মনে হয় যেন লোকজনকে আধুনিক বিশ্বে নিয়ে আসতে নেতৃবৃন্দকে অবশ্যই রক্তের নদীতে সাঁতার কাটতে প্রস্তুত থাকতে হয়। স্থিতিশীল, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের অনুপস্থিতিতে সহিংসতাই হয়তো শক্তিশালী সরকার অর্জনের একমাত্র পথ। মুহাম্মদ আলি অর্থনীতির বেলায়ও সমান নিষ্ঠুর ছিলেন। এটা বোঝার মতো ক্ষমতা তাঁর ছিল যে, উৎপাদনের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিই পাশ্চাত্য শক্তির আসল ভিত্তি। ১৮০৫ থেকে ১৮১৪ সাল পর্যন্ত সময়কালে পদ্ধতিগতভাবে নিজেকে দেশের প্রতি একর জমির ব্যক্তিগত মালিকে পরিণত করেছিলেন তিনি। আগেই মামলুকদের এস্টেট হাতিয়ে নিয়েছিলেন; এরপর দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতগ্রস্ত পদ্ধতি চালিয়ে আসা ট্যাক্স কৃষকদের সম্পত্তি অধিকার করে নেন। সবশেষে ব্যক্তিগতভাবে ফাউন্ডেশনের সমস্ত বকেয়া দায় শোধ করে বছরের পরিক্রমায় অবনতির দিকে চলে যাওয়া সকল ধর্মীয়ভাবে দান করা জমি ও সম্পত্তি অধিকার করে নেন। একই রকম স্বেচ্ছাচারী কৌশল প্রয়োগ করে দেশের প্রতিটি ব্যবসা ও শিল্প প্রতিষ্ঠানের একচেটিয়া অধিকার লাভ করেন তিনি। মাত্র এক দশকের কিছু বেশি সময়ের ভেতরই নিজেকে মিশরের একক ভূস্বামী, বণিক ও শিল্পপতিতে পরিণত করেন। মিশরিয়রা এসব মেনে নিয়েছিল, তার কারণ ছিল বিপুল অঙ্কের ক্ষতিপূরণ। বহু বছরের বিশৃঙ্খলা ও অব্যবস্থাপনার পর দেশে আইন শৃঙ্খলার পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়েছিল; স্বচ্ছতার সাথে বিচারকর্ম সম্পাদিত হচ্ছিল, প্রত্যেকের সরাসরি মুহাম্মদ আলির কাছে অভিযোগ দাখিল করার অধিকার ছিল। স্পষ্টতই আয়ের অর্থে নিজের পকেট ভারি করছিলেন না তিনি, বরং মিশরের উন্নয়ন ঘটাচ্ছিলেন। তাঁর অন্যতম প্রধান সাফল্য ছিল তুলার চাষ, মূল্যবান রপ্তানি পণ্য ও রাজস্ব আয়ের প্রধান উৎসে পরিণত হয়েছিল তা। মুহাম্মদ আলি ইউরোপ থেকে যন্ত্রপাতি, অস্ত্রশস্ত্র ও উপাদিত পণ্য কেনার প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রার যোগান পেয়েছেন।
কিন্তু এখানেই পাশ্চাত্যের উপর নির্ভরশীলতা ফুটে উঠেছে। ইউরোপের সামগ্রিক আধুনিকায়নের প্রক্রিয়া স্বায়ত্তশাসন ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে-বুদ্ধিবৃত্তিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক-স্বাধীনতা ঘোষণার প্রয়োজনে শক্তি লাভ করেছিল। কিন্তু মুহাম্মদ আলি একমাত্র যে কায়দায় মিশরের অধিপতি ও ইউরোপ থেকে স্বাধীন করার উপায় ছিল সেটা হচ্ছে পরম স্বৈরাচরী নিয়ন্ত্রণ আরোপ। শক্তিশালী শিল্প ভিত্তি গড়ে তুলতে না পারলে তাঁর পক্ষে সফল হওয়া সম্ভব ছিল না। যথারীতি তিনি একটি চিনি রিফাইনারি, অস্ত্রভাণ্ডার, তামার খনি, তুলার কারাখানা, লোহার ফাউন্ড্রি, রঙের কারখানা, গ্লাস ফ্যাক্টরি ও ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কিন্তু চোখের পলকে শিল্পায়ন সম্ভব হতে পারে না। ইউরোপ অবিষ্কার করেছিল যে তাদের বিভিন্ন উদ্যোগ পরিচালনার জন্যে সাধারণ মানুষদের ভেতর থেকে অধিক