সেনাবাহিনী ছিল মুহাম্মদ আলির মূল গুরত্বের বিষয়। লক্ষ্য অর্জন করতে হলে এই বাহিনীর প্রয়োজন ছিল তাঁর। কেননা সারা জীবনের কর্মকাণ্ডে তাঁকে এক হাতে ব্রিটিশদের ঠেকাতে হয়েছে অন্য হাতে ঠেকাতে হয়েছে অটোমান তুর্কিদের। তুর্কিরা কেবল একটা কারণেই মুহাম্মদ আলির আধা স্বায়ত্তশাসিত রাষ্ট্রের গোড়া পত্তন মেনে নিতে পারত, সেটা হলো অটোমান অভিযানে তাঁর উন্নত যোদ্ধা মেশিনকে তলব করে: আরবে ওয়াহাবিদের বিরুদ্ধে, বা গ্রিক বিদ্রোহ দমনে (১৮২৫-২৮)। কিন্তু ১৮৩২ সালে তাঁর ছেলে ইব্রাহিম পাশা অটোমান প্রদেশ সিরিয়া ও প্যালেস্তাইনে আক্রমণ চালিয়ে বসে তুর্কি সেনাবাহিনীর উপর শোচনীয় পরাজয় চাপিয়ে দেন, বাবার জন্যে এক দর্শনীয় ইম্পেরিয়াম ইন ইম্পেরিও সৃষ্টি করেন। মিশরিয় বাহিনী অবশ্যই ফরাসি কায়দায় গঠন করা হয়েছিল। নেপোলিয়নের সেনাদলে প্রত্যক্ষ করা শৃঙ্খলা ও দক্ষতা অনুকরণের প্রয়াস পেয়েছিলেন মুহাম্মদ আলি, এবং সত্যিই সংখ্যার দিক থেকে বিশাল সেনাবাহিনীর ভেতর দিয়ে অনায়াসে অগ্রসর হওয়ার মতো একটি বাহিনী গড়ে তুলতে সফল হয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর এই সাফল্যে দেশের মানুষের উপর নিষ্ঠুর আক্রমণও জড়িত ছিল। প্রথমে মুহাম্মদ আলি সুদান থেকে প্রায় ২০,০০০ জনকে জোর করে সেনাবাহিনীতে নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ দেন, আসওয়ানের ব্যারাকে রাখেন তাদের। কিন্তু সুদানিরা স্রেফ মানিয়ে উঠতে পারেনি। তাদের বাঁচাতে সেনাবাহিনীর ডাক্তারদের প্রাণান্ত প্রয়াস সত্ত্বেও (আবু জাবলে মুহাম্মদ আলির মেডিকেল স্কুলে প্রশিক্ষিত) অনেকেই দেয়ালের দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে মারা গেছে। এভাবে পাশা ফেলাহিনদের নিয়োগ করতে বাধ্য হন, তাদের বাড়ি, পরিবার ও ক্ষেত থেকে তুলে নিয়ে আসেন। পর্যাপ্ত খাপ খাওয়ানোর মতো যথেষ্ট সহায় তাদের সাধারণত ছিল না, তাদের পরিবার প্রায়ই দুর্গত অবস্থায় পড়ে গেছে, নারীরা পতিতাবৃত্তি গ্রহণে বাধ্য হয়েছে। জোর করে সম্পূর্ণ অজানা অচেনা এক জীবনে নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা অধিকাংশ ফেলাহিনকে এমন প্রবল ত্রাসে আক্রান্ত করেছিল যে ঘন ঘন আত্ম-বিকৃতির আশ্রয় নিতে শুরু করেছিল তারা: নিজের আঙুল কেটে ফেলত, দাঁত উপড়ে ফেলত ও এমনকি নিজেদের অন্ধও করত।৪১ দক্ষ একটি লড়াকু বাহিনী গড়ে তোলা হয়েছিল বটে, কিন্তু বিশাল মানবীয় ক্ষতি স্বীকার করে। জোর করে সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্তির ফলে কেবল ফেলাহিনরাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, জমিন থেকে পুরুষদের উৎখাত করায় কৃষিখাত ও মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
