এইসব ঘটনা যুগপৎ প্রাথমিক আধুনিক কালের মাহাত্ম্য ও বিনাশ প্ৰতিফলিত করে। কলম্বাসের অভিযান যেমন জোরালভাবে দেখিয়েছে যে, ইউরোপের জনগণ এক নতুন বিশ্বের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। ওদের দিগন্ত প্রসারিত হচ্ছিল, এপর্যন্ত বুদ্ধিবৃত্তিক, সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে অজানা এক ভৌগলিক বলয়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছিল তারা। এই সাফল্য তাদের বিশ্বের অধিপতিতে পরিণত করবে। কিন্তু আধুনিকতার অন্ধকার দিকও ছিল। ক্রিশ্চান স্পেন ছিল ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী ও অগ্রসর রাজ্য। ক্রিশ্চান বিশ্বের অন্যান্য অংশে বিকাশমান বিভিন্ন রাষ্ট্রের মতো একটি আধুনিক কেন্দ্রিভূত রাষ্ট্র নির্মাণের পথে ছিলেন ফার্দিনান্দ ও ইসাবেলা। এমন একটি রাষ্ট্র মধ্যযুগকে বৈশিষ্ট্যায়িত করে তোলা গিল্ড, কর্পোরেশন বা ইহুদি সম্প্রদায়ের মতো প্রাচীন স্বায়ত্তশাসিত, স্ব-পরিচালিত প্রতিষ্ঠানসমূহকে সহ্য করতে পারে না। গ্রানাদা অধিকারের ভেতর দিয়ে স্পেনের একীভূতকরণের প্রক্রিয়ার পরপরই জাতিগত পরিশুদ্ধির একটি প্রক্রিয়া শেষ করা হয়। ইহুদি ও মুসলিমরা তাদের আবাস হারায়। কিছু কিছু মানুষের কাছে আধুনিকায়ন ছিল ক্ষমতায়ন, মুক্তিদায়ী এবং উত্তেজনাকর। অন্যরা একে নির্যাতনমূলক, আগ্রাসী ও প্রলয়ঙ্করী হিসাবে প্রত্যক্ষ করেছে এবং করে যাবে। পাশ্চাত্য আধুনিকতা পৃথিবীর অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে এই একই প্যাটার্ন অব্যাহত থাকবে। এই আধুনিকায়ন কর্মসূচি ছিল আলোকসৃষ্টিকারী, শেষ পর্যন্ত তা মানবিক মূল্যবোধসমূহকে উপরে তুলে ধরবে, কিন্তু তা আগ্রাসীও ছিল। বিংশ শতাব্দীতে প্রাথমিকভাবে আধুনিকতাকে আক্রমণ হিসাবে প্রত্যক্ষকারীরাই পরিণত হবে মৌলবাদীতে।
কিন্তু সেটা তখনও দূর ভবিষ্যতের গর্ভে। পঞ্চদশ শতকের শেষদিকে ইউরোপের জনগণের পক্ষে তাদের সূচিত পরিবর্তনের ব্যাপকতা উপলব্ধি করা সম্ভব ছিল না। পরবর্তী তিন শো বছরের পরিক্রমায় ইউরোপ কেবল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবেই সমাজসমূহের পরিবর্তন ঘটাবে না, বরং এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লব সংগঠিত করবে। বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদ পরিণত হবে যুগের বিধানে, ধীরে ধীরে মন ও হৃদয়ের পুরোনো আলখেল্লাকে বিতাড়িত করবে। তৃতীয় অধ্যায়ে আমরা গ্রেট ওয়েস্টার্ন ট্রান্সফর্মেশন হিসাবে আখ্যায়িত এই সময়কালের উপর আলোকপাত করব। তবে এর পূর্ণাঙ্গ তাৎপর্য উপলব্ধির আগে প্রাক আধুনিক কালের মানুষ কীভাবে বিশ্বকে প্রত্যক্ষ করত সেটা দেখতে হবে। স্পেনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সোৎসাহে ছাত্র ও শিক্ষকগণ ইতালিয় রেনেসাঁর নানা নতুন ধারণা নিয়ে আলোচনায় মেতে ছিলেন। ম্যাগনেটিক কম্পাস বা জ্যোতির্বিজ্ঞানের নবতর ধারণার মতো বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের