তবে অষ্টাদশ শতাব্দী নাগাদ ইউরোপ ও আমেরিকার জনগণ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এমন বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন করে যে তারা ভাবতে শুরু করেছিল যে লোগোসই সত্যি জানার একমাত্র উপায়, মিথোসকে তারা মিথ্যা ও কুসংস্কার বলে নাকচ করে দিতে শুরু করে। এটাও ঠিক যে যে নতুন বিশ্ব নির্মাণ করতে যাচ্ছিল তারা সেটা প্রাচীন পৌরাণিক আধ্যাত্মিকতার গতিশীলতার সাথে বিরোধমূলক হয়ে উঠেছিল। আধুনিক বিশ্বে আমাদের ধর্মীয় অভিজ্ঞতা বদলে গেছে, ক্রমবর্ধমান হারে মানুষ বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদকেই কেবল সত্যি হিসাবে দেখতে শুরু করায় তারা তাদের ধর্মবিশ্বাসের মিথোসকে প্রায়শঃই লোগোসে পরিণত করার প্রয়াস পেয়েছে। মৌলবাদীরাও একই প্রয়াস পেয়েছে। এই বিভ্রান্তি আরও বেশি করে সমস্যার সৃষ্টি করেছে।
আমাদের বিশ্ব কীভাবে বদলে গেছে সেটা আমাদের বুঝতে হবে। সুতরাং, এই বইয়ের প্রথম অংশ পঞ্চদশ শতকের শেষে ও সপ্তম শতকের গোড়ায় ফিরে যাবে, যখন পশ্চিম ইউরোপের জনগণ তাদের নতুন বিজ্ঞানের উদ্ভাবন ঘটাতে যাচ্ছিল। ধর্মবিশ্বাসের প্রাচীন ধরনগুলো কীভাবে কাজ করত বোঝার জন্যে আমরা প্রাক আধুনিক কৃষিভিত্তিক সমাজের পৌরাণিক ধর্মানুরাগও পর্যালোচনা করব। সাহসী নতুন বিশ্বে প্রচলিত ধারায় ধার্মিক থাকা ক্রমবর্ধমানহারে কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। আধুনিকায়ন সব সময়ই একটা বেদনাদায়ক প্রক্রিয়া ছিল। সমাজের মৌলিক পবির্তন যখন বিশ্বকে অচেনা ও শনাক্তের অতীত করে তোলে মানুষ তখন বিচ্ছিন্ন ও দিশাহারা বোধ করতে শুরু করে। আমরা ইউরোপ ও আমেরিকার ক্রিশ্চান, ইহুদি জনগণ ও মিশর ও ইরানের মুসলিমদের উপর আধুনিকতার প্রভাব অনুসন্ধানের চেষ্টা করব। তাহলেই আমরা উনবিংশ শতাব্দীর শেষপাদে মৌলবাদীরা ধর্মবিশ্বাসের এই নতুন ধরন সৃষ্টি করতে যাওয়ার সময় তারা আসলে কী করার চেষ্টা করছিল জানার মতো একটা অবস্থানে পৌঁছাতে পারব আমরা।
মৌলবাদীরা মনে করে তারা বুঝি তাদের পবিত্রতম মূল্যবোধকে আক্রান্তকারী শক্তির বিরুদ্ধে লাড়াই করছে। যুদ্ধের সময় সংঘাতে লিপ্ত থাকে যারা তাদের পক্ষে একে অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি উপলব্ধি করা দারুণ কঠিন হয়। আমরা দেখব যে, আধুনিকায়ন সমাজের মেরুকরণের দিকে চালিত করেছে, তবে অনেক সময় বিরোধের অবনতি ঠেকাতে আমাদের অবশ্যই অন্যপক্ষের বেদনা ও দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার প্রয়াস পেতে হবে। আমাদের ভেতর যারা- আমিসহ আধুনিকতার স্বাধীনতা ও সাফল্য ভোগ করে থাকি তাদের পক্ষে ধর্মীয় মৌলবাদীদের ক্ষেত্রে সেসবের কারণে সৃষ্ট দুর্গতি বোঝা কঠিন। তবু আধুনিকায়ন প্রায়শঃই মুক্তি নয় বরং আক্রমণাত্মক হামলা হিসাবে বিবেচিত হয়ে থাকে। আধুনিক বিশ্বে ইহুদি জাতির তুলনায় খুব কমসংখ্যকই ভোগান্তির স্বীকার হয়েছে; সুতরাং, পঞ্চদশ শতকের শেষের দিকে আধুনিকায়নবাদী পাশ্চাত্য সমাজের সাথে তাদের বেদনাদায়ক সাক্ষাতের ঘটনা দিয়ে শুরু করাই সবচেয়ে মানানসই হবে, যা কোনও কোনও ইহুদিকে পরে নতুন বিশ্বে সাধারণ বিষয়ে পরিণত হবে এমন নানা ধরনের রণকৌশল, অবস্থান ও নীতিমালার উদ্ভাবনের পথে চালিত করেছিল।
