কাউন্টার রিফর্মেশনের প্রধান স্পেনিয় অবদান ছিল অতীন্দ্রিয়। অনেকটা মহান নাবিকদের ভৌত বিশ্বে নতুন নতুন অঞ্চল আবিষ্কার করে চলার মতো ইবারিয়ার অতীন্দ্রিয়বাদীরা আধ্যাত্মিক জগতের অভিযাত্রীতে পরিণত হয়। অতীন্দ্রিয়বাদ ছিল মিথোসের আওতাভুক্ত, যৌক্তিক অংশের কাছে দুর্গম অবচেতন জগতেই এর কর্মকাণ্ড, ভিন্ন কৌশলে প্রত্যক্ষ করতে হত একে। তাসত্ত্বেও স্পেনের অতীন্দ্রিয়বাদী সংস্কারকগণ আধ্যাত্মিকতার এই ধরনটিকে কম অগোছাল ও অন্তর্মুখী, এবং অপরিপক্ক পরামর্শকদের উপর কম নির্ভরশীল করতে চেয়েছিলেন। জন অভ দ্য ক্রস (১৫৫২-৯১) অধিকতর সন্দেহজনক ও কুসংস্কারমূলক ভক্তি উৎখাত করে অতীন্দ্রিয়বাদী প্রক্রিয়াকে অনেকটা পদ্ধতিগত রূপ দেন। নতুন কালের অতীন্দ্রিয়বাদীদের এক স্তর থেকে অন্য স্তরে অগ্রসর হওয়ার সময় কী প্রত্যাশা করতে হবে সেটা জানার প্রয়োজন ছিল, তাদের অবশ্যই অন্তস্থঃ জীবনের বিভিন্ন সংকট ও বিপদের মোকাবিলা করার কৌশল শিখতে হত ও আধ্যাত্মিক শক্তিসমূহের কার্যকর পরিমিত ব্যবহার জানতে হত।
অবশ্য আরও আধুনিক ও অত্যাসন্ন বিভিন্ন পরিবর্তনের আভাস ছিল সাবেক সৈনিক ইগনাশিয়াস অভ লায়োলা (১৪৯১-১৫৫৫) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত সোসায়েটি অভ জেসাস। এই সংঘ এমন এক ধরনের দক্ষতা ও কার্যকারিতা ধারণ করত যা আধুনিক পশ্চিমের বৈশিষ্ট্যে পরিণত হবে। ইগনাশিয়াস বাস্তব ক্ষেত্রে মিথোসের শক্তি পরীক্ষা করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। তাঁর জেস্যুইটদের জন অভ দ্য ক্রস উদ্ভাভিত দীর্ঘ ধ্যানমূলক অনুশীলনের অবকাশ ছিল না। তাঁর স্পিরিচুয়াল এক্সারসাইজ তিরিশ দিন মেয়াদী সময়-দক্ষ একটি পদ্ধতিগত নির্জনবাসের ব্যবস্থা দিয়েছিল, ফলে প্রত্যেক জেস্যুইট অতীন্দ্রিয়বাদের একটি ঝটিকা শিক্ষা লাভ করত। পরিপূর্ণভাবে যিশুতে দীক্ষা লাভের পর একজন ক্রিশ্চান তার অগ্রাধিকারসমূহ বিন্যস্ত করে নিতে পারলে, কর্মক্ষেত্রে নামতে প্রস্তুত হতে পারত। পদ্ধতি, শৃঙ্খলা ও সংগঠনের উপর এই গুরুত্বারোপ নতুন বিজ্ঞানের মতোই ছিল। ঈশ্বরকে এক গতিশীল শক্তি হিসাবে প্রত্যক্ষ করা হত, যা সারাবিশ্বের জেস্যুইটদের অনেকটা অভিযাত্রীদের মতোই পরিচালিত করত। ফ্রান্সিস হাবিয়ের (১৫০৬-৫২) জাপানকে, রবার্ট দি নোবিলি (১৫৭৭-১৬৫৬) ভারতকে, এবং মেত্তি ও রিক্কি (১৫৫২-১৬১০) চীনকে ইভাঞ্জেলাইজ করেছেন। প্রাথমিক আধুনিক স্পেনে ধর্মকে তখনও পেছনে ফেলে আসা হয়নি। নিজেকেই নিজে সংস্কারে সক্ষম ছিল তা, এবং নিজস্ব আওতা ও আদর্শকে আরও সামনের দিকে নিয়ে যেতে আধুনিকতার বিভিন্ন অন্তর্দৃষ্টি আত্মস্থ করতে পারছিল।
সুতরাং, প্রাথমিক আধুনিক স্পেন ছিল আধুনিকতার অগ্রসর প্রহরীর অংশ। তবে ফার্দিনান্দ ও ইসাবেলাকে এইসব শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়েছে। এ যাবত স্বাধীন ও বিচ্ছিন্ন বিভিন্ন রাজ্যকে একত্র করার প্রয়াস পাচ্ছিলেন তাঁরা; পরস্পরের সাথে সংযুক্ত করতে হচ্ছিল সেগুলোকে। ১৪৮৩ সালে এই দুই রাজণ্য তাঁদের একীভূত অঞ্চলে আদর্শগত সমরূপতা নিশ্চিত করতে নিজস্ব স্প্যানিশ ইনকুইজিশনের প্রচলন করেন। একটি আধুনিক পরম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করছিলেন তাঁরা, কিন্তু তখনও তাঁদের হাতে প্রজাদের অবারিত বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা দেওয়ার মতো সম্পদ ছিল না। ইনকুইজিটররা