এমনি প্রবল আক্রমণের মুখে মিশরের উলেমাগণ ভীতু ও প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে পড়েন। সরকারের প্রথাগত পরামর্শকের ভূমিকা নতুন বিদেশী প্রশাসকদের অভিজাত গোষ্ঠী কেড়ে নিয়েছিল, যাদের বেশির ভাগেরই স্থানীয় ঐতিহ্যের প্রতি তেমন একটা শ্রদ্ধা ছিল না। প্রগতির যাত্রায় উলেমাদের পেছনে ফেলে যাওয়া হয়েছিল, কিতাব ও পাণ্ডুলিপি হাতে তাঁদের একা রেখে দিয়েছিলেন পাশা। বিরোধিতা অসম্ভব হয়ে ওঠায় উলেমাগণ পরিবর্তন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন, পণ্ডিতি প্রথায় নিমজ্জিত করেন নিজেদের। মিশরের এটাই উলেমাদের প্রধান অবস্থানে পরিণত হবে ও অব্যাহত থাকবে। তাঁরা আধুনিকতাকে বুদ্ধিবৃত্তিক চ্যালেঞ্জ মনে করেননি, তার বদলে তাঁদের ক্ষমতা ও সম্পত্তি চুরি এবং মর্যাদা ও প্রভাব খোয়া যাবার চলমান প্রক্রিয়া হিসাবে একে কতগুলো ঘৃণ্য ও ধ্বংসাত্মক বিধিনিষেধের ধারা মনে করেছেন।৪৫ মিশরের মুসলিমরা পাশ্চাত্য ধ্যানধারণার সংস্পর্শে আসার পর যাজকগোষ্ঠীর কাছ থেকে কোনও রকম পথ নির্দেশনা না পেয়ে সাহায্যের জন্যে অন্য দিকে চোখ ফেরাবে।
শত শত বছর ধরে মিশরের শাসক অভিজাত গোষ্ঠী ও উলেমাদের ভেতর একটা অংশীদারী ছিল। মুহাম্মদ আলি এই সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলেন, অকস্মাৎ এক নতুন সেক্যুলারিজমের সূচনা ঘটিয়েছিলেন তিনি। এর কোনও আদর্শিক সমর্থন ছিল না, বরং রাজনৈতিক অনিবার্য পদক্ষেপ হিসাবে আরোপ করা হয়েছিল। পশ্চিমে লোকে আস্তে আস্তে চার্চ ও রাষ্ট্রের পৃথকীকরণে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল। এমনকি জাগতিক এক ধরনের আধ্যাত্মিকতাও গড়ে তুলেছিল তারা। অধিকাংশ মিশরিয়র কাছে অবশ্য সেক্যুলারাইজেশন অচেনা, বিদেশী ও বোধের অতীত রয়ে গিয়েছিল।
অটোমান সাম্রাজ্যে একই ধরনের আধুনিকায়নের প্রক্রিয়া চলছিল, তবে পাশ্চাত্য পরিবর্তনের পেছনের বিভিন্ন ধারণা সম্পর্কে ইস্তাম্বুলে অধিকতর সচেতনতা ছিল। অটোমানরা ইউরোপে কূটনীতিকে পরিণত হয়েছিলেন এবং সুলতানের দরবারে ইউরোপিয় রাষ্ট্রনায়কদের সাথে মিলিত হয়েছেন তারা। ১৮২০ ও ১৮৩০-র দশকে আধুনিক বিশ্বের সাথে পরিচিত একটি প্রজন্ম গড়ে ওঠে, এরা সাম্রাজ্যের সংস্কারের প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ ছিল। পরবর্তীতে গ্র্যান্ড উযির নিয়োগ পাওয়া আহমেদ বেভিক পাশার বাবা প্যারিসে তুর্কি দূতাবাসে কাজ করেছিলেন; স্বয়ং আহমেদ গিবন, হিউম, অ্যাডাম স্মিথ, শেক্সপিয়র ও ডিকেন্স পড়েেেছন। মুস্তাফা রাশেদ পাশা প্যারিসেও প্রশিক্ষণ লাভ করেছিলেন ও সেখানে রাজনীতি ও সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করেন। তিনি দৃঢ় বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন যে, আধুনিক সেনাবাহিনী এবং একটি নতুন আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাসহ সকল নাগরিকের সাম্যতাকে স্বীকৃতি দানকারী কেন্দ্রিভূত রাষ্ট্রে পরিণত হতে না পারলে অটোমান সাম্রাজ্য আধুনিক বিশ্বে টিকে থাকতে পারবে না; ক্রিশ্চান ও ইহুদিদের অবশ্যই আর ‘জিম্মি’ হিসাবে (‘সুরক্ষিত সংখ্যালঘু’) রাখা যাবে না, বরং তাদের মুসলিম নাগরিকদের সমান মর্যাদাই দিতে হবে। এইসব ইউরোপিয় ধারণা চালু থাকায় দ্বিতীয় মুহাম্মদের পক্ষে ১৮২৬ সালে তানযিমাত (‘বিধান’) চালু করা অপেক্ষাকৃত সহজ ছিল। এইসব বিধান জানেসারিদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়, সেনাবাহিনীর আধুনিকায়ন সূচিত করে ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন শুরু হয়। প্রথমে সুলতান ভেবেছিলেন, সাম্রাজ্যের ক্রমাবনতি ঠেকাতে এটাই যথেষ্ট প্রমাণিত হবে, কিন্তু ইউরোপিয় শক্তির অব্যাহত অগ্রগতি ও ইসলামি অঞ্চলে ধীরে ধীরে তাদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অনুপ্রবেশ এটা স্পষ্ট করে দিয়েছিল যে, আরও মৌলিক পরিবর্তন আবশ্যক হয়ে পড়েছে।৪৬
