়ী ছিল না। আরও একবার ইসমায়েলের কর্মজীবন অ-পশ্চিমা দেশে আধুনিকায়নের বিপুল ব্যয় তুলে ধরে। ইসমায়েল চেয়েছিলেন স্বনির্ভরতা; মিশরকে অটোমান আধিপত্য থেকে মুক্ত করাই ছিল তাঁর লক্ষ্য। স্বায়ত্তশাসনের আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল তাঁর, কিন্তু অর্জন করেছিলেন কেবল পঙ্গুত্ব বয়ে আনা নির্ভরতা ও শেষ পর্যন্ত ইউরোপিয় শক্তির দখলদারি। মুহাম্মদ আলি সৈনিক ছিলেন, যুদ্ধ করে মুক্তি অর্জনের চেষ্টা করেছিলেন। ইসমায়েল মুক্তি কিনে নিতে চেয়েছেন। ৮ই জুন, ১৮৬৭ নিজেকে অন্যান্য অটোমান পাশা থেকে ভিন্ন করে তুলতে সুলতানের কাছ থেকে পারসি উপাধি খেদিভ (‘মহান রাজপুত্র) কিনে নেন তিনি। এই সুবিধার জন্যে ইস্তাম্বুলেকে মিটিয়েছিলেন বার্ষিক চাঁদা হিসাবে অতিরিক্ত ৩৫০,০০০ পাউন্ড।৪* খাল নির্মাণের ব্যয় নিয়েও যুঝতে হয়েছে তাঁকে, আমেরিকান গৃহযুদ্ধের সময় আকাশছোঁয়া তুলার আকস্মিক মূল্য হ্রাস মোকাবিলা করতে হয়েছে এবং নিজের উচ্চাভিলাষী আধুনিকায়ন প্রকল্পসমূহের তহবিলের সংস্থান করতে হয়েছে। এ সবের মধ্যে ছিল ৯০০ মাইল রেলপথ নির্মাণ, ৪৩০টি সেতু ও ১১২টি খাল, প্রায় ১,৩৭৩,০০০ একর এযাৎ পতিত জমিতে সেঁচ সুবিধা সৃষ্টি করেছিল।৫° খেদিভের অধীনে মিশর আগের শাসকের চেয়ে ঢের দ্রুত অগ্রসর হয়: উভয় লিঙ্গের জন্যে শিক্ষা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও ভূতাত্ত্বিক খননের পরিকল্পনা ছিল তাঁর। অনুপ্রেরণাদায়ী নতুন নতুন দালানকোঠা, প্রশস্ত ব্যুলেভার্দ ও প্রমোদ উদ্যান নিয়ে কায়রো পরিণত হয়েছিল আধুনিক নগরে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ইসমায়েল এসব কোনও কিছুর জন্যে পয়সা মেটাতে পারেননি। অর্থ যোগাড়ের জন্যে সহজ ঋণের এক ব্যবস্থা চালু করে বিপুল পরিমাণ অর্থ ধার করেন তিনি, এই অর্থের বেশ উল্লেখযোগ্য একটা অংশ ইউরোপিয় ব্রোকার, ব্যাংকার ও উদ্যোক্তাদের পকেট ভারি করেছে; আরও অর্থ ব্যয় করার জন্যে এরা তাঁকে তোষামোদ করেছে। অর্থলগ্নীকারীদের সহজ শিকারে পরিণত হয়েছিলেন খেদিভ। ১৮৭৫ সালে লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে অটোমান সিকিউরিটিজের দর পতনের সাথে সাথে মিশরিয় সিকিউরিটিজেও ধস নামে; এটাই ছিল শেষ কুটো।
স্যুয়েয খাল মিশরকে সম্পূর্ণ নতুন কৌশলগত গুরুত্ব এনে দিয়েছিল, ইউরোপিয় শক্তিগুলো এর সম্পূর্ণ ধ্বংস চায়নি। নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করার জন্যে ব্রিটেন ও ফ্রান্স খেদিভের উপর আর্থিক নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে, এই নিয়ন্ত্রণ রাজনৈতিক হয়ে ওঠার হুমকি সৃষ্টি করেছিল। মুহাম্মদ আলি ঠিকই আশঙ্কা করেছিলেন যে, এই খাল মিশরিয় স্বাধীনতা বিপন্ন করে তুলবে। মিশরিয় সরকারের অর্থিক লেনদেনের তত্ত্বাবধানের লক্ষ্যে ইউরোপিয় মন্ত্রীদের নিয়োগ দেওয়া হয়। ১৯৭৯ সালের এপ্রিলে ইসমায়েল তাদের বরখাস্ত করলে ইউরোপের প্রধান শক্তিগুলো-ব্রিটেন, ফ্রান্স ও অস্ট্রিয়া-তাঁর বিরুদ্ধে একাট্টা হয়ে খেদিভকে বরখাস্ত করার জন্যে সুলতানের উপর চাপ সৃষ্টি করে। ইসমায়েলের স্থলাভিষিক্ত হন তাঁর ছেলে সহৃদয় তরুণ তৌফিক (১৮৫২-৯২), কিন্তু এটা পরিষ্কার যে তিনি ছিলেন ক্ষমতার পুতুল মাত্র। ফলে জনগণ ও সেনাবাহিনী উভয়ের কাছেই অজনপ্রিয় ছিলেন তিনি। মিশরিয় অফিসার আহমেদ বে উরুবি (১৮৪০-১৯১১) সেনাবাহিনী ও সরকারে মিশরিয়দের আরও সিনিয়র পদে নিয়োগের দাবি নিয়ে ১৮৮১ সালে অভ্যুত্থান সংঘটিত করে দেশের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ আয়ত্তে নিতে সমর্থ হলে ব্রিটেন হস্তক্ষেপ করে সামরিক দখলদারিত্বের শুরু করে। মিশরকে ইউরোপের অংশে পরিণত করতে চেয়েছিলেন ইসমাইল, কিন্তু কার্যত একে তিনি ইউরোপিয় কলোনিতে পরিণত করেন।
