১৮০১ সালে ব্রিটিশরা মিশর থেকে ফরাসিদের উৎখাত করতে সফল হয়; এই পর্যায়ে ব্রিটিশরা অটোমান সাম্রাজ্যের অখণ্ডতা বজায় রাখার ব্যাপারে অঙ্গীকারবদ্ধ ছিল। সুতরাং, মিশরকে তুর্কিদের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছিল তারা, মিশরে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার কোনও রকম প্রয়াস পায়নি। কিন্তু অধিকারের ব্যাপারটা ছিল শোরগোলময়। মামলুকরা ইস্তাম্বুল থেকে নতুন তুর্কি সরকারকে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায়। দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে মামলুক, জানেসারি ও অটোমানদের প্রেরিত আলবেনিয় গ্যারিসন পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে জনগণকে ভীত সন্ত্রস্ত করে রাখে। এমনি বিভ্রান্তির সময় মুহাম্মদ আলি (১৭৬৯-১৮৪৯) নামে এক তরুণ আলবেনিয় অফিসার নিয়ন্ত্রণ হাতে তুলে নেন। বিভ্রান্তিতে ক্লান্ত ও মামলুকদের অযোগ্যতার কারণে উলেমাগণ তাঁকে সমর্থন দেন। বিশিষ্ট আলিম উমর মাকরামের নেতৃত্বে উলেমাগণ তুর্কিদের বিরুদ্ধে এক জনপ্রিয় অভ্যুত্থান পরিচালনা করেন, ইস্তাম্বুলে প্রতিনিধি দল পাঠিয়ে মুহাম্মদ আলিকে মিশরের পাশা বা গভর্নর হিসাবে স্বীকৃতি দানের অনুরোধ জানান। সুলতান সম্মত হন, কায়রোতে ব্যাপক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। জনৈক ফরাসি পর্যবেক্ষক লিখেছেন যে, জনতার উৎসাহ উদ্দীপনা তাঁকে ফরাসি বিপ্লবের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে।৩৬ এটা ছিল উলেমাদের স্বর্ণ সময়। উলেমাদের সাথে আলোচনা ছাড়া মিশরের কোনও পরিবর্তন না আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের সমর্থন নিশ্চিত করেন মুহাম্মদ আলি। সবাই ধরে নিয়েছিল যে, স্থিতাবস্থার পুনর্বহাল হয়েছে; বেশ কয়েক বছরের উত্থান- পতনের পর জীবন আবার এখন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যেতে পারবে।
কিন্তু মুহাম্মদ আলির ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিকল্পনা। তিনি মিশরে ফরাসিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন, আধুনিক ইউরোপিয় সেনাবাহিনী দেখে যারপরনাই মুগ্ধ হয়েছিলেন; নিজস্ব এমনি একটি আধুনিক দারুণ দক্ষ সেনাবাহিনী পেতে চেয়েছেন তিনি। ইস্তাম্বুল থেকে স্বাধীন একটি আধুনিক মিশর গড়ে তুলতেও দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন তিনি। পশ্চিমে ঘটমান বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লবের প্রতি মুহাম্মদ আলির কোনও অগ্রহ ছিল না। ছিলেন কৃষক পরিবারের অশিক্ষিত মানুষ, চল্লিশ বছর বয়সে পড়াশোনা করতে শিখেছিলেন। সরকার ও সমর বিজ্ঞান সম্পর্কে জানা যাবে এজাতীয় বইপত্রই ছিল তাঁর আগ্রহের বিষয়। পরবর্তীকালের বহু সংস্কারকের মতো মুহাম্মদ আলি স্রেফ আধুনিকতার প্রযুক্তি ও সামরিক শক্তির অধিকারী হতে চেয়েছেন। দেশের সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিক জীবনের উপর এইসব পরিবর্তনের প্রভাব সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করতে প্রস্তুত ছিলেন। তা সত্ত্বেও মুহাম্মদ আলি অনন্যসাধারণ মানুষ ছিলেন, তাঁর সাফল্য ছিল উল্লেখ করার মতো। ১৮৪৯ সালে মৃত্যুর সময় বলতে গেলে একা হাতে অটোমান সাম্রাজ্যের এক পশ্চাদপদ, বিচ্ছিন্ন প্রদেশ মিশরকে আধুনিক বিশ্বে টেনে তুলেছিলেন তিনি। তাঁর কর্মজীবন কোনও অ-পশ্চিমা সমাজে পাশ্চাত্য আধুনিকতা চালু করার সমস্যা সম্পর্কে আমাদের আলোকিত করা কিছু অন্তর্দৃষ্টি যোগায়।