০১. ইহুদি : অগ্রপথিক (১৪৯২-১৭০০)
১৪৯২ সালে স্পেনে তিনটি দারুণ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। সেই সময় এই ঘটনাগুলোকে অসাধারণ মনে করা হয়েছিল, কিন্তু পেছনে তাকিয়ে আমরা বুঝতে পারি এসব ছিল পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে পশ্চিম ইউরোপে ধীরে ধীরে বেদনাদায়কভাবে জন্ম নিতে চলা এক নতুন সমাজেরই বৈশিষ্ট্য। এই বছরগুলো আমাদের আধুনিক পাশ্চাত্য সংস্কৃতির বিকাশ প্রত্যক্ষ করেছে। সুতরাং ১৪৯২ সাল আমাদের বেশ কিছু চিন্তা-ভাবনা ও দোলাচলেরও উপরও আলোকপাত করে। প্রথম ঘটনাটি ঘটেছিল জানুয়ারির ২ তারিখে, এই দিন ক্যাথলিক সম্রাট-সম্রাজ্ঞী রাজা ফার্দিনান্দ ও রানি ইসাবেলার সেনাবাহিনী, যাদের বিয়ে সম্প্রতি প্রাচীন ইবারিয় পেনিসুলার রাজ্য আরাগন ও ক্যাসলকে একসূত্রে বেঁধেছিল, নগর রাষ্ট্র গ্রানাদা দখল করে নেয়। গভীর আবেগের সাথে নগরবাসীরা নগর প্রাচীরে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্রিশ্চান পতাকা ওড়ানো প্রত্যক্ষ করে। খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে গোটা ইউরোপ জুড়ে বিজয়ের সুরে ঘণ্টা বাজতে শুরু করে, কারণ ক্রিশ্চান বিশ্বে গ্রানাদাই ছিল শেষ মুসলিম শক্তঘাঁটি। মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামের বিরুদ্ধে ক্রুসেডসমূহ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছিল। তবে অন্তত ইউরোপ থেকে মুসলিমদের বহিষ্কার করা গেছে। ১৪৯৯ সালে স্পেনের মুসলিমদের ক্রিশ্চান ধর্মে দীক্ষা গ্রহণ বা দেশত্যাগের মধ্যে যেকোনও একটি বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়, এরপর কয়েক শতাব্দী ধরে ইউরোপ মুসলিম শূন্য হয়ে থাকবে। গুরুত্ববহ এই বছরের দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটে ৩১শে মার্চ, এই দিন ফার্দিনান্দ ও ইসাবেলা এডিক্ট অভ এক্সপালশান স্বাক্ষর করেন; স্পেনকে ইহুদি মুক্ত করাই ছিল এর লক্ষ্য। ব্যাপ্টিজম বা দেশত্যাগের ভেতর যেকোনও একটি বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয় তাদের। অনেক ইহুদিই ‘আল-আন্দালুসের’ (প্রাচীন মুসলিম রাজ্যকে এ নামেই ডাকা হত) সাথে নিজেদের এমনভাবে সম্পর্কিত মনে করত যে, ক্রিশ্চান ধর্মে দীক্ষা নিয়ে স্পেনেই থেকে যায় তারা, কিন্তু আনুমানিক ৮০,০০০ ইহুদি সীমানা পেরিয়ে পর্তুগালে পাড়ি জমায়, অন্যদিকে ৫০,০০০ ইহুদি পালিয়ে যায় নতুন মুসলিম অটোমান সাম্রাজ্যে। এখানে তাদের স্বাগত জানানো হয়। তৃতীয় ঘটনাটি ক্রিশ্চানদের গ্রানাদা অধিকার করে নেওয়ার সময় উপস্থিত এক ব্যক্তির সাথে সম্পর্কিত। আগস্ট মাসে ফার্দিনান্দ ও ইসাবেলার অনুগ্রহভাজন ক্রিস্টোফার কলম্বাস ভারতের সাথে নুতন বাণিজ্য-পথ আবিষ্কারের লক্ষ্যে জাহাজ ভাসান, কিন্তু তার বদলে আমেরিকা আবিষ্কার করে বসেন তিনি।