সাহায্য ছাড়া কলম্বাসের অভিযান সম্ভব ছিল না। ১৪৯২ সাল নাগাদ পাশ্চাত্য বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদ দর্শনীয়ভাবে কার্যকর হয়ে উঠছিল। মানুষ আগের চেয়ে ঢের বেশি পরিপূর্ণভাবে গ্রিকরা যাকে লোগোস আখ্যায়িত করেছে তার সম্ভাবনা আবিষ্কার করছিল, সব সময়ই যা একেবারে নতুন কিছুর আকাঙ্ক্ষা করছিল। আধুনিক বিজ্ঞানের কল্যাণেই ইউরোপিয়রা সম্পূর্ণ নতুন এক বিশ্ব আবিষ্কার করে, পরিবেশের উপর অভাবনীয় নিয়ন্ত্রণ লাভ করতে শুরু করে। কিন্তু তখনও তারা মিথোসকে নাকচ করে দেয়নি। বিজ্ঞানের সাথে পরিচয় ছিল কলম্বাসের, কিন্তু তখনও তিনি প্রাচীন পৌরাণিক বিশ্বেই স্বচ্ছন্দ বোধ করতেন। তিনি ধর্মান্তরিত এক ইহুদি পরিবারের সন্তান ছিলেন বলেই মনে হয়, ইহুদিবাদের মরমী ঐতিহ্য কাব্বালায় তাঁর আগ্রহ রয়ে গিয়েছিল; কিন্তু আবার ধর্মপ্রাণ ক্রিশ্চান ছিলেন তিনি; ক্রাইস্টের পক্ষে গোটা বিশ্বকে অধিকার করতে চেয়েছেন। ভারতে পৌছানোর পর জেরুজালেমের সামরিক অধিকার লাভের জন্যে সেখানে একটি ক্রিশ্চান ঘাঁটি স্থাপনের আশা করেছিলেন তিনি। ইউরোপের মানুষ আধুনিতার পথে যাত্রা শুরু করেছিল, কিন্তু আমাদের মতো পূর্ণাঙ্গ আধুনিক হয়ে ওঠেনি। ক্রিশ্চান ধর্মের বিভিন্ন মিথ যৌক্তিক ও বৈজ্ঞানিক অভিযানে তখনও ওদের কাছে অর্থ যোগাচ্ছিল।
তাসত্ত্বেও ক্রিশ্চান ধর্ম বদলে যাচ্ছিল। স্পেনিয়ার্ডরাই কাউন্সিল অভ ট্রেন্ট সূচিত কাউন্টার রিফর্মেশনের (১৫৪৫-৬৩) নেতায় পরিণত হবে। এটা ছিল পুরোনো ক্যাথলিজমকে নতুন ইউরোপের সংহত দক্ষতার সাথে এক তলে আনয়নকারী একটি আধুনিকায়ন কর্মসূচি। আধুনিক রষ্ট্রের মতো চার্চ অধিকতর কেন্দ্রিভূত সংস্থায় পরিণত হয়। কাউন্সিল পোপ ও বিশপদের ক্ষমতার সংস্কার করে, প্রথমবারের মতো মতবাদগত সমরূপতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সকল বিশ্বাসীর উদ্দেশ্যে একটি ক্যাটেশিজম জারি করা হয়। যাজকদের আরও উন্নত মানের শিক্ষিত হয়ে ওঠার প্রয়োজন ছিল, যাতে তাঁরা আরও কার্যকরভাবে ধর্ম শিক্ষা দিতে পারেন। সাধারণ মানুষের লিটার্জি ও ভক্তি প্রকাশের বিভিন্ন অনুশীলনকে যৌক্তিক করা হয়; এক শতাব্দী আগেও অর্থপূর্ণ ছিল যেসব আচার সেগুলো এখন আর নতুন যুগের জীবনযাত্রায় কাজ আসছিল না বলে বাতিল করে দেওয়া হয়। স্পেনের বহু ক্যাথলিক ওলন্দাজ মানবতাবাদী দেসিদেরিয়াস ইরাসমাসের (১৪৬৬-১৫৩০) রচনায় উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে। মৌলবিষয়ে ফিরে গিয়ে ক্রিশ্চান ধর্মকে পুনরুজ্জীবিত করে তুলতে চেয়েছিলেন তিনি। তাঁর শ্লোগান ছিল, আদ ফন্তেস: ‘ফিরে চলো ঝর্নায়!’ ইরাসমাসের বিশ্বাস ছিল প্রাথমিক চার্চের প্রকৃত ক্রিশ্চান ধর্মবিশ্বাস প্রাণহীন কিছু মধ্যযুগীয় ধর্মতত্ত্বের নিচে চাপা পড়ে গেছে। পরবর্তীকালের বিভিন্ন সংযোজন ছিন্ন করে উৎসে-বাইবেল ও ফাদার্স অভ দা চার্চ-ফেরার মাধ্যমে ক্রিশ্চানরা গস্পেলের সজীব মূল বিষয় উদ্ধার করবে ও এক নবজন্মের অভিজ্ঞতা লাভ করবে।