প্রথমত, আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, পশ্চিম ধীরে ধীরে এর নিজস্ব শক্তিতে আধুনিকতায় এসে পৌঁছেছিল। ইউরোপ ও আমেরিকার অধিবাসীদের বিশ্ব আধিপত্য লাভ করার প্রযুক্তি ও দক্ষতা অর্জন করতে প্রায় তিন শো বছর সময় লেগেছে। কিন্তু তারপরেও এটা ছিল এক কষ্টসাপেক্ষ, অস্বস্তিকর প্রক্রিয়া যেখানে বিপুল রক্তক্ষয় ও আধ্যাত্মিক স্থানচ্যুতির ব্যাপার ঘটেছে। কিন্তু স্রেফ চল্লিশ বছর সময়ে ভেতর এই অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়াটিকে বাস্তবায়িত করার প্রয়াস পেয়েছিলেন মুহাম্মদ আলি। লক্ষ্য অর্জনের জন্যে তাঁকে এমন কিছু ঘোষণা করতে হয়েছিল যা কিনা মিশরের জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার শামিল ছিল। এক ভীতিকর অবস্থায় ছিল মিশর। লুটপাট আর ধ্বংস প্রক্রিয়া থাবা বসিয়েছিল। ফেলাহিনরা জমি ছেড়ে সিরিয়ায় পালিয়ে গিয়েছিল। করের পরিমাণ ছিল মাত্রাতিরিক্ত ও খামখেয়ালিপূর্ণ। মামলুকরা ফিরে আসার হুমকি সৃষ্টি করেছিল। এমনি করুণ দশার একটি দেশকে কেমন করে আধুনিক প্রশাসন ও আধুনিক সেনাবহিনীর একটি শক্তিশালী, কেন্দ্ৰিভূত রাষ্ট্র হিসাবে গড়ে তোলা সম্ভব ছিল? পাশ্চাত্য অনেক দূর অগ্রসর হয়ে গিয়েছিল। কেমন করে মিশর তার নাগাল পাওয়ার আশা করতে পারত, পশ্চিমকে তার নিজের খেলায় পরাস্ত করে ও আরও পাশ্চাত্য আগ্রাসন ও দখল ঠেকাতে পারত?
মামলুক নেতাদের নিশ্চিহ্ন করার মাধ্যমে তাঁর সাম্রাজ্য গড়ে তোলার কাজে হাত দিয়েছিলেন মুহাম্মদ আলি। ১৯০৫ সালের আগস্ট মাসে তাদের প্রধান কর্মকর্তাদের প্রলুব্ধ করে কায়রো নিয়ে আসেন তিনি ও তিন জন বাদে বাকি সবাইকে অ্যাম্বুশে হত্যা করান। পরের দুই বছরে অবশিষ্ট বে-রা তাঁর ছেলে ইব্রাহিমের হাতে প্রাণ হারান; তখন ব্রিটিশদের সামাল দিয়েছেন মুহাম্মদ আলি-তাঁর বিস্ময়কর কার্যকর নেতৃত্ব দেখে বিস্মিত হয়ে গিয়েছিল তারা। সবশেষে অটোমান সুলতানের চাপের কাছে নতি স্বীকার করে আরবে অটোমান আধিপত্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণাকারী ওয়া হাবিদের বিরুদ্ধে একটি অভিযাত্রী দল পাঠান তিনি। ছেলে হাসানের অধীনে থাকার কথা ছিল সেনাবাহিনীর, কায়রোয় এক জাঁকাল অনুষ্ঠানে তিনি গম্ভীর অভ্যর্থনা লাভ করেছিলেন। নগরীর বিভিন্ন পথ দিয়ে এঁকেবেঁকে মিছিল এগিয়ে যাওয়ার সময় মুহাম্মদ আলির লোকেরা শেষ মামলুক চিফদের ফাঁদে ফেলে হত্যা করে, তারপর বেপরোয়া হয়ে ওঠার সুযোগ করে দেওয়া হয় তাদের; মামলুকদের বাড়িঘরে লুটপাট চালায় তারা, নারীদের ধর্ষণ করে। সেদিন এক হাজার মামলুক নিহত হয়েছিল, সেটাই ছিল মিশরে মামলুক গোষ্ঠীর অবসান।৩৭ আবারও, আধুনিকায়ন জাতিগত শুদ্ধি অভিযানের কাজ হিসাবে শুরু হয়েছিল।