সংখ্যায় আধুনিকায়নের প্রক্রিয়ার প্রয়োজনীয় নৈপূণ্য অর্জন ও বিশেষায়িত দক্ষতা অর্জনের প্রয়োজন হয়েছে। তবে সেজন্যে সময় লেগেছে। মুহাম্মদ আলির কলে-কারাখানায় যেসব ফেলাহিন কাজ করত তাদের কোনও রকম কারিগরি দক্ষতা ছিল না, ছিল না কোনও অভিজ্ঞতাও, ক্ষেতের বাইরের জীবনে নিজেদের অভ্যস্ত করে তুলতে পারেনি তারা। দেশের উৎপাদনশীলতায় অবদান রাখতে হলে শিক্ষা গ্রহণের প্রয়োজন ছিল, কিন্তু তাতে এর মানে দাঁড়াত এক বিশাল প্রায় অচিন্তনীয় সামাজিক উত্থান। পরিণতিতে মুহাম্মদ আলি বেশিরভাগ শিল্প উদ্যোগ মুখ থুবড়ে পড়েছিল।৩৯
এভাবে আধুনিকায়ন প্রক্রিয়া প্রকৃতপক্ষেই বেশ কঠিন ছিল, সমস্যাগুলো অনতিক্রম্য বলা চলে। ইউরোপে চাবিকাঠি ছিল উদ্ভাবন। কিন্তু অধিকাংশ মিশরিয়ই তখনও প্রাক আধুনিক রক্ষণশীল চেতনায় প্রভাবিত ছিল। মুহাম্মদ আলি একমাত্র যে উপায়ে মিশরকে আধুনিক করে গড়ে তুলতে পারতেন সেটা উদ্ভাবনের সাহায্যে নয় (ইউরোপের মতো), বরং পশ্চিমের অনুকরণের মাধ্যমে। তিনি প্রশাসনিক, কারিগরি ও শিক্ষাগত অনুকরণের (ইসলামি ভাষায় তাকলিদ )-এর কর্মসূচির প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ ছিলেন, আধুনিক চেতনার উল্টোপিঠ ছিল তা। পশ্চিমের অমূল্য উপাদানে পরিণত হওয়া স্বাধীনতা ও সৃজনীশক্তি ছাড়া মিশরের মতো একটি রাষ্ট্র কীভাবে সত্যিকার অর্থে ‘আধুনিক’ হয়ে উঠতে পারে?
কিন্তু মুহাম্মদ আলির সামনে কোনও উপায় ছিল না। তিনি প্রধানত ইউরোপিয়, তুর্কি ও লাভান্তিয় অফিসারদের দিয়ে পরিচালিত পাশ্চাত্য কায়দার প্রশাসন চালু করেছিলেন। এরা মিশরের সমাজের এক নতুন শ্রেণী গড়ে তুলেছিল। প্রতিশ্রুতিশীল তরুণদের পড়াশোনার জন্যে ফ্রান্স বা ইংল্যান্ডে পাঠানো হচ্ছিল। ১২০০ ছাত্রের জন্যে ক্যাসারলিনে একটা সামরিক কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়, পাশার অর্থে তাদের ভরণপোষণ ও পোশাকের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ইউরোপিয় বা বিদেশে পড়াশোনা করা মিশরিয়দের পরিচালনায় তুরা ও গিজায় আরও দুটি অর্টিলারি স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। কলেজে প্রবেশের সাথে সাথে এই ছেলেরা পাশার ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হত, তারা ইউরোপিয় ভাষা, গণিত ও পাশ্চাত্য সমর কৌশলের উপর পড়াশোনা করত। এই কলেজগুলো দেশকে সুশিক্ষিত অফিসার শ্রেণীর যোগান দিয়েছিল। কিন্তু ফেলাহিনদের জন্যে প্রাথমিক শিক্ষার কোনও ব্যবস্থা ছিল না: ক্ষেতেখামারেই এরা মিশরের পক্ষে বেশি উপকারী ছিল, দেশকে কৃষি ভিত্তি যোগাচ্ছিল।° এর মারাত্মক পরিণতি দেখা দেবে। মিশরের মতো অ-পশ্চিমা আধুনিকায়নের পথে চলা দেশে ইউরোপিয় দেশসমূহের সাথে সবচেয়ে বেশি যোগাযোগ ছিল সামরিক বাহিনীর সদস্যদের। জনসংখ্যার বিশাল অংশ প্রক্রিয়া থেকে বাধ্য হয়েই দূরে ছিল, ফলে সেনা অফিসাররা প্রায়শঃই স্বাভাবিকভাবেই নেতা বা শাসকে পরিণত হতেন, তখন আধুনিকতা এক ভিন্ন সামরিক গুরুত্ব লাভ করত-আবারও-পশ্চিম থেকে যা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