১৮৩৯ সালে সুলতান আব্দুলহামিদ রেশিদ পাশার প্ররোচণায় গুলহানে ডিক্রি জারি করেন, ফলে ইসলামি আইন অখণ্ড থাকলেও সুলতানের রাজত্বকে প্রজাদের সাথে চুক্তিভিত্তিক সম্পর্কের উপর নির্ভরশীল করে তোলে। সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠানসমূহের মৌলিক পরিবর্তনের মুখাপেক্ষী ছিল তা, যাকে আরও পদ্ধতিগত ও দক্ষতার সাথে পরিচালিত হতে হবে। পরের তিন দশকের পরিক্রমায় কেন্দ্রিয় ও স্থানীয় সরকারের পুনর্গঠন করা হয়, প্রতিষ্ঠা করা হয় ফৌজদারি ও বাণিজ্যিক বিধান ও বিভিন্ন আদালত। ১৮৫৬ সালে হাত্তি হুমায়ূন ডিক্রি ধর্মীয় সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোকে পূর্ণ নাগরিকত্ব প্রদান করে। কিন্তু এতে করে অনিবার্যভাবে উলেমাদের সাথে সংঘাতের সৃষ্টি হয়, তাঁরা এইসব উদ্ভবনকে শরীয়াহ আইনের অবমূল্যায়ন মনে করেছেন।৪৭ সংস্কারের প্রতি যারা অঙ্গিকারাবদ্ধ ছিলেন, ক্রমাগত তাদের এই প্রশ্ন নিয়ে যুদ্ধ করতে হয়েছে: ইসলামি ঐতিহ্যকে জলাঞ্জলি না দিয়ে কেমন করে মুসলিমরা আধুনিক হতে পারে? ঠিক ক্রিশ্চান ধর্ম যেভাবে বদলে গেছে, এবং আধুনিকায়ন আলোকনের চিন্তাভাবনার প্রভাবে যেভাবে তা বদলে যাচ্ছে, আগামী দশকগুলোয় ইসলামকেও তেমনি বদলে যেতে হবে।
জরুরি ভিত্তিতে এ প্রশ্নের উত্তর মেলার প্রয়োজন ছিল, কারণ প্রতিটি বছর পেরিয়ে যাবার সাথে সাথে মুসলিম বিশ্ব ও সাথে সাথে পাশ্চাত্য জগতের দুর্বলতাও প্রকট হয়ে উঠছিল। মুহাম্মদ আলি সুলতানকে ঠেকিয়ে রাখতে সক্ষম হলেও, ১৮৪০ সালে ইউরোপের চাপের কাছে বাধ্য হয়ে সিরিয়া, আরব ও গ্রিসে তাঁর নতুন সীমানা গুটিয়ে আনতে হয়েছিল। মারাত্মক তিক্ত আঘাত ছিল এটা, এই ধকল কিছুতেই সামলে উঠতে পারেননি তিনি। ১৮৪০ সালে মিশরের পাশা হিসাবে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হওয়া তাঁর পৌত্র আব্বাস (১৮১৩-৫৪) ইউরোপ এবং পশ্চিমের সমস্ত কিছুই ঘৃণা করতেন। সৈনিক ছিলেন তিনি, অটোমান সাম্রাটদের বিপরীতে তাঁর কোনও উদার নৈতিক শিক্ষা ছিল না। তাঁর চোখে পাশ্চাত্যের মানে ছিল শোষণ ও অপমান: ইউরোপিয় প্রশাসক ও ব্যবসায়ীদের মিশরে লাভ করা বিশেষ সুবিধাগুলোকে ঘৃণা করতেন তিনি, ইউরোপিয়রা নিজেদের আর্থিক সুবিধার জন্যে যেভাবে তাঁর পিতামহকে বিভিন্ন অসম্ভব প্রকল্প হাতে নিতে তাগিদ দিয়েছিল, তাও ছিল তাঁর অসন্তোষের বিষয়। তিনি মুহাম্মদ আলি নৌবহর ভেঙে দেন, সেনাবাহিনীকে সীমিত আকার দেন এবং নতুন স্কুলসমূহ বন্ধ করে দেন। আব্বাস অবশ্য মিশরিয়দের মাঝেও অজনপ্রিয় ছিলেন, ১৮৫৪ সালে আততায়ীর হাতে প্রাণ হারান তিনি। মুহাম্মদ আলির চতুর্থ ছেলে মুহাম্মদ সাঈদ পাশা (১৮২২-৬৩) তাঁর উত্তরাধিকারী হন। তিনি ছিলেন আব্বাসের সম্পূর্ণ উল্টো। ফরাসিভাষী সাঈদ পাশ্চাত্য জীবনযাত্রাকে বেছে নিয়েছিলেন, বিদেশীদের সাহচর্য তিনি ভালোবাসতেন, সেনাবাহিনীকে ফের চাঙা করে তোলেন। কিন্তু শাসনামলের শেষের দিকে এমনকি সাঈদও কোনও কোনও ইউরোপিয় কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠানের বেপরোয়া কর্মকাণ্ড ও সন্দেহজনক আচরণের কারণে মোহমুক্ত হয়ে ওঠেন।