ভিন্নমতাবলম্বীদের খুঁজে বের করে তাদের ‘হেরেসি’ (ধর্মহীনতা) ত্যাগে বাধ্য করতেন: এই শব্দটির আদি গ্রিক অর্থ ছিল ‘কারও নিজের পথে যাওয়া। স্প্যানিশ ইনকুইজিশন অতীতের বিশ্বকে ধরে রাখার প্রাচীন কোনও প্রয়াস ছিল না। আধুনিকায়নের প্রতিষ্ঠান ছিল এটা, জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাজা-রানি এর পত্তন ঘটিয়েছিলেন। তাঁরা খুব ভালো করেই জানতেন, ধর্ম একটি বিস্ফোরক ও বিপ্লবী শক্তিতে পরিণত হতে পারে। ইংল্যান্ডের মতো দেশগুলোতে প্রটেস্ট্যান্ট শাসকগণ একইভাবে তাঁদের ক্যাথলিক ‘ভিন্নমতাবলম্বীদের’ প্রতি খড়গহস্ত ছিলেন; তাদেরও রাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ বিবেচনা করা হয়েছিল। আমরা দেখব এই ধরনের নির্যাতন ছিল আধুনিকায়ন প্রক্রিয়ারই অংশ। স্পেনে ইনকুইজিশনের প্রধান শিকার ছিল ইহুদিরা; এই অধ্যায়ে আমরা আগ্রাসী আধুনিকতার প্রতি ইহুদি জনগণের সাড়াই আলোচনা করব। তাদের অভিজ্ঞতা বিশ্বের অন্যান্য অংশের মানুষ কীভাবে আধুনিকতার প্রতি সাড়া দেবে সেই সম্পর্কে বিভিন্ন উপায়ের অনেকগুলোই তুলে ধরে।
আল-আন্দালুসের পুরোনো মুসলিম এলাকার স্প্যানিশ রিকনকুইস্তা ইবারিয়ার ইহুদিদের পক্ষে ছিল রীতিমতো বিপর্যয়। ইসলামি রাষ্ট্রে ইহুদিবাদ, ক্রিশ্চানিটি ও ইসলামের মতো তিনটি ধর্ম পাঁচ শো বছরেরও বেশি কাল একসাথে সম্প্রীতির ভেতর বাস করে এসেছে। বিশেষ করে ইহুদিরা স্পেনে সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক রেনেসাঁ উপভোগ করেছে, ইউরোপের বাকি অংশে ইহুদি জনগণের নিয়তিতে পরিণত হওয়া বিভিন্ন হত্যালীলার শিকার হতে হয়নি তাদের। কিন্তু ক্রিশ্চান সেনাবাহিনী ইসলামের আরও অনেক অনেক ভূখণ্ড অধিকার করে পেনিনসুলা ধরে ক্রমে অগ্রসর হওয়ার সাথে সাথে অ্যান্টি-সেমিটিজমকেও সাথে করে নিয়ে আসছিল তারা। ১৩৭৮ ও ১৩৯১ সালে আরাগন ও ক্যাস্তিলের ইহুদি সম্প্রদায় ক্রিশ্চানদের হাতে আক্রান্ত হয়েছিল, ইহুদিদের জোর করে দীক্ষা দানের ঝর্নার কাছে এনে মরণ যন্ত্রণা দিয়ে ক্রিশ্চান ধর্ম গ্রহণে বাধ্য করেছিল তারা। আরাগনে দোমেনিকান ফ্রায়ার ভিনসেন্ত ফেরারের (১৩৫০-১৪১৯) ধর্মপ্রচারণা নিয়মিতভাবেই অ্যান্টি-সেমিটিক দাঙ্গা উস্কে দিত। ফেরার র্যাবাই ও ক্রিশ্চানদের ভেতর বিভিন্ন বিতর্কেরও আয়োজন করতেন, ইহুদি ধর্মকে খাট করাই এর উদ্দেশ্য ছিল। কোনও কোনও ইহুদি নির্যাতন এড়াতে স্বেচ্ছায় ক্রিশ্চান ধর্মে দীক্ষা নিয়েছিল। সরকারীভাবে তারা কনভার্সোর্স (কনভার্টস) নামে পরিচিত ছিল, যদিও ক্রিশ্চানরা তাদের মারিনোস (‘শুয়োর’) বলে ডাকত, গালির ভাষা হলেও ধর্মান্তরিতদের কেউ কেউ একে অহঙ্কারের তকমা হিসাবে ধারণ করেছিল। র্যাবাইগণ ধর্মান্তরের ব্যাপারে ইহুদিদের সতর্ক করে দিয়েছিলেন, কিন্তু প্রথম দিকে ‘নিউ ক্রিশ্চানরা’-কনভাসোর্সদের যেনামে ডাকা হত-সম্পদশালী ও সফল হয়ে উঠেছিল। উচ্চপদস্থ যাজকে পরিণত হয়েছিলেন কেউ কেউ, অন্যরা সেরা পরিবারে বিয়ে করে, আবার অনেকেই ব্যবসাবাণিজ্যে লক্ষণীয় সাফল্য লাভ করে। ‘পুরোনো ক্রিশ্চান’রা ইহুদিবাদী ক্রিশ্চানদের সমাজের উপরের দিকে যাত্রা অসন্তোষের চোখে দেখায় এতে এক নতুন সমস্যা সৃষ্টি হয়। ১৪৪৯ ও ১৪৭৪ সালের মধ্যবর্তী সময়ে মারানোদের বিরুদ্ধে ঘনঘন দাঙ্গার ঘটনা ঘটেছে, তাদের হত্যা করা হয়েছে, সম্পদের বিনাশ সাধন করা হয়েছে কিংবা শহর ছাড়া করা হয়েছে।