প্রত্যেক ইতিবাচক সংস্কারেরই কালো দিক ছিল। মুহাম্মদ আলির অর্থনৈতিক নীতিমালা ইউরোপিয় বাণিজ্যকে মিশরের প্রবেশে উৎসাহিত করেছে, কিন্তু সেটা স্থানীয় শিল্পখাতের ক্ষতি সৃষ্টি করে। মিশরের একমাত্র একচেটিয়া কারবারীতে পরিণত হয়ে পাশা কার্যত দেশীয় বণিকশ্রেণীকে ধ্বংস করে দিয়েছিলেন।২ বহুল প্রতীক্ষিত সেঁচ কর্ম ও জলপথের উন্নয়নে বিশাল অংক বিনিয়োগ করেছিলেন তিনি, কিন্তু কোর্ভির শ্রমিকদের কাজের পরিবেশ এতটাই খারাপ ছিল যে, ২৩,০০০ প্রাণ হারিয়েছিল বলে কথিত আছে।৪৩ প্রাচীন সমাজ ব্যবস্থাকে নিষ্ঠুরভাবে ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছিল। কিন্তু মিশরের বিশাল জনসংখ্যার প্রাক আধুনিক, রক্ষণশীল জীবনধারা ও বিশ্বাসসমূহ অপরিবর্তনীয় রয়ে গিয়েছিল। সম্পূর্ণ ভিন্ন কেতায় কাজ করে চলা দুটো সমাজ-একটিতে ছিল কেবল আধুনিকায়িত সামরিক বাহিনী ও প্রশাসনিক কর্মচারী, এবং অন্যটি অনাধুনিক-ধীরে ধীরে আবির্ভূত হচ্ছিল মিশরে।
উলেমাগণ নির্ঘাৎ আধুনিকতার আবির্ভাবকে বিধ্বংসী আবিষ্কার করেছিলেন। মুহাম্মদ আলি গভর্নর হওয়ার সময় তাঁরা ছিলেন বিশাল শক্তি। তিনি তাঁদের তোষামোদ করেছেন, প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, এবং টানা তিনটি বছর পাশা ও যাজকদের ভেতর এক মধুচন্দ্রিমার কাল গেছে। ১৮০৯ সালে অবশ্য উলেমাগণ প্রথাগত কর অবকাশের মর্যাদা হারান, উমর মাকরাম মুহাম্মদ আলির বিরোধিতা করার জন্যে আহ্বান জানালেন তাদের যাতে নতুন করারোপ প্রত্যাহারে তাঁকে বাধ্য করা যায়। কিন্তু উলেমাগণ খুব কমই ঐক্যবদ্ধ রূপ দেখাতে পেরেছেন। বেশ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক উলেমাকে নিজের শিবিরে টেনে নিতে সক্ষম হন পাশা। মাকরামকে নির্বাসনে পাঠানো হয়, তাঁর সাথে সাথে মুহাম্মদ আলির বিরোধিতা করার শেষ সুযোগটুকুও উলেমাদের হাতছাড়া হয়ে যায়; তাঁর বিদায় শ্রেণী হিসাবে উলেমাদের পরাজয়ও ছিল বৈকি। মুসলিম হিসাবে মুহাম্মদ আলি ধর্মীয় পণ্ডিত ও মাদ্রাসাগুলোর প্রতি মিষ্টি কথা বলতে ভুল করতেন না, কিন্তু পদ্ধতিগতভাবে প্রান্তিক অবস্থানে ঠেলে দিয়েছিলেন তাদের, সামান্য ক্ষমতা থেকেও করেছিলেন বঞ্চিত। তাঁকে অমান্যকারী শেখদের বহিষ্কার করেছেন তিনি; ফলে জাবার্তি বলছেন, বেশির ভাগ উলেমা নতুন ব্যবস্থায় সায় দিয়েছিলেন। আর্থিকভাবেও তাঁদের অনাহারে রেখেছিলেন তিনি। ধর্মীয়ভাবে দান করা সম্পত্তির (ওয়াকফ) আয় বাজেয়াপ্ত করে উলেমাদের আয়ের প্রধান উৎসটিকেও কেড়ে নিয়েছিলেন। ১৮১৫ সাল নাগাদ বিশাল সংখ্যক প্রচলিত কোরান শিক্ষার স্কুল ধ্বংস স্তূপে পরিণত হয়েছিল। ষাট বছর পরে ইসলামি প্রতিষ্ঠানগুলো এক মারাত্মক অর্থনৈতিক দুর্দশায় পতিত হয়। শিক্ষকদের জন্যে কোনও রকম বৃত্তির ব্যবস্থা ছিল না, মসজিদগুলো ইমাম মুয়াজ্জিন, কোরান তেলাওয়াতকারী ও খাদেমদের বেতন দিতে পারছিল না। মহান মামলুক ভবনগুলোর অবনতি ঘটতে শুরু করেছিল, এমনকি আযহার পর্যন্ত পড়ে গিয়েছিল দুর্দশায়।৪৪
